মিরাজ
আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হজ করতে আসা মানুষ হোক কিংবা মক্কায় ও মেলায় কেনাবেচা করতে আসা মানুষ – যাকেই দেখতেন, প্রত্যেক মানুষ ও প্রত্যেক গোত্রের কাছে ইসলাম তুলে ধরতেন। তিনি তাদের কাছে চাইতেন, তারা যেন তাঁকে আশ্রয় দেয় এবং মানুষের কাছে ইসলাম পৌঁছে দেওয়ার কাজে তাঁকে সাহায্য করে। কিন্তু কেউই মুসলমান হলো না, তাঁকে আশ্রয় দিতেও এগিয়ে এল না। উপরন্তু তারা অপমান, জুলুম, নির্যাতন ও উপহাস করল এবং তাঁকে মিথ্যাবাদী বলল। জগৎসমূহের সরদার ছিলেন অত্যন্ত ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, ব্যথিত ও ভীষণ বিষণ্ন। দিনগুলো এভাবেই কাটছিল, গভীর রাত পর্যন্ত এ অবস্থা চলত। মক্কার মুশরিকরা সারাক্ষণ তাঁর পিছু পিছু ঘুরত; কাবা জিয়ারতে আসা মানুষ যেন মুসলমান না হয়, সে বাধা তো দিতই, হাবিবে আকরাম মহানবীর ওপর জুলুম করা থেকেও বিরত থাকত না। রাসূলুল্লাহর জন্য যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা ছিল না। চারদিকে শুধু শত্রু। মক্কায় কয়েকটি মাস খুব কষ্টে কাটল।
বরকতময় রজব মাসের ২৭তম রাতে তিনি সোজা আবু তালিবের মহল্লায় চাচা আবু তালিবের কন্যা উম্মে হানির ঘরে এলেন। উম্মে হানি তখনো ঈমান আনেননি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কে ওখানে?” রাসূলুল্লাহ বললেন, “আমি তোমার চাচাতো ভাই মুহাম্মদ। তুমি রাজি থাকলে তোমার মেহমান হয়ে এসেছি।”
উম্মে হানি বললেন, “আপনার মতো সত্যবাদী, বিশ্বস্ত, অভিজাত ও সম্মানিত মেহমানের জন্য জান কুরবান। তবে আগে থেকে আপনার আসার খবর দিলে কিছু একটা তৈরি করে রাখতাম। এখন খাওয়ানোর মতো আমার কাছে কিছুই নেই।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “আমি খাবার-পানীয় চাই না। এসবের কোনোটিতেই আমার মন নেই। আমার রবের ইবাদত করা ও তাঁর কাছে মিনতি করার জন্য একটু জায়গাই আমার যথেষ্ট।”
উম্মে হানি আমাদের প্রিয় নবীকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে একটি চাটাই, একটি গামলা ও একটি বদনা দিলেন। আগত মেহমানকে আপ্যায়ন করা এবং তাকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা আরবদের কাছে সবচেয়ে সম্মানজনক দায়িত্ব বলে গণ্য হতো। ঘরে থাকা মেহমানের কোনো ক্ষতি হলে তা গৃহকর্তার জন্য বড় কলঙ্কের বিষয় হতো। উম্মে হানি ভাবলেন, “মক্কায় তাঁর অনেক শত্রু। এমনকি তাঁকে হত্যা করতে চায় এমন লোকও আছে। আমার সম্মান রক্ষার জন্য সকাল পর্যন্ত তাঁকে পাহারা দিই।” তিনি পিতার তলোয়ার হাতে নিয়ে ঘরের চারপাশে ঘুরতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সেদিন মনে খুবই আঘাত পেয়েছিলেন। তিনি অজু করে তাঁর রবের কাছে মিনতি করতে, ক্ষমা চাইতে এবং বান্দারা যেন ঈমান এনে সৌভাগ্য লাভ করে, সে জন্য দোয়া করতে লাগলেন। তিনি ছিলেন খুবই ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ও ব্যথিত। চাটাইয়ের ওপর শুয়ে পড়তেই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা জিবরাইল আলাইহিস সালামকে বললেন, “আমার প্রিয় নবীকে আমি অনেক দুঃখ দিয়েছি। তাঁর মুবারক দেহ ও কোমল হৃদয়কে অনেক ব্যথিত করেছি। এ অবস্থাতেও তিনি আমারই কাছে মিনতি করছেন। আমাকে ছাড়া আর কিছুই তিনি ভাবছেন না। যাও, আমার হাবিবকে নিয়ে এসো! তাঁকে আমার জান্নাত ও জাহান্নাম দেখাও। তাঁর জন্য এবং তাঁকে যারা ভালোবাসে, তাদের জন্য আমি যে নিয়ামতসমূহ প্রস্তুত করেছি, তিনি তা দেখুন। যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে না এবং কথা, লেখা ও আচরণে তাঁকে কষ্ট দেয়, তাদের জন্য প্রস্তুত করা আমার আজাবসমূহও তিনি দেখুন। আমি নিজেই তাঁকে সান্ত্বনা দেব। তাঁর কোমল হৃদয়ের ক্ষতে আমি নিজেই প্রলেপ দেব।”
জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহর কাছে এসে দেখলেন, তিনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
তাঁকে জাগাতে জিবরাইলের মন চাইল না। তিনি তখন মানুষের আকৃতিতে ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর মুবারক পায়ের তলায় চুমু খেলেন। জিবরাইলের হৃদয় ও রক্ত না থাকায় তাঁর ঠান্ডা ঠোঁটের স্পর্শে রাসূলুল্লাহর ঘুম ভেঙে গেল। মহানবী সঙ্গে সঙ্গে জিবরাইল আলাইহিস সালামকে চিনতে পারলেন এবং তাঁর রব হয়তো তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন – এই ভেবে খুবই শঙ্কিত হয়ে বললেন, “হে আমার ভাই জিবরাইল! এমন অসময়ে কেন এলে? আমি কি কোনো ভুল করেছি? আমার রবকে কি অসন্তুষ্ট করেছি? নাকি আমার জন্য কোনো দুঃসংবাদ এনেছ?”
“আমি খাবার-পানীয় চাই না। এসবের কোনোটিতেই আমার মন নেই। আমার রবের ইবাদত করা ও তাঁর কাছে মিনতি করার জন্য একটু জায়গাই আমার যথেষ্ট” হাদীস শরীফ
জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, “হে সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ! হে সৃষ্টিকর্তার প্রিয়তম, হে নবীদের সরদার, কল্যাণের উৎস, শ্রেষ্ঠত্বের আধার, সম্মানিত ও মহান নবী! আপনার রব আপনাকে সালাম জানাচ্ছেন এবং আপনাকে তাঁর কাছে ডাকছেন। দয়া করে উঠুন, চলুন যাই।” আমাদের প্রিয় নবী অজু করলেন। জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহর মুবারক মাথায় নূরের একটি পাগড়ি পরিয়ে দিলেন, গায়ে নূরের পোশাক পরালেন, মুবারক কোমরে ইয়াকুতের একটি কোমরবন্ধ বেঁধে দিলেন। মুবারক হাতে চারশো মুক্তা খচিত পান্নার একটি লাঠি দিলেন। প্রতিটি মুক্তা শুকতারার মতো ঝলমল করছিল। মুবারক পায়ে সবুজ পান্নার পাদুকা পরিয়ে দিলেন।
তারপর হাতে হাত ধরে তাঁরা কাবায় এলেন। এখানে জিবরাইল আলাইহিস সালাম আমাদের প্রিয় নবীর মুবারক বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। তাঁর হৃদয় বের করে জমজমের পানি দিয়ে ধুলেন। তারপর হিকমত ও ঈমানে পূর্ণ একটি পাত্র এনে তা হৃদয়ে ঢেলে দিলেন এবং বক্ষ বন্ধ করে দিলেন।
আমাদের প্রথম কিবলা মসজিদুল আকসা / বাইতুল মুকাদ্দাস
তারপর জিবরাইল আলাইহিস সালাম জান্নাত থেকে আনা বুরাক নামের সাদা প্রাণীটির দিকে ইশারা করে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এতে আরোহণ করুন! সব ফেরেশতা আপনার অপেক্ষায় আছেন।” তখন মহানবীর ওপর এক বিষণ্নতা নেমে এল, তিনি গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা জিবরাইল আলাইহিস সালামকে সম্বোধন করে বললেন, “হে জিবরাইল! জিজ্ঞেস করো! আমার হাবিব কেন বিষণ্ন?” তখন মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তর দিলেন, “এত সম্মান ও মর্যাদা পেয়ে আমার মনে হলো, কিয়ামতের দিন আমার দুর্বল উম্মতের কী অবস্থা হবে? পঞ্চাশ হাজার বছর আরাসাতের ময়দানে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে তারা এত গুনাহের বোঝা কীভাবে বইবে, আর ত্রিশ হাজার বছরের পথ পুলসিরাত কীভাবে পার হবে?” তখন আল্লাহর ফরমান এল, “হে আমার হাবিব! মন প্রশান্ত রাখো। তোমার উম্মতের জন্য পঞ্চাশ হাজার বছরের সময়কে আমি এক মুহূর্তের মতো করে দেব। দুঃখ কোরো না!”
