হুনাইনের যুদ্ধ
হুনাইন মক্কা ও তায়েফের মাঝখানের একটি উপত্যকা। এ যুদ্ধকে “হাওয়াজিন গাজওয়া”ও বলা হয়। সরওয়ারে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কা বিজয়ের নিয়তে মদিনা থেকে বের হলে মক্কার আশপাশে বসবাসকারী হাওয়াজিন ও সাকিফ নামের দুটি বড় গোত্র ভাবল, মুসলমানরা তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে আসছে; তাই তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। জগৎসমূহের সরদার মক্কা বিজয় করতে এসেছেন জেনে তারা কিছুটা স্বস্তি পেলেও “কুরাইশদের পর নিশ্চয়ই আমাদের পালা আসবে” – এই ভাবনায় প্রস্তুতি আরও জোরদার করল। তারা আরও বলল, “কসম করে বলছি, মুসলমানরা এখনও ভালো যুদ্ধ করতে জানে এমন কোনো জাতির মুখোমুখি হয়নি। মুহাম্মদ আমাদের বিরুদ্ধে আসার আগেই চলো আমরা তাঁর বিরুদ্ধে যাই এবং দেখিয়ে দিই যুদ্ধ কাকে বলে!” হাওয়াজিনের নেতা মালিক ইবনে আওফের নেতৃত্বে তারা বিশ হাজার সৈন্যের অত্যন্ত শক্তিশালী এক বাহিনী নিয়ে রওনা হলো। সৈন্যদের সাহস বাড়ানোর জন্য এবং কঠিন অবস্থায় তারা যেন পালিয়ে না যায়, সেজন্য তারা সব মূল্যবান সম্পদ, নারী ও শিশুদেরও সঙ্গে নিয়ে নিল।
এ খবর অল্প সময়ের মধ্যেই মক্কায় শোনা গেল। ফখরে কায়েনাত খবরের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আবদুল্লাহ ইবনে আবি হাদরাদকে হাওয়াজিন গোত্রে পাঠালেন। হযরত আবদুল্লাহ ছদ্মবেশ ধারণ করে শত্রুদের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। তাদের চিন্তাভাবনা ও কর্মপরিকল্পনা জেনে নিয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রিয় নবীকে অবস্থা জানালেন।
রাসূলে আকরাম তখনই গৌরবময় সাহাবীগণকে একত্র করলেন। বিশ বছর বয়সী হযরত আত্তাব ইবনে আসিদকে মক্কার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে দ্রুত রওনা হলেন। বারো হাজারজনের বাহিনী নিয়ে তিনি মুশরিক হাওয়াজিন ও সাকিফ গোত্রের ওপর তাদের নিজ ঘাঁটিতেই অতর্কিতে আক্রমণ চালাতে চাইলেন। মুজাহিদদের পতাকা বহন করছিলেন হযরত আলি,1 আর অগ্রবর্তী বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ।2 জগৎসমূহের সরদার মাথায় শিরস্ত্রাণ এবং গায়ে একটির ওপর আরেকটি বর্ম পরে দুলদুল নামের খচ্চরে আরোহণ করেছিলেন। শাওয়াল মাসের ১১ তারিখে তাঁরা হুনাইন উপত্যকায় পৌঁছালেন। সেই রাতে সরওয়ারে আলম বাহিনী পরিদর্শন করলেন এবং যুদ্ধের বিন্যাসে সাজালেন। ফজরের নামাজে ইমামতি করার পর অগ্রসর হলেন।
মুশরিকদের সেনাপতি রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে হুনাইন উপত্যকার দুই পাশের ঢালে নিজের বাহিনী মোতায়েন করে ওত পেতে রেখেছিল। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ নিজের দলগুলো নিয়ে সবার সামনে চলছিলেন; এই গোপন বাহিনীর কথা না জেনে তিনি গিরিপথের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। ভোরের আবছা অন্ধকারে শত্রুকে দেখা যাচ্ছিল না। হঠাৎ মুজাহিদদের ওপর হাজার হাজার তির বর্ষিত হতে লাগল। এই অপ্রত্যাশিত তিরবৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য মুজাহিদরা পিছু হটতে বাধ্য হলেন।
“ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল তারা (হাওয়াজিন ও সাকিফ গোত্র) মুসলমানদের গনিমত হবে” হাদীস শরীফ
হুনাইনের যুদ্ধ
যেদিন ওলি ও নবীগণ রইবেন হতবাক,
“নাফসি, নাফসি!” বলে সবাই আতঙ্কে করবে আর্তনাদ,
হতাশায় পাপীদের অবস্থা হবে বিপর্যস্ত,
শাফায়াতের অনুমতিতে ময়দান আবারও তোমারই।
তুমি আহমদ, মাহমুদ ও মুহাম্মদ, হে আমার সরদার,
হকের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যপ্রাপ্ত সুলতান তুমি, হে আমার সরদার।
Şeyh Galib
এই দ্রুত পিছু হটা পেছন থেকে আসা সৈন্যদের শৃঙ্খলা এলোমেলো করে দিল। তাঁরাও পিছু হটার জন্য ঘুরে দাঁড়ালে দেখা গেল, বিশ হাজারজনের শত্রুবাহিনী বন্যার মতো উপত্যকায় নেমে আসছে। আমাদের প্রিয় নবী একাই আক্রমণে উদ্যত মুশরিকদের দিকে সামনে এগিয়ে গেলেন। কেবল হযরত আব্বাস, হযরত আবু বকর ও প্রায় একশোজন বীর সাহাবী মৃত্যুকে তুচ্ছ করে রাসূলে আকরামের কাছে এসে পৌঁছালেন। তাঁরা নিজেদের দেহকে আমাদের প্রিয় নবীর জন্য ঢাল বানালেন। হযরত আব্বাস খচ্চরের লাগাম এবং হযরত সুফিয়ান ইবনে হারিস রেকাব ধরে খচ্চরের গতি কমাতে এবং রাসূলুল্লাহ যেন শত্রুবাহিনীর মধ্যে ঢুকে না পড়েন, সে চেষ্টা করছিলেন। আল্লাহ তাআলার দ্বীন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ব্যথিত হয়ে জগৎসমূহের সরদার বললেন, “হে আব্বাস! তুমি তাদের ডেকে বলো, ‘হে মদিনাবাসী! হে সামুরা গাছের নিচে বাইআতকারী সাহাবীগণ!’”
হযরত আব্বাস ছিলেন বিশালদেহী ও প্রতাপশালী মানুষ। তিনি চিৎকার করলে তাঁর আওয়াজ বহু দূর থেকে শোনা যেত। তিনি সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করলেন, “হে মদিনাবাসী! হে সামুরা গাছের নিচে আমাদের নবীর কাছে অঙ্গীকারকারী সাহাবীগণ! ছত্রভঙ্গ হবেন না! এখানে সমবেত হোন!” তা শুনে সাহাবায়ে কেরাম ফিরে আসতে চাইলেন। কিন্তু তাঁদের বাহনগুলো ভীষণ ভয় পেয়ে যাওয়ায় তাঁরা ফিরতে পারছিলেন না। অবশেষে তাঁরা বর্ম, তরবারি ও বর্শা হাতে নিয়ে বাহন থেকে লাফিয়ে নামতে বাধ্য হলেন। দ্রুত রাসূলুল্লাহর কাছে এসে পৌঁছালেন এবং শত্রুর সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে লিপ্ত হলেন। “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!” ধ্বনি আকাশ-পৃথিবী কাঁপিয়ে তুলছিল, শত্রুকে ভীতসন্ত্রস্ত করে দিচ্ছিল। বদর, উহুদ, খন্দক ও খায়বারে অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শনকারী সাহাবীগণ, বিশেষ করে হযরত আলি, আবু দুজানা ও জুবাইর ইবনে আওয়াম বারবার ঝাঁপিয়ে পড়ে লড়াই করছিলেন, শত্রুদের সারি ভেঙে তাদের পিছু হটিয়ে দিচ্ছিলেন।