মহানবী বুরাকে আরোহণ করলেন। বুরাক খুব দ্রুত চলছিল, এক কদমে দৃষ্টিসীমার ওপারে পৌঁছে যাচ্ছিল। পথে জিবরাইল আলাইহিস সালাম আমাদের প্রিয় নবীকে কয়েকটি মনজিলে নেমে নামাজ পড়তে বললেন। জগৎসমূহের সরদার তখন ঠিক তিনবার নেমে নামাজ আদায় করলেন। তারপর জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, যেসব জায়গায় তিনি নামাজ পড়েছেন, সেগুলো তিনি চেনেন কি না। নিজেই উত্তর দিয়ে জিবরাইল জানালেন, প্রথম যেখানে তিনি নেমেছিলেন, তা মদিনা, আর এই শহরে তিনি হিজরত করবেন। বাকি জায়গাগুলোর একটি হলো তুর সিনা, যেখানে হযরত মূসা দিকহীন ও অজ্ঞাত পন্থায় আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কথা বলেছিলেন; আর সর্বশেষটি হলো বাইতুল লাহম, যেখানে ঈসা আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তারপর তাঁরা বাইতুল মুকাদ্দাসের মসজিদুল আকসায় এলেন।
মসজিদুল আকসায় জিবরাইল আলাইহিস সালাম আঙুল দিয়ে একটি পাথর ছিদ্র করে তাতে বুরাককে বাঁধলেন। সেখানে পূর্ববর্তী কয়েকজন নবীর রুহ মানুষের আকৃতিতে সমবেত হয়েছিলেন। জামাআতে নামাজের জন্য পর্যায়ক্রমে আদম, নূহ ও ইবরাহিম নবীগণকে (আলাইহিমুস সালাম) ইমাম হতে বলা হলো। তাঁরা অপারগতা প্রকাশ করে তা গ্রহণ করলেন না। জিবরাইল “আপনি থাকতে অন্য কেউ ইমাম হতে পারেন না” বলে হাবিবুল্লাহকে সামনে এগিয়ে দিলেন।
মহানবী নবীগণের ইমাম হয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়ালেন। এরপরের ঘটনা তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন: “জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আমার কাছে এক পাত্র জান্নাতের শরাব আর এক পাত্র দুধ নিয়ে এলেন। আমি দুধ নিলাম। জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আমাকে বললেন, ‘আপনি ফিতরাত (দুই জাহানের সৌভাগ্য) বেছে নিয়েছেন।’ এরপর আরও দুটি পেয়ালা পেশ করা হলো। একটিতে পানি, অন্যটিতে মধু; আমি দুটি থেকেই পান করলাম। জিবরাইল বললেন, ‘মধু ইঙ্গিত করে যে, আপনার উম্মত কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে, আর পানি ইঙ্গিত করে যে, আপনার উম্মত গুনাহ থেকে পবিত্র হবে।’ তারপর আমরা একসঙ্গে আসমানে উঠলাম। জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) দরজায় করাঘাত করলেন। জিজ্ঞেস করা হলো, ‘তুমি কে?’ ‘আমি জিবরাইল।’ ‘আর তোমার সঙ্গে কে?’ ‘তিনি মুহাম্মদ (আলাইহিস সালাম)।’ ‘তাঁর কাছে কি (আসমানে আরোহণের জন্য ওহী ও মিরাজের দাওয়াত) পাঠানো হয়েছে?’ ‘হ্যাঁ, পাঠানো হয়েছে।’ তাঁরা বললেন, ‘আগত মহান অতিথিকে মারহাবা! কত উত্তম মুসাফির এই আগন্তুক!’ আর সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। আমি নিজেকে আদমের (আলাইহিস সালাম) সামনে দেখতে পেলাম। তিনি আমাকে ‘মারহাবা’ বললেন এবং দোয়া করলেন… আদম আলাইহিস সালামের ডানে ও বাঁয়ে কিছু মানুষের রুহ ছায়ামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। আদম (আলাইহিস সালাম) যতবার ডান দিকে তাকাচ্ছিলেন, মুচকি হাসছিলেন, আর যতবার বাঁ দিকে তাকাচ্ছিলেন, কাঁদছিলেন। জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই ছায়ামূর্তিগুলো আদমের বংশধরদের রুহ। ডানের লোকেরা জান্নাতি, আর বাঁয়ের লোকেরা জাহান্নামি! তাই ডানে তাকালে তিনি মুচকি হাসেন, বাঁয়ে তাকালে কাঁদেন!’
“হে সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ! হে সৃষ্টিকর্তার প্রিয়তম, হে নবীদের সরদার, কল্যাণের উৎস, শ্রেষ্ঠত্বের আধার, সম্মানিত ও মহান নবী! আপনার রব আপনাকে সালাম জানাচ্ছেন এবং আপনাকে তাঁর কাছে ডাকছেন। দয়া করে উঠুন, চলুন যাই” জিবরাইল আলাইহিস সালাম
সেখানে আমি বহু ফেরেশতা দেখলাম। তাঁরা সবাই খুশু-খুজুর সঙ্গে কিয়ামে দাঁড়িয়ে ‘সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রুহ’ জিকিরে মশগুল ছিলেন। আমি জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ফেরেশতাদের ইবাদত কি এটাই?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। সৃষ্টির পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁরা কিয়ামের অবস্থায় থাকবেন। হক তাআলার কাছে প্রার্থনা করুন, তিনি যেন এই ইবাদত আপনার উম্মতকে নসিব করেন।’ আমি হক তাআলার কাছে প্রার্থনা করলাম। তিনি আমার দোয়া কবুল করলেন। নামাজের কিয়াম এটাই।
(সেখানে) একদল লোকের পাশ দিয়ে গেলাম। ফেরেশতারা তাদের মাথা থেঁতলে দিচ্ছিলেন, মাথা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসছিল। আবার আঘাত করছিলেন, আবার আগের মতো হয়ে যাচ্ছিল। আমি বললাম, ‘এরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘যারা জুমা ও জামাআত ত্যাগ করে, যারা রুকু ও সিজদা পূর্ণরূপে আদায় করে না।’
একদল লোক দেখলাম। তারা ক্ষুধার্ত ও বিবস্ত্র ছিল। জাবানিয়ারা তাদের জাহান্নামে পশুর মতো চরাতে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি বললাম, ‘এরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘যারা গরিবদের প্রতি দয়া করে না এবং যাকাত দেয় না।’
একদল লোকের পাশ দিয়ে গেলাম। তাদের সামনে উপাদেয় খাবার রাখা হয়েছে। আরেক পাশে পড়ে আছে পচা মৃতদেহ। তারা সেই উপাদেয় খাবার ফেলে পচা মৃতদেহ খাচ্ছিল। আমি বললাম, ‘এরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘এরা সেই পুরুষ ও নারী, যারা হালাল ছেড়ে হারামের দিকে ঝোঁকে। হালাল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এরা হারাম খায়।’
(কিছু) লোক দেখলাম, পিঠের বোঝার ভারে যারা নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ওই অবস্থাতেই তারা মানুষকে ডেকে ডেকে তাদের ওপর আরও বোঝা চাপিয়ে দিতে বলছিল। আমি বললাম, ‘এরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘এরা আমানতের খেয়ানতকারী। মানুষের হক মেরে নেওয়ার পরও এরা আবার জুলুম করে।’
নিজেদের গোশত কেটে খাচ্ছে এমন একদল লোকের পাশ দিয়ে আমরা গেলাম। আমি বললাম, ‘এরা কারা?’ জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ‘এরা গিবতকারী ও চোগলখোর।’
একদল লোক দেখলাম, যাদের মুখ কালো, চোখ নীল, ওপরের ঠোঁট কপাল পর্যন্ত উঠে গেছে, নিচের ঠোঁট পা পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে, আর মুখ থেকে রক্ত ও পুঁজ ঝরছে। তাদের আগুনের পেয়ালায় জাহান্নাম থেকে প্রবাহিত বিষাক্ত রক্ত ও পুঁজ পান করানো হচ্ছিল, আর তারা গাধার মতো চিৎকার করছিল। আমি বললাম, ‘এরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘এরা মদপানকারী।’
আমরা একদল লোকের দেখা পেলাম, যাদের জিভ মাথা থেকে টেনে বের করা হয়েছে, চেহারা বদলে খিনজিরের (শূকরের) আকৃতিতে পরিণত করা হয়েছে, আর এ অবস্থায় তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ‘এরা মিথ্যা সাক্ষ্যদানকারী।’
আমরা আরেক সম্প্রদায়ের দেখা পেলাম। তাদের পেট ফুলে নিচে ঝুলে পড়েছে, গায়ের রং নীল হয়ে গেছে, হাত-পা বাঁধা, নিজেদের জায়গা থেকে তারা উঠতে পারছিল না। জিবরাইলকে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ‘এরা সুদখোর।’1