জগৎসমূহের সরদার সাহাবীগণের প্রাণপণ এই লড়াই লক্ষ করছিলেন; তাঁর মুবারক ঠোঁট থেকে এই দোয়া শোনা যাচ্ছিল: “হে আল্লাহ! আমাদের ওপর তোমার সাহায্য নাজিল করো। নিঃসন্দেহে তুমি চাও না যে, তারা আমাদের ওপর বিজয়ী হোক।” আল্লাহ তাআলার কাছে কাকুতি-মিনতির মধ্যেই আমাদের প্রিয় নবী মাটি থেকে এক মুঠো বালি তুলে নিলেন এবং বললেন, “তাদের চেহারা কালো হোক!” তারপর তা মুশরিকদের দিকে ছুড়ে মারলেন। আমাদের প্রিয় নবীর মুজিযায় শত্রুসৈন্যদের মধ্যে এমন একজনও রইল না, যার চোখে বালি ঢোকেনি। ফেরেশতারাও সাহায্যে এসেছিলেন। মহানবী বললেন, “আল্লাহ তাআলার কসম, তারা পরাজিত হয়েছে।” মুশরিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু ফিরে পালাতে শুরু করল। যতবার তারা পেছন ফিরে তাকাচ্ছিল, ততবার নিজেদের পিছু ধাওয়া করা গৌরবময় সাহাবীগণকে দেখছিল; রণক্ষেত্রে নিয়ে আসা স্ত্রী, সন্তান ও সম্পদ ফেলে তারা প্রাণপণে পালাচ্ছিল। পলাতকদের একাংশ তায়েফের দুর্গে আশ্রয় নিল।3 আর একাংশ নাখলা ও আওতাসের দিকে চলে গেল। রণক্ষেত্রে তারা সত্তরটি লাশ, ছয় হাজার বন্দি এবং অগণিত সম্পদ ফেলে গেল।
এ যুদ্ধে আল্লাহ তাআলার অনুমতিতে, রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হিম্মত (আধ্যাত্মিক সহায়তা) ও বরকতে বিজয় আবারও মুসলমানদেরই হলো। চারজন শহিদ হলেন, কয়েকজন সাহাবী আহত হলেন। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদও আহত হয়েছেন শুনে আমাদের প্রিয় নবী তাঁর কাছে গেলেন; ক্ষতস্থানে মুবারক হাত বুলিয়ে দিতেই ক্ষত সঙ্গে সঙ্গে সেরে গেল।
আওতাস সারিয়্যা
হুনাইনের যুদ্ধে বিপর্যস্ত হওয়ার পর হাওয়াজিনের মুশরিকরা আওতাসে জমায়েত হলো। রাসূলুল্লাহ আবু মূসা আশআরির চাচা আবু আমিরের নেতৃত্বে আওতাসে একটি সেনাদল পাঠালেন। আওতাসে আবারও তীব্র সংঘর্ষ হলো। আবু আমির শহিদ হলেন। তাঁর স্থলে হযরত আবু মূসা আশআরি নেতৃত্ব নিলেন এবং শত্রুকে পরাজিত করলেন।4 মুজাহিদরা অনেক বন্দি ও প্রচুর গনিমত নিয়ে ফিরে এলেন।
“হে আব্বাস! তুমি তাদের ডেকে বলো, ‘হে মদিনাবাসী! হে সামুরা গাছের নিচে বাইআতকারী সাহাবীগণ!’” হাদীস শরীফ
বন্দিদের মধ্যে রাসূলুল্লাহর দুধবোন শায়মাও ছিলেন। তিনি বললেন, “আমি তোমাদের নবীর দুধবোন।” কিন্তু মুজাহিদরা তাঁর কথা বিশ্বাস করলেন না। তাঁকে একটি উটের পিঠে বসিয়ে রাসূলুল্লাহর দরবারে নিয়ে যাওয়া হলো। শায়মা শৈশবের অনেক স্মৃতি খুঁটিনাটিসহ বর্ণনা করলেন। রাসূল আলাইহিস সালাম তাঁর চাদর মাটিতে বিছিয়ে দুধবোনকে তার ওপর বসালেন। নিজেও বসে অনেকক্ষণ কাঁদলেন।5 তিনি হালিমা খাতুন ও শায়মার বাবার খোঁজখবর নিলেন। শায়মা উত্তর দিলেন, “তাঁরা অনেক আগেই ইন্তেকাল করেছেন।” যে সম্মান ও সমাদর তিনি পেলেন, তার ফলে তিনি ঈমান আনলেন।6 রাসূল আলাইহিস সালাম বললেন, “চাইলে আমাদের কাছে থেকে যাও।7 এখানে তোমার সব রকমের সেবাযত্ন করা হবে। চাইলে তুমি যেখানে যেতে চাও, সেখানে পৌঁছে দেব।” “দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ” – এই হাদীস শরীফ অনুসারে শায়মা নিজের দেশে ফিরে যেতে চাইলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে একজন দাসী, তিনজন দাস এবং কিছু উট ও ভেড়া উপহার দিয়ে নিজের দেশে পাঠিয়ে দিলেন।