কিছু নারীর দেখা পেলাম। তাদের মুখ কালো, চোখ নীল। তাদের আগুনের পোশাক পরানো হয়েছে। ফেরেশতারা আগুনের গদা দিয়ে তাদের পেটাচ্ছিলেন। তারা কুকুর ও শূকরের মতো আর্তনাদ করছিল। আমি বললাম, ‘এরা কারা?’ জিবরাইল বললেন, ‘এরা ব্যভিচারিণী এবং স্বামীকে কষ্টদানকারী নারী।’
একদল লোক দেখলাম। তারা সংখ্যায় অনেক। জাহান্নামের উপত্যকাগুলোতে তাদের বন্দি করে রাখা হয়েছে। আগুন তাদের পুড়িয়ে ফেলে, তারা আবার জীবিত হয়, আগুন আবার পোড়ায়। আমি বললাম, ‘এরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘এরা পিতার অবাধ্য সন্তান।’
একদল মানুষের পাশ দিয়ে গেলাম। তাঁরা শস্য বুনছিলেন, আর তা মুহূর্তের মধ্যে বেড়ে উঠে শিষ ধরছিল। আমি বললাম, ‘এঁরা কারা?’ জিবরাইল বললেন, ‘যাঁরা আল্লাহ তাআলার জন্য ইবাদত করেন।’
আমি একটি সমুদ্রের কাছে পৌঁছালাম। এই সমুদ্রের বিস্ময়কর অবস্থা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তা দুধের চেয়েও সাদা, আর তাতে পাহাড়ের মতো ঢেউ। আমি বললাম, ‘এটা কোন সমুদ্র?’ তিনি বললেন, ‘এই সমুদ্রের নাম জীবনের সমুদ্র। হক তাআলা যখন মৃতদের জীবিত করবেন, তখন এই সমুদ্র থেকে বৃষ্টি বর্ষাবেন। পচে-গলে ছড়িয়ে যাওয়া দেহগুলো জীবিত হয়ে ঘাস গজানোর মতো কবর থেকে উঠে আসবে…’
তারপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে উঠলাম। জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আবার দরজায় করাঘাত করলেন। বলা হলো, ‘তুমি কে?’ ‘আমি জিবরাইল।’ ‘আর তোমার সঙ্গে কে?’ ‘তিনি মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম।’ ‘তাঁর কাছে কি ওহী ও মিরাজের দাওয়াত পাঠানো হয়েছে?’ ‘হ্যাঁ, এসেছে।’ বলা হলো, ‘আগত মহান অতিথিকে মারহাবা! কত উত্তম মুসাফির এই আগন্তুক!’ আর সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। আমি নিজেকে পরস্পর খালাতো ভাই ঈসা ও ইয়াহইয়া ইবনে জাকারিয়ার (আলাইহিমাস সালাম) কাছে দেখতে পেলাম। তাঁরা আমাকে ‘মারহাবা’ বললেন এবং দোয়া করলেন… (ঈসা আলাইহিস সালাম ছিলেন মাঝারি গড়নের, গমের মতো উজ্জ্বল রঙের।)
ফেরেশতাদের একটি দলের দেখা পেলাম। তাঁরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সবাই রুকুতে। তাঁদের নিজস্ব একটি তাসবিহ ছিল। তাঁরা সবসময় রুকুতেই থাকেন, মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকান না। জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ‘এই ফেরেশতাদের ইবাদত এমনই। হক তাআলার কাছে চেয়ে নিন, যেন আপনার উম্মতের নসিব হয়।’
আমি দোয়া করলাম। তিনি তা কবুল করে নামাজে রুকু দান করলেন। তারপর আমরা তৃতীয় আসমানে উঠলাম। একই প্রশ্নোত্তরের পর দরজা খুলে গেল, আর আমি নিজেকে ইউসুফের (আলাইহিস সালাম) কাছে দেখতে পেলাম। দেখলাম, তাঁকে সৌন্দর্যের অর্ধেক দান করা হয়েছে। তিনি আমাকে ‘মারহাবা’ বললেন এবং দোয়া করলেন…
বহু ফেরেশতা দেখলাম। তাঁরা সারিবদ্ধ, সবাই সিজদায়। সৃষ্টির পর থেকেই তাঁরা সিজদায় আছেন এবং নিজস্ব তাসবিহ পাঠ করছেন। জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) বললেন, ‘এই ফেরেশতাদের ইবাদত এমনই। আল্লাহ তাআলার কাছে চেয়ে নিন, যেন এই আমল আপনার উম্মতের জন্য সহজ করে দেন।’ আমি হক তাআলার কাছে চাইলাম। তিনি তা কবুল করলেন এবং নামাজে তা তোমাদের নসিব করলেন।
তারপর আমি চতুর্থ আসমানে পৌঁছালাম। এর দরজা খাঁটি রুপায় তৈরি, নূরের দরজা। তাতে নূরের একটি তালা ঝোলানো। তালার ওপর লেখা ছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। একই প্রশ্নোত্তরের পর আমি নিজেকে ইদরিসের (আলাইহিস সালাম) কাছে দেখতে পেলাম। তিনি আমাকে ‘মারহাবা’ বললেন এবং দোয়া করলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে (মর্মার্থে) ইরশাদ করেছেন, ‘আমি তাঁকে উচ্চ স্থানে উন্নীত করেছি।’2
এক ফেরেশতাকে দেখলাম, একটি আসনে বিষণ্ন ও চিন্তিত মুখে বসে আছেন। তাঁর চারপাশে এত ফেরেশতা ছিলেন যে, তাঁদের সংখ্যা কেবল মহান আল্লাহই জানেন। তাঁর ডান দিকে নূরানি ফেরেশতাদের দেখলাম। তাঁরা সবুজ পোশাক পরিহিত, তাঁদের থেকে চমৎকার সুগন্ধ ছড়াচ্ছিল। তাঁদের প্রত্যেকের সৌন্দর্য এমন যে, তাঁদের মুখের দিকে তাকানো যায় না। তাঁর বাঁ দিকে ছিলেন এমন ফেরেশতারা, যাঁদের মুখ থেকে আগুন ছিটকে বেরোচ্ছিল। তাঁদের সামনে আগুনের বর্শা ও চাবুক রাখা। তাঁদের চোখ এমন যে, সেদিকে তাকানোর সাধ্য কারও নেই। আসনে বসা ফেরেশতার মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ। তিনি সবসময় সামনের খাতার দিকে তাকিয়ে থাকেন, এক মুহূর্তের জন্যও তা থেকে চোখ সরান না। তাঁর সামনে একটি গাছ ছিল। এর প্রতিটি পাতায় একজন মানুষের নাম লেখা ছিল। তাঁর সামনে গামলার মতো একটি জিনিসও ছিল। তিনি কখনো ডান হাতে তা থেকে কিছু নিয়ে ডান পাশের নূরানি ফেরেশতাদের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন, কখনো বাঁ হাতে কিছু নিয়ে বাঁ পাশের জুলমানি ফেরেশতাদের দিচ্ছিলেন। (সেই) ফেরেশতার দিকে তাকাতেই আমার হৃদয়ে ভয় জাগল। জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ফেরেশতা কে?’ তিনি বললেন, ‘ইনি আজরাইল। তাঁর মুখের দিকে তাকানোর সাধ্য কারও নেই।’ জিবরাইল তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, ’হে আজরাইল!
“‘আগত মহান অতিথিকে মারহাবা! কত উত্তম মুসাফির এই আগন্তুক!’ – তাঁরা বললেন, আর সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল; আমি নিজেকে আদমের (আলাইহিস সালাম) সামনে দেখতে পেলাম” হাদীস শরীফ
ইনি আখেরি জামানার নবী, আল্লাহ তাআলার হাবিব, তাঁর প্রিয়তম।’ আজরাইল (আলাইহিস সালাম) মাথা তুলে মুচকি হাসলেন। উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে সম্মান জানালেন এবং বললেন, ‘মারহাবা! হক তাআলা আপনার চেয়ে সম্মানিত কাউকে সৃষ্টি করেননি। আপনার উম্মতও সব উম্মতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনার উম্মতের প্রতি আমার মমতা তাদের মা-বাবার চেয়েও বেশি।’ তখন আমি বললাম, ‘তোমার কাছে আমার একটি অনুরোধ আছে। আমার উম্মত দুর্বল। তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ কোরো। তাদের রুহ নম্রতার সঙ্গে কবজ কোরো।’ তিনি বললেন, ’যিনি আপনাকে সর্বশেষ নবী করে পাঠিয়েছেন এবং নিজের হাবিব বানিয়েছেন, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, আল্লাহ তাআলা দিনে ও রাতে সত্তরবার আমাকে এই আদেশ দেন:
‘উম্মতে মুহাম্মদির রুহ কোমলতা ও সহজতার সঙ্গে কবজ করো এবং তাদের কাজ দয়ার সঙ্গে সম্পন্ন করো।’ এ জন্য আমিও আপনার উম্মতের প্রতি তাদের মা-বাবার চেয়েও বেশি মমতা দেখাই।’ তারপর আমরা পঞ্চম আসমানে উঠলাম। সেখানে হারুনের3 (আলাইহিস সালাম) সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমাকে ‘মারহাবা’ বললেন এবং কল্যাণের দোয়া করলেন। পঞ্চম আসমানের ফেরেশতাদের ইবাদত দেখলাম। তাঁরা সবাই দাঁড়িয়ে পায়ের আঙুলের দিকে তাকিয়ে আছেন। অন্য কোনো দিকে কখনো তাকান না, উচ্চস্বরে তাসবিহ পাঠ করেন। জিবরাইলকে (আলাইহিস সালাম) জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ফেরেশতাদের ইবাদত কি এমনই?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, হক তাআলার কাছে প্রার্থনা করুন, তিনি যেন এই ইবাদত আপনার উম্মতকে নসিব করেন।’ আমি দোয়া করলাম। মহান আল্লাহ তা দান করলেন। তারপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে উঠলাম। সেখানে মূসার (আলাইহিস সালাম) সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমাকে ‘মারহাবা’ বললেন এবং কল্যাণের দোয়া করলেন।
তারপর আমরা সপ্তম আসমানে উঠলাম। একই প্রশ্নোত্তরের পর ইবরাহিমকে (আলাইহিস সালাম) বাইতুল মামুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকতে দেখলাম। এই বাইতুল মামুরে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন (এবং তাঁদের পালা আর কখনো আসে না)। আমি ইবরাহিমকে (আলাইহিস সালাম) সালাম দিলাম। তিনি আমার সালামের জবাব দিলেন। বললেন, ‘মারহাবা, হে নেককার নবী, হে নেককার সন্তান!’ (তারপর বললেন,) ‘হে মুহাম্মদ! জান্নাতের জমি অত্যন্ত কোমল, মাটি পবিত্র। তোমার উম্মতকে বলো, তারা যেন সেখানে অনেক গাছ লাগায়।’ আমি বললাম, ‘জান্নাতে গাছ লাগানো হয় কীভাবে?’ তিনি বললেন, ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ (এক বর্ণনায়: সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার) তাসবিহ পাঠ করে।’ তারপর জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে গেলেন। সিদরাতুল মুনতাহা এমন একটি গাছ, যার শিকড় ষষ্ঠ আসমানে, কাণ্ড ও ডালপালা সপ্তম আসমানের ওপরে; এর পাতা হাতির কানের মতো, আর ফল মিনারের মতো।4 যেন এটি এমন এক গাছ, যা নিজের ছায়ায় সব আসমান ও জান্নাতকে ঢেকে রেখেছে। আল্লাহ তাআলার প্রতাপ ও মহিমার নূরের তাজাল্লিতে তা নানা রঙে রঙিন হচ্ছিল, ইয়াকুত, পান্না বা এ জাতীয় রত্নে সজ্জিত হয়ে এমন সুন্দর হয়ে উঠছিল যে, আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগতের কেউই এর সৌন্দর্য বর্ণনা করতে পারবে না।
জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহার ওপারে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিলেন। আমি বললাম, ‘হে জিবরাইল! আমাকে কি একা রেখে যাচ্ছ?’ জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) অস্থির হয়ে পড়লেন। হক তাআলার প্রতাপে কাঁপতে লাগলেন এবং বললেন, ‘হে মুহাম্মদ! যদি (আর) এক কদম এগোই, তবে আল্লাহ তাআলার মহিমার তেজে ধ্বংস হয়ে যাব। আমার সমগ্র অস্তিত্ব জ্বলে নিঃশেষ হয়ে যাবে।’”
জগৎসমূহের সরদার এ পর্যন্ত জিবরাইল আলাইহিস সালামের সঙ্গে এসেছিলেন। এখানে জিবরাইল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহকে নিজের সৃষ্টিগত আসল রূপে দেখা দিলেন – ছয় লাখ ডানা মেলে, আর প্রতিটি ডানা থেকে মুক্তা ও ইয়াকুত ঝরে পড়ছিল।
তারপর সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল দীপ্তিময়, রফরফ নামের সবুজ এক জান্নাতি বিছানা এল। সেটি অবিরাম আল্লাহ তাআলার জিকিরে মশগুল ছিল; যে জগতে তা থাকত, তাসবিহের ধ্বনিতে সেই জগৎ ভরে যেত। রফরফ মহানবীকে সালাম জানাল। রাসূলুল্লাহ রফরফের ওপর বসলেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁরা অনেক উঁচুতে উঠে গেলেন, হিজাব নামের সত্তর হাজার পর্দা অতিক্রম করলেন। প্রতি দুই হিজাবের মাঝে দূরত্ব ছিল অনেক। প্রতিটি পর্দায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতারা ছিলেন। রফরফ মহানবীকে একে একে সেই পর্দাগুলো পার করিয়ে নিল। এভাবে তাঁরা কুরসি, আরশ ও রুহের জগৎ পেরিয়ে গেলেন। হাবিবে আকরাম ও নবীয়ে মুহতারাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিটি পর্দা অতিক্রম করার সময় এই আদেশ শুনতে পাচ্ছিলেন: “ভয় পেয়ো না, হে মুহাম্মদ! কাছে এসো, কাছে এসো!” তিনি এত নিকটবর্তী হলেন যে, কাবা কাওসাইনের মাকামে পৌঁছে গেলেন। অজ্ঞাত, অবোধগম্য ও অবর্ণনীয়ভাবে তিনি আল্লাহ তাআলার ইচ্ছামতো উচ্চতাসমূহে পৌঁছালেন। স্থানহীন, কালহীন, দিকহীন ও ধরনহীনভাবে রুইয়াত (দর্শন) হলো, অর্থাৎ তিনি আল্লাহ তাআলাকে দেখলেন। চোখ ছাড়া, কান ছাড়া, কোনো মাধ্যম ও উপকরণ ছাড়া তিনি তাঁর রবের সঙ্গে কথা বললেন। কোনো সৃষ্টি যা জানতে পারবে না, বুঝতে পারবে না, এমন নিয়ামতসমূহ তিনি লাভ করলেন।
হযরত ইমাম রব্বানি “মাকতুবাত” গ্রন্থে বলেন, “সেই সরদার (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) মিরাজের রাতে তাঁর রবকে দুনিয়াতে দেখেননি, আখিরাতে দেখেছেন। কারণ রাসূল আলাইহিস সালাম সেই রাতে কাল ও স্থানের গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি অনাদি ও অনন্ত এক মুহূর্ত লাভ করেছিলেন। শুরু ও শেষকে তিনি একটি বিন্দুরূপে দেখেছিলেন। যারা জান্নাতে যাবে, হাজার হাজার বছর পর তাদের জান্নাতে যাওয়া এবং জান্নাতে থাকা তিনি সেই রাতেই দেখেছিলেন। সুতরাং সেই মাকামের দেখা দুনিয়ার দেখা নয়; তা আখিরাতের দৃষ্টিতে দেখা।”
মহানবীকে যখন বলা হলো, “তোমার রবের প্রশংসা করো!”, তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তাইয়িবাতু” (অর্থাৎ ভাষার মাধ্যমে করা সমস্ত স্তুতি, প্রশংসা ও গুণগান, দেহের মাধ্যমে করা সমস্ত সেবা ও আনুগত্য, সম্পদের মাধ্যমে করা সমস্ত কল্যাণ ও দান আল্লাহ তাআলার জন্যই হোক)।
“হক তাআলা আপনার চেয়ে সম্মানিত কাউকে সৃষ্টি করেননি। আপনার উম্মতও সব উম্মতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ” আজরাইল আলাইহিস সালাম
প্রথমে আল্লাহ তাআলা চোখ ছাড়া, কান ছাড়া, কোনো মাধ্যম ছাড়া, স্থানহীনভাবে তাঁর হাবিবকে সালাম দিয়ে বললেন, “আসসালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবিয়ু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু” (হে আমার রাসূল! আমার সালাম, বরকত ও রহমত তোমার ওপর বর্ষিত হোক)। মহানবী উত্তরে বললেন, “আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহিন” (হে আমার রব! আমাদের ওপর এবং তোমার নেক বান্দাদের ওপরও সালাম বর্ষিত হোক)।
এ কথা শুনে ফেরেশতারা সমস্বরে বললেন, “আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু” (চোখে দেখার মতো আমি জানি ও বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোনো ইলাহ নেই। মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম তাঁর বান্দা ও রাসূল)।
মহানবী যখন “আসসালামু আলাইনা…” বললেন, তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, “হে আমার হাবিব! এখানে তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ নেই। তুমি কেন ‘আলাইনা’ (আমাদের ওপর) বললে?” রাসূলুল্লাহ উত্তরে বললেন:
“হে আমার ইলাহ! আমার উম্মতের দেহ যদিও আমার সঙ্গে নেই, তবু তাদের রুহ আমার সঙ্গে আছে। আমার অনুগ্রহের দৃষ্টি ও পূর্ণ মনোযোগ তাদের থেকে দূরে নয়। তুমি আমাকে সালাম দিয়েছ, আমাকে সব অনিষ্ট থেকে দূরে রেখেছ। আখেরি জামানার ফিতনায় আক্রান্ত আমার সেই দরিদ্র, দুঃখী উম্মতকে আমি এই মহান সম্মান ও দান থেকে কীভাবে বঞ্চিত করব? এমন নিয়ামত থেকে তাদের কীভাবে ভাগ্যহীন রাখব?”