তায়েফের যুদ্ধ
বিশ্বজগতের সুলতান (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হুনাইন থেকে তায়েফে পালিয়ে যাওয়া শত্রুদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালিয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা করতে চাইছিলেন। তাদের সেনাপতি মালিক ইবনে আওফ তায়েফে আশ্রয় নেওয়াদের মধ্যে ছিল। মক্কার কাছের এই দুর্গ ছিল কুফরের শেষ, কিন্তু সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গগুলোর একটি। হিজরতের আগে মহানবী তায়েফে এসে এক মাস তাদের নসিহত করেছিলেন। কিন্তু তায়েফবাসীরা জগৎসমূহের সরদারের ওপর নজিরবিহীন নির্যাতন ও জুলুম চালিয়েছিল। এমনকি তাঁর মুবারক পা দুটি রক্তে রঞ্জিত করে দিয়েছিল। মহানবী সেখানে হযরত জায়েদ ইবনে হারিসাকে সঙ্গে নিয়ে জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও যন্ত্রণাময় দিনগুলো কাটিয়েছিলেন।
আমাদের প্রিয় নবী হিজরি অষ্টম বছরের শাওয়াল মাসে হুনাইনের যুদ্ধের পর প্রাপ্ত গনিমত জিরানায় রেখে তায়েফের দিকে রওনা হলেন। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে আগে পাঠালেন।8 তিনি নিজে গৌরবময় সাহাবীগণকে নিয়ে পেছন থেকে এসে তায়েফের সামনে পৌঁছালেন। সাকিফ গোত্র তাদের সুরক্ষিত দুর্গে আগেভাগেই প্রচুর খাদ্য মজুদ করে রেখেছিল। সাহাবায়ে কেরামের আগমন দেখে তারা দুর্গের ফটক বন্ধ করে প্রতিরক্ষায় চলে গেল। দুর্গের কাছাকাছি এগিয়ে আসা মুজাহিদদের তারা তির ছুড়ে জবাব দিচ্ছিল। এভাবেই যুদ্ধ চলতে থাকল। তায়েফবাসীরা কিছুতেই দুর্গ থেকে বেরিয়ে খোলা ময়দানে মুখোমুখি লড়াই করার সাহস পাচ্ছিল না।
সাহাবায়ে কেরামের কয়েকজন দুর্গের ভেতরে মিনজানিক দিয়ে পাথর নিক্ষেপের প্রস্তাব দিলেন। মহানবী তা সমীচীন মনে করে “দাব্বাবা” নামের মিনজানিক তৈরি করালেন। সেগুলো দিয়ে মুশরিকদের দিকে পাথর নিক্ষেপ করিয়ে অবরোধ অব্যাহত রাখলেন। সাহাবায়ে কেরাম প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন, যত দ্রুত সম্ভব দুর্গ জয় করতে চাইছিলেন। কিন্তু দুর্গটি অত্যন্ত সুরক্ষিত হওয়ায় তা জয় করা সম্ভব হলো না। এর মধ্যে বারোজন সাহাবী শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করলেন। হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারব বীরের মতো লড়াই করার সময় একটি চোখ হারালেন।9