আল্লাহ তাআলা বললেন, “হে আমার হাবিব! আজ রাতে তুমি আমার মেহমান। আমার কাছে চাও, কী চাও?” রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “আমি আমার উম্মতকে চাই (হে আমার রব!)।”
বর্ণনায় আছে, হক তাআলা এই প্রশ্ন সাতশোবার করলেন। রাসূলুল্লাহ প্রতিবারই উত্তর দিলেন, “আমি আমার উম্মতকে চাই।” আল্লাহ তাআলা যখন বললেন, “তুমি কেবল তোমার উম্মতকেই চাও”, তখন তিনি আবেদন করলেন, “হে আমার রব! প্রার্থী আমি, দাতা তুমি। আমার সমস্ত উম্মতকে আমাকে দান করো।” মহান আল্লাহ বললেন, “যদি তোমার সব উম্মতকে আজ রাতেই তোমাকে দান করে দিই, তবে আমার রহমত ও তোমার মর্যাদা প্রকাশ পাবে না। এক অংশ আজ রাতে তোমাকে দান করলাম। দুই অংশ পরে রাখলাম। কিয়ামতের দিন তুমি চাইবে, আর আমি ক্ষমা করব, যাতে আমার রহমত ও তোমার মর্যাদা (সম্মান) প্রকাশিত হয়।”
আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক হাদীস শরীফে ইরশাদ করেন, “সেই রাতে (মিরাজের রাতে) আমি আল্লাহ তাআলার কাছে চাইলাম, তিনি যেন আমার সমস্ত উম্মতের হিসাব আমার হাতে সোপর্দ করেন। হক তাআলা বললেন, ‘হে মুহাম্মদ! তোমার উদ্দেশ্য হলো, তোমার উম্মতের দোষত্রুটি যেন কেউ জানতে না পারে। আর আমার ইচ্ছা হলো, যেহেতু তুমি দয়ালু নবী, তাই তাদের দোষত্রুটি ও মন্দ কাজ অপরিচিতদের মতো তোমার কাছ থেকেও গোপন থাকুক। হে মুহাম্মদ! তুমি তাদের পথপ্রদর্শক। আমি তাদের রব। তুমি তাদের সবেমাত্র দেখলে। আমি অনাদিকাল থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত তাদের দেখেছি এবং দেখছি। হে মুহাম্মদ! তোমার উম্মতের সঙ্গে কথা বলা যদি আমি ভালো না বাসতাম, তবে কিয়ামতের দিন তাদের হিসাবের মুখোমুখি করতাম না। বড় হোক বা ছোট, তাদের কোনো গুনাহের কথাই জিজ্ঞেস করতাম না।’”
“আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘হে মুহাম্মদ! তোমার মুবারক চোখ খোলো এবং তোমার পায়ের নিচে তাকাও।’ আমি তাকিয়ে এক মুঠো মাটি দেখলাম। হক তাআলা বললেন, ‘সমস্ত সৃষ্ট বস্তু তোমার পায়ের মাটি। আমার সেই মাটিকে কি তুমি বন্ধুর দরবারে নিয়ে এসেছ? বন্ধুর আঁচলে লেগে থাকা ধুলো ক্ষমা করার চেয়েও তোমার উম্মতকে ক্ষমা করা আমার কাছে আরও সহজ।’”
তোমার উম্মত তোমাকে দিলাম, হে হাবিব!
আমার জান্নাত তাদের করে দিলাম নসিব।
হে আমার হাবিব, কী-ই বা চেয়েছিলে তুমি,
এক মুঠো মাটির জন্য মিনতি করলে তুমি?
মহানবী এক হাদীস শরীফে ইরশাদ করেন, “হক তাআলার কাছে আমি অনেক প্রশ্ন করলাম। উত্তর শুনলাম। প্রশ্ন করে অনুতপ্ত হলাম। (তার কয়েকটি এই:)
‘হে আমার রব! জিবরাইলকে তুমি ছয় লাখ ডানা দিয়েছ। এর বিপরীতে আমার প্রতি তোমার দান কী?’ হক তাআলা বললেন, ‘তোমার একটি চুল আমার কাছে জিবরাইলের ছয় লাখ ডানার চেয়েও প্রিয়। তোমার একটি চুলের উসিলায় কিয়ামতের দিন আমি হাজার হাজার পাপী গুনাহগারকে মুক্তি দেব। হে মুহাম্মদ! জিবরাইল তাঁর ডানা মেললে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী সবকিছু ভরে যায়। তুমি শাফায়াত করলে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী স্থান পাপীতে ভরা থাকলেও তাদের সবাইকে আমি তোমাকে দান করব।’ আমি বললাম, ‘আমার পিতা আদমকে (আলাইহিস সালাম) তুমি ফেরেশতাদের দিয়ে সিজদা করিয়েছ। এর বিপরীতে আমার প্রতি তোমার সম্মান কী?’
হক তাআলা বললেন, ‘ফেরেশতারা আদমকে সিজদা করেছিলেন, কারণ তাঁর ললাটে তোমার নূর ছিল। হে মুহাম্মদ! তোমাকে আমি এর চেয়েও শ্রেষ্ঠ জিনিস দিয়েছি। তোমার নামকে আমি আমার নামের কাছাকাছি রেখেছি এবং আরশে আলার ওপর লিখে রেখেছি। তখনো আদম সৃষ্টি হননি, তাঁর নাম-নিশানাও ছিল না। তোমার নাম আমি আসমানের দরজাগুলোতে, হিজাবগুলোর ওপর, জান্নাতের দরজাগুলোতে, প্রাসাদে ও গাছে – জান্নাতের সর্বত্র লিখে রেখেছি। জান্নাতে এমন কিছুই নেই, যার ওপর “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” লেখা নেই। এই মর্যাদা আদমকে দেওয়া মর্যাদার চেয়েও শ্রেষ্ঠ।’
আমি যখন তোমায় ভালোবেসেছি, হে মহিমান্বিত!
দুই জাহান কি তোমার হবে না, হে কোমল প্রিয়!
তোমার সত্তাকে করেছি আমার সত্তার দর্পণ,
আমার নামের সঙ্গে লিখেছি তোমার নাম।
‘হে আমার রব! নূহকে (আলাইহিস সালাম) তুমি নৌকা দিয়েছ। এর বিপরীতে আমাকে কী দান করেছ?’ তিনি বললেন, ‘তোমাকে বুরাক দিয়েছি, যার মাধ্যমে এক রাতে তোমাকে পৃথিবী থেকে আরশ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছি। তুমি জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেছ। তোমার উম্মতকে মসজিদ দিয়েছি; কিয়ামতের দিন তোমার উম্মত নৌকায় চড়ার মতো সেই মসজিদগুলোতে চড়ে চোখের পলকে পুলসিরাত পার হবে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।’ ‘হে আমার রব! বনি ইসরাইলের জন্য তুমি আসমান থেকে মান্না-হালুয়া ও বটেরসদৃশ পাখির গোশত নাজিল করেছিলে।’ হক তাআলা বললেন, ’তোমাকে ও তোমার উম্মতকে আমি দুনিয়া ও আখিরাতের নিয়ামত দান করেছি। বনি ইসরাইলের আকৃতি আমি মানুষের রূপ থেকে ভালুক, বানর ও শূকরের রূপে পরিবর্তন করেছিলাম। তোমার উম্মতের কারও সঙ্গে আমি তা করিনি। তারা ওদের মতো আমল করলেও এই বিপদ তাদের জন্য আমি সংগত মনে করিনি। হে মুহাম্মদ! তোমাকে আমি এমন একটি সূরা দিয়েছি, যার মতো সূরা তাওরাত ও ইঞ্জিলে নেই। সেই সূরা হলো সূরা ফাতিহা। যে কেউ এই সূরা পাঠ করবে, তার দেহ জাহান্নামের জন্য হারাম হয়ে যাবে। সেই ব্যক্তির মা-বাবার আজাবও আমি হালকা করে দেব। হে মুহাম্মদ! তোমার চেয়ে আকরাম (মূল্যবান, শ্রেষ্ঠ, সম্মানিত) কাউকে আমি সৃষ্টি করিনি। তোমার ও তোমার উম্মতের ওপর দিনে-রাতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলাম।
“সেই রাতে (মিরাজের রাতে) আমি আল্লাহ তাআলার কাছে চাইলাম, তিনি যেন আমার সমস্ত উম্মতের হিসাব আমার হাতে সোপর্দ করেন” হাদীস শরীফ
হে মুহাম্মদ! যারা আমার একত্ব মেনে নেয় এবং আমার সঙ্গে শরিক করে না, জান্নাত তাদেরই। তোমার এমন উম্মতের জন্য জাহান্নাম আমি হারাম করেছি। তোমার উম্মতের প্রতি আমার রহমত আমার ক্রোধকে ছাড়িয়ে গেছে।
হে মুহাম্মদ! আমার কাছে তুমি সমস্ত সৃষ্টির চেয়ে আকরাম ও সম্মানিত। কিয়ামতের দিন তোমাকে এমন সম্মানে ভূষিত করব যে, সমগ্র জগৎ বিস্মিত হবে। হে আমার হাবিব! তুমি জান্নাতে প্রবেশ না করা পর্যন্ত অন্য নবীগণ ও তাঁদের উম্মতের জন্য তা নিষিদ্ধ। তোমার উম্মত প্রবেশ না করা পর্যন্ত অন্য কোনো উম্মত প্রবেশ করবে না। হে মুহাম্মদ! তুমি কি দেখতে চাও, তোমার ও তোমার উম্মতের জন্য আমি কী কী প্রস্তুত করেছি?’ আমি বললাম, ‘চাই, হে আমার রব!’ তিনি ইসরাফিলকে সম্বোধন করে বললেন, ‘হে ইসরাফিল! আমার বান্দা, আমার বিশ্বস্ত ও আমার রাসূল জিবরাইলকে বলো, তিনি যেন আমার হাবিবকে জান্নাতে নিয়ে যান এবং আমার হাবিব ও তাঁর উম্মতের জন্য জান্নাতে আমি যা কিছু প্রস্তুত করেছি, তা দেখান। যেন তাঁর মুবারক মন দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়।’”
জগৎসমূহের সরদার আমাদের প্রিয় নবী ইসরাফিল আলাইহিস সালামের সঙ্গে জিবরাইল আলাইহিস সালামের কাছে এলেন। আল্লাহ তাআলার আদেশ পালনের জন্য জিবরাইল আলাইহিস সালাম মহানবীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জান্নাতে নিয়ে গেলেন। ফেরেশতারা হাতে থালা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন: একটিতে ছিল হুল্লা, অন্যটি ছিল নূরে পূর্ণ। জিবরাইল আলাইহিস সালাম বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এঁদের আদম আলাইহিস সালামের আশি হাজার বছর আগে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই স্থানে থালার জিনিসগুলো আপনার ও আপনার উম্মতের ওপর ছিটিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁরা অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন। কিয়ামতের দিন আপনি ও আপনার উম্মত আল্লাহ তাআলার আদেশে জান্নাতের চৌকাঠে পা রাখলে এই ফেরেশতারা থালার রত্নগুলো আপনাদের ওপর ছিটিয়ে দেবেন।” জান্নাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত রিদওয়ান নামের ফেরেশতা তাঁদের অভ্যর্থনা জানালেন। তিনি মহানবীকে সুসংবাদ দিলেন এবং বললেন, “হক তাআলা জান্নাতকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন – দুই ভাগ আপনার উম্মতকে আর এক ভাগ অন্য নবীগণের উম্মতদের দেওয়ার জন্য।” তারপর তিনি তাঁকে সারা জান্নাত ঘুরিয়ে দেখালেন। হাবিবে আকরাম বলেন, “জান্নাতের মাঝখানে একটি নদী দেখলাম।
তা আরশেরও ওপরে প্রবাহিত। এক জায়গা থেকে পানি, দুধ, শরাব ও মধু বের হয়। কখনো একটি অন্যটির সঙ্গে মেশে না। সেই নদীর তীর ছিল পান্নার। এর ভেতরের পাথরগুলো রত্ন, কাদা আম্বর, ঘাস জাফরান। এর চারপাশে রুপার পেয়ালা রাখা, যার সংখ্যা আকাশের তারার চেয়েও বেশি। এর চারপাশে পাখি ছিল, যাদের গলা উটের গলার মতো। যে কেউ এদের গোশত খাবে এবং সেই নদী থেকে পান করবে, সে হক তাআলার সন্তুষ্টি লাভ করবে। আমি জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটি কোন নদী?’ তিনি বললেন, ‘এটি কাওসার। হক তাআলা এটি আপনাকে দান করেছেন। আট জান্নাতের বাগানগুলোতে এই কাওসার থেকেই পানি প্রবাহিত হয়।’ সেই নদীর তীরে আমি কিছু তাঁবু দেখলাম। সবগুলোই মুক্তা ও ইয়াকুতের। জিবরাইলকে সেগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ‘এগুলো আপনার স্ত্রীদের আবাস।’ সেই তাঁবুগুলোতে আমি হুরদের দেখলাম। তাদের মুখ সূর্যের মতো ঝলমল করছিল, আর সবাই নানা মধুর সুরে গান গাইছিল। তারা বলছিল, ’আমরা আনন্দিত ও প্রফুল্ল। আমাদের কখনো দুঃখ আসে না।
আমরা সুসজ্জিত, কখনো বিবস্ত্র হই না। আমরা চিরযৌবনা, কখনো বৃদ্ধ হই না। আমরা উত্তম স্বভাবের, কখনো রাগ করি না। আমরা চিরকাল এমনই থাকি, কখনো মরি না।’ তাদের সুর ও কণ্ঠ সৌভাগ্যের প্রাসাদ ও গাছপালা পর্যন্ত পৌঁছে সব জায়গা ছেয়ে ফেলত। তাদের কণ্ঠস্বর এত মধুর যে, সেই সুর যদি দুনিয়ায় আসত, তবে দুনিয়ায় মৃত্যু ও দুঃখ-কষ্ট থাকত না। জিবরাইল বললেন, ‘আপনি কি এদের মুখ দেখতে চান?’ আমি বললাম, ‘চাই।’ তিনি একটি তাঁবুর দরজা খুললেন। আমি তাকালাম। এমন সুন্দর রূপ দেখলাম যে, সারা জীবন ধরে তাদের সৌন্দর্যের কথা বললেও শেষ করতে পারব না। তাদের মুখ দুধের চেয়েও সাদা, গাল ইয়াকুতের চেয়েও লাল এবং সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল। তাদের ত্বক রেশমের চেয়েও কোমল এবং চাঁদের মতো আলোকিত, সুবাস মেশকের চেয়েও মনোরম। চুল ঘন কালো – কারও বেণি করা, কারও খোঁপা বাঁধা, কারও খোলা; বসলে চারপাশে তাঁবুর মতো ছড়িয়ে পড়ে, দাঁড়ালে পা পর্যন্ত নেমে আসে। তাদের প্রত্যেকের সামনে একজন সেবক দাঁড়িয়ে থাকত। জিবরাইল বললেন, ‘এরা আপনার উম্মতের জন্য।’”
মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আমি আট জান্নাতের বাগবাগিচা ও সব ধরনের নিয়ামত দেখলাম। তখন আমার মনে হলো, জাহান্নাম ও তার স্তরগুলোও যদি দেখতাম! জিবরাইল আমার হাত ধরে আমাকে জাহান্নামের সবচেয়ে বড় ফেরেশতা মালিকের কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, ‘হে মালিক! হযরত মুহাম্মদ জাহান্নামে শত্রুদের স্থান দেখতে চান, তাঁকে জাহান্নাম দেখাও।’” মালিক জাহান্নামের ওপর থেকে আবরণ সরাতেই জাহান্নাম এমনভাবে টগবগ করে ফুটতে ও ফুলে উঠতে লাগল যে, মহানবী (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) নিজ চোখে স্পষ্ট দেখলেন: জাহান্নাম সবকিছু ধরে মুহূর্তে পুড়িয়ে ফেলে; সেখানে রয়েছে তৃষ্ণার আজাব, আজাবের শিকল, আজাবের সাপ ও বিচ্ছু, আর সেখানকার আরও কিছু আজাব।
“মালিক জাহান্নামের স্তরগুলো খুলে দিলেন। আমি সাতটি স্তরই দেখলাম। সপ্তম স্তরকে বলা হয় হাবিয়া। এর আজাব অন্য স্তরগুলোর চেয়ে বহুগুণ বেশি। আমি মালিককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই স্তরে কোন দলকে আজাব দেওয়া হয়?’ মালিক বললেন, ‘ফিরআউন, কারুন ও আপনার উম্মতের মুনাফিকদের (কপটদের) আজাব দেওয়া হয়।’ ষষ্ঠ স্তর হলো লাজা। সেখানে মুশরিকদের (যাদের কোনো ধর্মই নেই) আজাব দেওয়া হয়। পঞ্চম স্তর হলো হুতামা। সেখানে আগুনপূজারি, ষাঁড়পূজারি ও বৌদ্ধদের আজাব দেওয়া হয়।
চতুর্থ স্তর হলো জাহিম। সেখানে সূর্য ও তারকার পূজারিদের আজাব দেওয়া হয়। তৃতীয় স্তর হলো সাকার। সেখানে খ্রিস্টানদের আজাব দেওয়া হয়। দ্বিতীয় স্তর হলো সাইর। সেখানে ইহুদিদের আজাব দেওয়া হয়। প্রথম স্তর হলো জাহান্নাম। এর আজাব অন্য স্তরগুলোর আজাবের চেয়ে হালকা। (তবুও) সেখানে আমি আগুনের সত্তর হাজার সমুদ্র দেখলাম। প্রতিটি সমুদ্র এত বিশাল যে, যদি পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলীকে একটি সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয় এবং একজন ফেরেশতাকে খুঁজতে আদেশ করা হয়, তবে হাজার বছর খুঁজলেও তা পাওয়া সম্ভব হবে না। জাবানিয়ারা (জাহান্নামের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতারা) এত বিশাল যে, তাঁদের একজন যদি পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলীকে মুখের এক কোণে রাখেন, তবু তা টেরই পাওয়া যাবে না। সেই সমুদ্রগুলো উত্তাল হয়ে উঠত, ভয়ংকর গর্জন শোনা যেত। সেই আওয়াজের সামান্য অংশও যদি দুনিয়ায় আসত, তবে সব প্রাণী ধ্বংস হয়ে যেত।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই স্তর কোন দলের জন্য?’ মালিক উত্তর দিলেন না। আবার জিজ্ঞেস করলাম। তিনি চুপ রইলেন… জিবরাইল মালিককে বললেন, ‘তিনি তোমার কাছে উত্তর চাইছেন।’ মালিক ক্ষমা চেয়ে বললেন, ‘আমাকে মাফ করবেন।’ আমি বললাম, ‘যা-ই হোক, উত্তর দাও, যেন আজই এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করা যায়।’ মালিক বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি আপনার উম্মতের পাপীদের জন্য। তাদের নসিহত করুন, যেন তারা এই ভয়ংকর স্থান থেকে নিজেদের রক্ষা করে। যেসব কাজ দেহকে এমন আজাবের দিকে টেনে নেয়, সেগুলো থেকে যেন বিরত থাকে। সেদিন আমি পাপীদের প্রতি দয়া করব না। তাদের সাদা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধদের প্রতিও না, যুবকদের প্রতিও না।’”
“মিরাজ হলো সেই স্থান, যেখানে বুদ্ধি শেষ হয় আর ঈমান শুরু হয়” হাদীস শরীফ