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “হে আবু সুফিয়ান! কোনটি চাও? চাইলে দোয়া করি, তোমার চোখ আগের জায়গায় ফিরে আসুক। চাইলে আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তোমাকে একটি চোখ দান করুন।” আবু সুফিয়ান বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি চাই, জান্নাতে আমাকে চোখ দেওয়া হোক।” এই বলে তিনি হাতের তালুতে থাকা চোখটি মাটিতে ফেলে দিলেন।10 অবরোধের বিশতম দিন ঘনিয়ে এলে এক রাতে রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বপ্নে দেখলেন, তাঁকে উপহার দেওয়া এক পাত্র ঘি একটি মোরগ ঠুকরে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। তিনি এর ব্যাখ্যা করলেন যে, তায়েফ এ বছর বিজিত হবে না; তারপর অবরোধ তুলে নিলেন।
৮ বছর আগে তায়েফবাসীরা যখন তাঁকে নির্যাতন করেছিল, তখন এক ফেরেশতা বলেছিলেন, “অনুমতি দিলে এই পাহাড়গুলো তাদের মাথার ওপর উল্টে দেব।” দয়ার সাগর আমাদের প্রিয় নবী সেই ফেরেশতাকে বলেছিলেন, “আমি জগৎসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছি। আমার একমাত্র চাওয়া এই যে, আল্লাহ তাআলা এই মুশরিকদের বংশ থেকে এমন এক প্রজন্ম বের করে আনুন, যারা হক তাআলার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক না করে ইবাদত করবে।” আর এখন তিনি আবারও দয়া করে দোয়া করলেন, “হে আমার রব! সাকিফ গোত্রকে সঠিক পথ দেখাও! তাদের আমাদের কাছে নিয়ে এসো।”
হাবিবে আকরাম সাহাবীগণকে নিয়ে তায়েফ ত্যাগ করে জিলকদ মাসের প্রথম সপ্তাহে জিরানায় এলেন, যেখানে হুনাইনে হস্তগত বন্দি ও গনিমত জমা করা হয়েছিল। ছয় হাজার বন্দি ছাড়াও গনিমত হিসেবে বিশ হাজারেরও বেশি বড় পশু, চল্লিশ হাজারেরও বেশি ছোট পশু এবং অগণিত অলংকার পাওয়া গিয়েছিল। তিনি সেগুলো হকদার মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। সে সময় জানা গেল, হাওয়াজিন গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল দরবারে সাক্ষাতের অনুমতি প্রার্থনা করছেন। আমাদের প্রিয় নবী তাঁদের সাক্ষাৎ দিলেন। প্রতিনিধিদল জানালেন যে, গোটা হাওয়াজিন গোত্র মুসলমান হয়েছে; এতে জগৎসমূহের সরদার অত্যন্ত খুশি হলেন। এরপর তিনি নিজের ভাগে পড়া বন্দিদের সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত করে ফিরিয়ে দিলেন। সাহাবায়ে কেরামও আমাদের প্রিয় নবীর অনুসরণে একই কাজ করলেন। রাসূলুল্লাহর একটি দয়া মুহূর্তের মধ্যে ছয় হাজার বন্দির মুক্তির কারণ হলো। এ খবর তায়েফে আশ্রয় নেওয়া হাওয়াজিন গোত্রের নেতা মালিক ইবনে আওফের কাছে পৌঁছালে তিনিও এসে মুসলমান হলেন, আর মহানবী তাঁকে উপহারে ভরিয়ে দিলেন।11 এখানে আর কোনো কাজ বাকি ছিল না। সেখানে তেরো দিন অবস্থানের পর রাসূলুল্লাহ এক বুধবার রাতে উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধলেন। বিশ্বজগতের সুলতান বরাবরের মতো বিজয়ী হয়ে সাহাবীগণকে নিয়ে মক্কায় পৌঁছালেন। কাবা মুআজ্জমা তাওয়াফ করে উমরা আদায় করলেন। হজের আমিরের দায়িত্বও অর্পণ করে আত্তাব ইবনে আসিদকে মক্কার শাসনকর্তা নিযুক্ত করলেন।12
“দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ” হাদীস শরীফ