জগৎসমূহের সরদার কাঁদতে শুরু করলেন। মুবারক মাথা থেকে পাগড়ি খুলে তিনি শাফায়াত করতে এবং (আল্লাহ তাআলার কাছে) মিনতি করতে লাগলেন। উম্মতের দুর্বলতা এবং এমন আজাব সহ্য করার সাধ্য যে তাদের নেই, তা বলে তিনি এমন কাঁদলেন যে, তাঁর সঙ্গে জিবরাইল আলাইহিস সালাম ও সব ফেরেশতাও কাঁদলেন। তখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সম্বোধন এল: “হে আমার হাবিব! আমার কাছে তোমার মর্যাদা ও মূল্য অনেক বড়; তোমার দোয়া কবুল হয়েছে। মন প্রশান্ত রাখো। তোমাকে তোমার কাঙ্ক্ষিত বস্তু দান করেছি। তোমাকে এমন মাকাম দেব যে, তোমার শাফায়াতে অসংখ্য পাপীকে ক্ষমা করব, যতক্ষণ না তুমি বলো, ‘যথেষ্ট হয়েছে’। হে আমার হাবিব! যে আমার আদেশ মেনে চলবে, সে আজাব ও শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে, আমার রহমত লাভ করবে। জান্নাতে আমাকে দেখার মর্যাদা লাভ করবে। তোমার ও তোমার উম্মতের ওপর দিনে-রাতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলাম।”
আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কথা চালিয়ে গিয়ে বলেন, “সেই মাকাম থেকে (পরে) আমি আরশে পৌঁছালাম। আসমানগুলো পেরিয়ে মূসা (আলাইহিস সালাম) যেখানে ছিলেন, সেখানে এলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হক তাআলা তোমার ও তোমার উম্মতের ওপর কী ফরজ করেছেন?’ আমি বললাম, ‘প্রতিটি দিন ও রাতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা আমার ওপর ফরজ করেছেন।’ তিনি বললেন, ‘তোমার রবের কাছে ফিরে যাও, এটা কিছুটা হালকা করে দিতে বলো। কারণ তোমার উম্মত এর ভার বইতে পারবে না। আমি বনি ইসরাইলকে পরীক্ষা করেছি, যাচাই করে দেখেছি।’ এরপর আমি আমার রবের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম, ‘হে আমার রব! আমার উম্মতের জন্য (এই আদেশ) কিছুটা হালকা করে দাও!’ তখন তিনি পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত কমালেন। আমি মূসার (আলাইহিস সালাম) কাছে ফিরে এসে বললাম, (পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়েছেন)। তিনি বললেন, ‘তোমার রবের কাছে ফিরে যাও! আরও কিছুটা হালকা করে দিতে বলো। কারণ তোমার উম্মত এর ভার বইতে পারবে না।’ এভাবে আমি মূসা (আলাইহিস সালাম) ও আমার রবের মাঝে আসা-যাওয়া করতে থাকলাম। অবশেষে আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘এই নামাজকে পাঁচ ওয়াক্তে নামিয়ে আনলাম। প্রতিটি নামাজের জন্য দশটি সওয়াব রয়েছে। এ হিসাবে শেষ পর্যন্ত তা পঞ্চাশ নামাজই হয়। কারণ যে কেউ কোনো নেক কাজের নিয়ত করে তা করতে না পারলে তার জন্য একটি সওয়াব লেখা হয়। আর তা করলে একটির বদলে পূর্ণ দশটি সওয়াব লেখা হয়। কিন্তু কোনো গুনাহের ইচ্ছা করে তা না করলে কিছুই লেখা হয় না। আর করলে কেবল একটি গুনাহ হিসেবেই লেখা হয়।’ তারপর আমি মূসার (আলাইহিস সালাম) কাছে নেমে এসে অবস্থা জানালাম। তিনি আবারও বললেন, ‘ফিরে যাও, আরও কিছুটা হালকা করে দিতে বলো।’ তখন আমি তাঁকে বললাম, ‘আমার রবের কাছে অনেকবার মিনতি করেছি, এখন আমি লজ্জাবোধ করছি।’”5 এভাবে আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রিয় নবীর দুঃখ-কষ্টে ক্ষতবিক্ষত মুবারক হৃদয়কে সান্ত্বনা দিলেন। কোনো সৃষ্টিকে যা দেননি, কেউ যা জানতে বা বুঝতে পারবে না, এমন নিয়ামতসমূহ তিনি তাঁকে দান করলেন।
এসো এদিকে, হে প্রেমের আগুনে দগ্ধ জন,
যে নিজেকে ভাবে প্রিয়তমের প্রেমিক জন।
এসো, শোনো সেই বাদশাহর মিরাজের বয়ান,
প্রেমিক হলে প্রেমের আগুনে জ্বলো অবিরাম।
এক সোমবার রাতে ঘটেছিল – এ সত্য খবর,
সে রাত ছিল বুঝি লাইলাতুল কদর।
সেই সৌভাগ্যবান, মর্যাদায় মহান যিনি,
সে রাতে উম্মে হানির ঘরে ছিলেন তিনি।
আগে যাঁরা এসেছেন, পাননি এ সম্মান,
কেউ পৌঁছাতে পারেননি এমন উচ্চ স্থান।
কারণ সবকিছু দেখে চলে গেলেন ওপারে,
পৌঁছে গেলেন তিনি সেই মহান দরবারে।
ছয় দিক থেকে পবিত্র সেই জুলজালাল,
ধরন-পরিমাণ ছাড়া তাঁকে দেখালেন জামাল।
স্পষ্টভাবে দেখলেন তিনি রাব্বুল ইজ্জতকে,
আখিরাতে উম্মতও তাঁর দেখবে এমনিভাবে।
তুমি মিরাজে উঠে করলে আমার কাছে নিয়াজ,
তোমার উম্মতের মিরাজ করে দিলাম নামাজ।
“হে আমার হাবিব! যে আমার আদেশ মেনে চলবে, সে আজাব ও শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে, আমার রহমত লাভ করবে। জান্নাতে আমাকে দেখার মর্যাদা লাভ করবে” হাদীসে কুদসি
বিশ্বাস করলাম! আমার জান আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ
তারপর জগৎসমূহের সরদার মুহূর্তের মধ্যে বাইতুল মুকাদ্দাসে এলেন এবং সেখান থেকে মসজিদুল আকসার দরজায় বাঁধা বুরাকে চড়ে মক্কা মুকাররমায় ফিরে এলেন। বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে মক্কায় ফেরার পথে মহানবী কুরাইশের এক কাফেলার দেখা পেলেন। কাফেলার একটি উট ভয় পেয়ে পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ মক্কা মুকাররমায় উম্মে হানির ঘরে ফিরে এলেন। তাঁর শোয়ার জায়গা তখনো ঠান্ডা হয়নি, গামলার অজুর পানির দোলা তখনো থামেনি। বাইরে পাহারারত উম্মে হানি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন, কিছুই টের পাননি।
সকাল হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মে হানিকে মিরাজের ঘটনা শোনানোর পর বললেন, “সকালে কাবায় গিয়ে আমি এ কথা বলব।” হযরত উম্মে হানি বললেন, “হে আমার চাচাতো ভাই! খবরদার, এ কথা কুরাইশদের বলবেন না! তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলবে, আপনাকে কষ্ট দেবে। যাদের ঈমান দুর্বল, তারা এ কথা বিশ্বাস করবে না, দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। মুশরিকরাও তো এরই অপেক্ষায় আছে, তারা তাদের ঈমান নষ্ট করে দেবে। এখন মুসলমানের সংখ্যা কম।
মুসলমানরা আরেকটু শক্তিশালী ও মজবুত হলে বললে কেমন হয়?” জগৎসমূহের সরদার, বিশ্বজগতের সুলতান যে ঐতিহাসিক জবাব দিলেন, তা হলো: “আল্লাহর কসম, আমি তাদের এ কথা বলবই। আজ যে পচা, কালও সে পচা। এই ইসলামকে আমি দৃঢ় ঈমানের অধিকারীদের নিয়েই গড়ে তুলব। আমার ব্যাপারে এখনো যদি কারও সন্দেহ থাকে, সে আলাদা হয়ে চলে যাক। তাদের সঙ্গে আমার কোনো কাজ নেই। পচা সবসময়ই পচা। আজ না পচলে কাল পচবে। পরে পচার চেয়ে এখনই পচে যাক, যেন তার ওপর ভরসা করে আমরা পথে না নামি। মজবুতরাই আমাদের জন্য যথেষ্ট।”
তারপর তিনি সকালে কাবায় গেলেন এবং বলতে শুরু করলেন… কাফিররা “মুহাম্মদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে, একেবারে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে” বলে উপহাস করল। যারা মুসলমান হওয়ার নিয়ত করেছিল, তারাও দ্বিধায় পড়ে গেল। মুশরিকদের কেউ কেউ খুশি হয়ে আবু বকরের বাড়িতে এল। কেননা তারা ভালো করেই জানত যে, তিনি বুদ্ধিমান, অভিজ্ঞ ও হিসাবি ব্যবসায়ী। তিনি দরজায় বেরিয়ে এলে তারা জিজ্ঞেস করল, “হে আবু বকর! তুমি বহুবার বাইতুল মুকাদ্দাসে যাওয়া-আসা করেছ। ভালোই জানো। মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসে গিয়ে ফিরে আসতে কত সময় লাগে?” হযরত আবু বকর বললেন, “ভালোই জানি। এক মাসের বেশি।” এ কথায় খুশি হয়ে কাফিরদের দল বলল, “বুদ্ধিমান, অভিজ্ঞ মানুষের কথা এমনই হয়।” তারপর হেসে, উপহাস করে এবং হযরত আবু বকরও তাদের মতো ভাববেন – এই আশায় তারা বলল, “তোমার নেতা বলছে, সে এক রাতে বাইতুল মুকাদ্দাসে গিয়ে ফিরে এসেছে; এবার সে পুরোপুরি পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে।” তারা হযরত আবু বকরের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দেখাল এবং তাঁর সমর্থনের আশায় বুক বাঁধল।
হযরত আবু বকর রাসূলুল্লাহর মুবারক নাম শুনেই (একটুও যুক্তি-বুদ্ধির মাপকাঠিতে না মেপে) বললেন, “তিনি যদি এ কথা বলে থাকেন, তবে তা সত্য। মুহূর্তের মধ্যে তিনি গিয়ে ফিরে এসেছেন – এ কথা আমিও বিশ্বাস করলাম।” এই বলে তিনি ঘরে ঢুকে গেলেন। কাফিররা হতভম্ব হয়ে “হায় হায়! মুহাম্মদ তো দেখছি বড় জবরদস্ত জাদুকর! আবু বকরকেও জাদু করেছে” বলতে বলতে ফিরে গেল।
হযরত আবু বকর সঙ্গে সঙ্গে রাসূলুল্লাহর কাছে এলেন। বিরাট জনতার মাঝে উচ্চস্বরে তিনি বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার মিরাজ মুবারক হোক! আপনার মতো মহান নবীর খাদেম বানিয়ে আল্লাহ তাআলা আমাদের সম্মানিত করেছেন এবং আপনার মুবারক চেহারা দেখার ও হৃদয় জয়কারী, রুহ আকর্ষণকারী আপনার মধুর বাণী শোনার নিয়ামত দান করেছেন; এ জন্য আমি তাঁর অসীম শোকর আদায় করছি। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার প্রতিটি কথা সত্য। আমি বিশ্বাস করলাম। আমার জান আপনার জন্য কুরবান হোক!” হযরত আবু বকরের কথায় কাফিররা হতভম্ব হয়ে গেল। বলার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এই কথাগুলো সন্দেহে পড়া, দুর্বল ঈমানের কয়েকজনের হৃদয়েও শক্তি জোগাল। সেদিন রাসূলুল্লাহ আবু বকরকে “সিদ্দিক” বললেন। এই উপাধি লাভের ফলে তাঁর মর্যাদা আরও এক ধাপ ওপরে উঠল।6
এতে ভীষণ ক্ষুব্ধ কাফিররা মুমিনদের দৃঢ় ঈমান, আমাদের নবীর প্রতিটি কথায় সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের বিশ্বাস স্থাপন এবং প্রদীপের চারপাশে পতঙ্গের মতো তাঁর চারপাশে ঘোরা সহ্য করতে পারল না। রাসূলুল্লাহকে লজ্জিত ও পরাস্ত করার জন্য তারা তাঁকে পরীক্ষা করতে শুরু করল।
“হে মুহাম্মদ! তুমি বলছ, বাইতুল মুকাদ্দাসে গিয়েছিলে। বলো তো, মসজিদের কয়টি দরজা, কয়টি জানালা?” – এ ধরনের প্রশ্ন তারা করল।
“মিরাজের কথা আমাকে বলতেই হবে; যে বিশ্বাস করবে না, সে পরেও ফিরে যাবে; পচা ভিতের ওপর ইমারত হয় না; যে আলাদা হবে, সে এখনই আলাদা হয়ে যাক, মজবুতরাই থাকুক” হাদীস শরীফ
আকাবার বাইআতের স্থানে নির্মিত মসজিদুল বাইআ
রাসূলুল্লাহ তাদের প্রতিটি প্রশ্নের একে একে উত্তর দিলেন। তিনি উত্তর দেওয়ার সময় হযরত আবু বকর বারবার বলছিলেন, “ঠিক তাই, ইয়া রাসূলাল্লাহ।” অথচ আদব ও লজ্জাশীলতার কারণে রাসূলুল্লাহ সামনের মানুষের মুখের দিকেও তাকাতেন না। তিনি বলেন, “মসজিদুল আকসায় আমি চারপাশে তাকাইনি। তারা যা জিজ্ঞেস করছিল, তা আমি দেখিনি। সেই মুহূর্তে জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) মসজিদুল আকসাকে আমার চোখের সামনে এনে দিলেন। আমি এর জানালাগুলো দেখে দেখে গুনছিলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলাম।” রাসূলুল্লাহ জানালেন যে, পথে তিনি উটসহ কয়েকজন মুসাফির দেখেছেন এবং বললেন, “ইনশাআল্লাহ, তারা বুধবার এসে পৌঁছাবে।” বুধবার সূর্যাস্তের সময় কাফেলাটি মক্কায় পৌঁছাল। কাফেলার লোকদের জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানাল, ঝড়ের মতো কিছু একটা বয়ে গিয়েছিল এবং একটি উট পড়ে গিয়েছিল। এ ঘটনা মুমিনদের ঈমান আরও মজবুত করল, আর কাফিরদের শত্রুতা দিন দিন বাড়তে লাগল।7 হিজরতের এক বছর আগে রজব মাসের ২৭ তারিখে জুমার রাতে ঘটে যাওয়া এই মুজিযাকে মিরাজ বলা হয়। রাসূলুল্লাহ রুহ ও দেহসহ জাগ্রত অবস্থায় মিরাজে গিয়েছিলেন। মিরাজের রাতে তাঁকে বহু ঐশী হাকিকত দেখানো হয় এবং এই রাতেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। তা ছাড়া সূরা বাকারার শেষ দুটি পবিত্র আয়াত দান করা হয়। মিরাজের কথা পবিত্র কুরআনে সূরা বনি ইসরাইলের (ইসরা) ১ম আয়াতে, সূরা নাজমের প্রথম দিকের আয়াতগুলোতে এবং কিছু হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে।8
মিরাজের পর আমাদের প্রিয় নবী সাহাবীগণের কাছে জান্নাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “হে আবু বকর! তোমার প্রাসাদ দেখেছি। তা লাল সোনার তৈরি। তোমার জন্য প্রস্তুত করা নিয়ামতসমূহ নিজ চোখে দেখেছি।” তখন হযরত আবু বকর বললেন, “সেই প্রাসাদ এবং প্রাসাদের মালিক – দুটোই আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ।”
তারপর মহানবী হযরত উমরের দিকে ফিরে বললেন, “হে উমর! তোমার প্রাসাদ দেখেছি। তা ইয়াকুতের তৈরি। সেই প্রাসাদে অনেক হুর ছিল। কিন্তু আমি ভেতরে প্রবেশ করিনি। তোমার আত্মমর্যাদাবোধের কথা মনে পড়ল।” হযরত উমর খুব কাঁদলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বললেন, “আমার মা-বাবা, আমার জান আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার ব্যাপারেও কি আত্মমর্যাদাবোধ, ঈর্ষা হতে পারে?” তারপর তিনি হযরত উসমানকে বললেন, “হে উসমান! আমি তোমাকে প্রতিটি আসমানে দেখেছি। জান্নাতে তোমার প্রাসাদ দেখে তোমার কথা মনে পড়েছে।” হযরত আলিকে বললেন, “হে আলি! চতুর্থ আসমানে তোমার আকৃতি দেখেছি। জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! ফেরেশতারা হযরত আলিকে দেখার জন্য আকুল হয়ে পড়েছিলেন। হক তাআলা তাঁর আকৃতিতে একজন ফেরেশতা সৃষ্টি করেছেন। তিনি চতুর্থ আসমানে থাকেন, ফেরেশতারা তাঁকে জিয়ারত করে বরকত লাভ করেন।’ তারপর আমি তোমার প্রাসাদে প্রবেশ করলাম। একটি গাছের একটি ফলের ঘ্রাণ নিলাম। তা থেকে একজন হুর বেরিয়ে এল এবং মুখে নেকাব টেনে দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কে, আর কার জন্য?’ সে বলল, ‘আপনার চাচাতো ভাই আলির জন্য আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, ইয়া রাসূলাল্লাহ!’”
মিরাজের রাতের সকালে জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে ইমাম হয়ে রাসূলুল্লাহকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে পড়ালেন। এক হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) কাবার দরজার কাছে দুই দিন আমার ইমামতি করলেন। আমরা দুজন ফজরের নামাজ পড়লাম সুবহে সাদিকের সময়, জোহর সূর্য মাথার ওপর থেকে হেলে পড়ার সময়, আসর প্রতিটি জিনিসের ছায়া তার সমান হলে, মাগরিব সূর্য ডোবার সময় (এর ওপরের কিনারা অদৃশ্য হলে), আর এশা পশ্চিম আকাশের লালিমা মিলিয়ে অন্ধকার নামলে। দ্বিতীয় দিন ফজরের নামাজ পড়লাম চারদিক ফরসা হলে, জোহর প্রতিটি জিনিসের ছায়া তার দ্বিগুণ হলে, আসর এর ঠিক পরেই, মাগরিব ইফতারের সময়, আর এশা রাতের এক-তৃতীয়াংশ পার হলে। তারপর তিনি বললেন, ‘হে মুহাম্মদ! এটাই আপনার ও আপনার পূর্ববর্তী নবীগণের নামাজের ওয়াক্ত। আপনার উম্মত যেন প্রতিটি ওয়াক্তের নামাজ আমাদের পড়া এই দুই সময়ের মাঝে আদায় করে।’”9 নামাজের ওয়াক্ত এভাবে জানিয়ে দেওয়ার পর হাবশায়ও খবর পাঠানো হলো যে, তাঁরা যেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন এবং নামাজ ফরজ হওয়ার দিন থেকে নামাজ পড়া শুরু করা পর্যন্ত সময়ের নামাজগুলো কাজা করেন।
“(হে মদিনাবাসী!) আল্লাহর পথে আল্লাহর জন্য হক কথা বলবে এবং নিজেদের জান ও ইজ্জত যেভাবে রক্ষা করো, সেভাবে আমাকে সাহায্য করবে – এই প্রতিশ্রুতি কি তোমরা দিচ্ছ?” হাদীস শরীফ
