দুনিয়ায় শুভাগমন (জন্ম)
সাত স্তর জমিন, সাত স্তর আসমান, মোটকথা সমগ্র জগৎ গভীর সম্মান ও আনন্দের সঙ্গে তার সরদারের অপেক্ষায় ছিল – যিনি সাইয়্যিদুল মুরসালিন (রাসূলগণের সরদার), খাতামুন নাবিয়্যিন (শেষ নবী) ও হাবিবে খোদা (আল্লাহর প্রিয়তম)। সমস্ত সৃষ্টি অবস্থার ভাষায় “স্বাগতম, ইয়া রাসূলাল্লাহ!” বলে তাঁকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত হয়েছিল। হিজরতের ৫৩ বছর আগে, হাতির ঘটনার পঞ্চান্ন দিন পর, রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ সোমবার রাতে, ভোরের দিকে, মক্কার বনু হাশিম মহল্লায় সাফা পাহাড়ের কাছে একটি ঘরে বহু প্রতীক্ষিত সেই সত্তা – আল্লাহ তাআলার নূর মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্মগ্রহণ করলেন। তাঁর শুভাগমনে জগৎ নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। অন্ধকার হঠাৎ সেই “নূরে” আলোকিত হয়ে উঠল।1
এই রাত সেই রাত, যে রাতে সেই মহান সত্তা
নিজ নূরে আলোকিত করেন সকল জগৎ।
এই রাতে তিনি দুনিয়াকে জান্নাত বানান,
এই রাতে হক তাআলা সবকিছুর প্রতি রহমত করেন।
এই রাতে আনন্দে ভাসেন হৃদয়বান যাঁরা,
এই রাতের তরে প্রাণ উৎসর্গ করেন তাঁরা।
মুস্তফা জগৎসমূহের জন্য রহমত,
মুস্তফা গুনাহগারদের জন্য শাফায়াতকারী।
আমার উম্মত, আমার উম্মত
মর্যাদাসমূহের সর্বোচ্চটি লাভ করেছেন যিনি, মায়েদের মধ্যে সবচেয়ে সৌভাগ্যবতী সেই হযরত আমিনা তাঁর গর্ভাবস্থার কথা এভাবে বর্ণনা করেন, “সেই সরওয়ারকে গর্ভে ধারণের দিনগুলোতে আমি কোনো কষ্ট বা যন্ত্রণা অনুভব করিনি। আমি যে গর্ভবতী, তা-ও টের পেতাম না। তবে ছয় মাস পর একদিন ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় কেউ একজন আমাকে বললেন, ‘তুমি কাকে গর্ভে ধারণ করেছ, তা কি জানো?’ আমি ‘জানি না’ বলে উত্তর দিলে তিনি সংবাদ দিলেন, ‘জেনে রাখো, তুমি নবীগণের মধ্যে সর্বশেষ নবীকে গর্ভে ধারণ করেছ!’ প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে সেই ব্যক্তি আবার এলেন এবং বললেন, ‘হে আমিনা! শিশুটি জন্ম নিলে তাঁর নাম রেখো মুহাম্মদ।’ অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘হে আমিনা! শিশুটি জন্ম নিলে তাঁর নাম রেখো আহমদ!’”
আমাদের মা হযরত আমিনা প্রসবের মুহূর্তের কথাও এভাবে বর্ণনা করেন, “প্রসবের সময় যখন এল, আমি এক গম্ভীর আওয়াজ শুনলাম। আমার শরীর কাঁপতে লাগল। তারপর একটি সাদা পাখি দেখলাম; সেটি এসে তার ডানা দিয়ে আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিল। ভয় ও কম্পনের আর কোনো চিহ্নই রইল না। ঠিক তখন আমার ভীষণ পিপাসা পেল, যেন উত্তাপে পুড়ে যাচ্ছিলাম। আমার পাশে দুধের মতো সাদা এক পেয়ালা শরবত দেখলাম। শরবতটি পান করার জন্য আমাকে দেওয়া হলো। আমি পান করলাম; তা ছিল মধুর চেয়েও মিষ্টি ও ঠান্ডা। আমার পিপাসা মিটে গেল। তারপর এক বিরাট নূর দেখলাম; আমার ঘর এমনভাবে নূরে ভরে গেল যে, সেই নূর ছাড়া আমি আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না।
জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি যে চায়,
প্রেম ও আকুলতায় দরুদ পড়ুক সে সদাই!
আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া হাবিবাল্লাহ!
আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া নূরা আরশিল্লাহ।
“আমি আল্লাহ তাআলার হাবিব, তাঁর প্রিয়তম। আমি নবীগণের নেতা। গর্ব করার জন্য বলছি না” হাদীস শরীফ
মহানবী যে ঘরে জন্মগ্রহণ করেন, তার পূর্বের স্থান (বর্তমানে এটি মক্কা গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে)
মহানবী যে ঘরে জন্মগ্রহণ করেন, তা ছিল তাঁর দাদার পিতা হাশিম ইবনে আবদে মানাফের। ঘরটি কাবা থেকে ৩০০–৪০০ মিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ছিল।
হিজরতের সময় মহানবী এই বরকতময় ঘরটি আকিল ইবনে আবি তালিবের হাতে অর্পণ করেছিলেন। আকিলের নাতিরা পরে ঘরটি মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ সাকাফির কাছে বিক্রি করে দেন।
পরবর্তীকালে হারুনুর রশিদের মা খাইজুরান খাতুন এই বরকতময় ঘরটি কিনে নিয়ে মসজিদে রূপান্তরিত করেন।
আব্বাসি ও মামলুকরা যে মসজিদ সংরক্ষণ করেছিলেন, উসমানি আমলেও তা যত্নের সঙ্গে রক্ষা করা হয়। কানুনি সুলতান সুলাইমান খান মসজিদটি নতুন করে নির্মাণ করান।
ইতিহাসের পরিক্রমায় এই মসজিদ বহুবার সংস্কার করা হয়েছে।
১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে শাইখ আব্বাস কাত্তান এখানে যে ভবন নির্মাণ করান, সেটি ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে মক্কা গণগ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সে সময় দেখলাম, অনেক নারী আমাকে ঘিরে রেখেছেন এবং আমার সেবা করছেন। তাঁরা ছিলেন দীর্ঘদেহী, তাঁদের মুখমণ্ডল সূর্যের মতো উজ্জ্বল। দেখতে তাঁরা ছিলেন আবদে মানাফ গোত্রের মেয়েদের মতো। হঠাৎ তাঁদের আবির্ভাবে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। তাঁদের একজন বললেন, ‘আমি ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া!’ আরেকজন বললেন, ’আর আমি মারইয়াম বিনতে ইমরান; আর এঁরা জান্নাতের হুর2।’
সে সময় আরও দেখলাম, আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত সাদা, লম্বা এক রেশমি কাপড় বিস্তৃত রয়েছে। বলা হলো, ‘একে মানুষের চোখ থেকে আড়াল করে রাখো।’ তখনই একঝাঁক পাখি আবির্ভূত হলো। তাদের ঠোঁট ছিল পান্নার, ডানা ইয়াকুতের। ভয়ে আমি ঘেমে গিয়েছিলাম; ঝরে পড়া ঘামের ফোঁটা থেকে মেশকের সুবাস ছড়াচ্ছিল। এ অবস্থায় আমার চোখের সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে দেওয়া হলো। আমি পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবী দেখতে পেলাম। ফেরেশতাগণ আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিলেন।
মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করামাত্র তাঁর মাথা মুবারক সিজদায় রাখলেন এবং শাহাদাত আঙুল ওপরে তুললেন। তারপর আসমান থেকে এক টুকরো সাদা মেঘ নেমে এসে তাঁকে ঢেকে ফেলল। আমি শুনলাম, একটি আওয়াজ বলছে, ‘তাঁকে পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত সব জায়গায় ঘুরিয়ে আনো। ঘুরিয়ে আনো, যাতে সমগ্র জগৎ তাঁকে তাঁর নাম, দেহ ও গুণাবলিসহ দেখতে পায়। সবাই যেন জেনে নেয় যে, তাঁর নাম মাহি, অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাঁর মাধ্যমে শিরকের চিহ্নসমূহ মুছে দেন।’
তারপর সেই মেঘও দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল, আর আমি মুহাম্মদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি সাদা পশমি কাপড়ে জড়ানো অবস্থায় দেখলাম। সে সময় সূর্যের মতো উজ্জ্বল চেহারার তিনজন ব্যক্তি এলেন। একজনের হাতে ছিল রুপার একটি বদনা, একজনের হাতে পান্নার একটি গামলা, আর একজনের হাতে এক টুকরো রেশম। বদনা থেকে যেন মেশক ঝরছিল। তাঁরা আমার বরকতময় পুত্রকে গামলার ভেতরে রাখলেন। তাঁর মাথা মুবারক ও পা মুবারক ধুয়ে রেশমে জড়িয়ে দিলেন। তারপর তাঁর মাথা মুবারকে সুগন্ধি মাখালেন, চোখ মুবারকে সুরমা লাগিয়ে দিলেন এবং দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন।”
সারি সারি ফেরেশতা নামলেন আসমান থেকে,
কাবার মতো তাওয়াফ করলেন আমার ঘরকে।
দলে দলে হুরেরা এলেন সুবাস ছড়িয়ে,
তাঁদের মুখের নূরে ঘর গেল নূরে ভরে।
শূন্যের ওপর বিছানো হলো এক বিছানা,
নাম তার সুন্দুস, বিছালেন এক ফেরেশতা।
বিস্ময়ে আমি নির্বাক হয়ে রইলাম,
এসব ঘটনা যখন স্পষ্ট চোখে দেখলাম।
হঠাৎ দেয়াল ফেটে গেল, আর তখনই
জান্নাত থেকে তিন হুর এলেন আমার কাছে।
কেউ কেউ বলেন, সেই তিন রূপসীর মাঝে
একজন ছিলেন চাঁদমুখী আসিয়া।
একজন নিঃসন্দেহে ছিলেন বিবি মারইয়াম,
আর একজন জান্নাতের হুরদের এক রূপসী।
স্নেহভরে এলেন সেই তিন চাঁদবদনী,
তখনই আমাকে সালাম জানালেন তাঁরা।
আমার চারপাশে এসে বসলেন তাঁরা,
মুস্তফার সুসংবাদ দিলেন একে অপরকে।
মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন আমাদের মা হযরত আমিনার পাশে ছিলেন আবদুর রহমান ইবনে আওফের মা শিফা খাতুন, উসমান ইবনে আবিল আসের মা ফাতিমা খাতুন এবং আমাদের নবীর ফুফু সাফিয়া খাতুন। তাঁরা যে নূর দেখেছিলেন এবং অন্যান্য যেসব ঘটনা ঘটেছিল, সেগুলোর কথা তাঁরা এভাবে জানিয়েছেন:
শিফা খাতুন বর্ণনা করেন, “সে রাতে আমি সাহায্যকারী হিসেবে আমিনার পাশে ছিলাম। শুনলাম, মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করামাত্র দোয়া ও মিনতি করছেন। অদৃশ্য থেকে বলা হলো, ‘ইয়ারহামুকা রাব্বুকা।’ তারপর একটি নূর বের হলো এবং তা এত আলো ছড়াল যে, পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সব জায়গা দেখা যাচ্ছিল…” আরও বহু ঘটনার সাক্ষী শিফা খাতুন বলেছেন, “যখন তাঁকে নবুয়তের কথা জানানো হলো, তখন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে যাঁরা সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন, আমিও ছিলাম তাঁদের একজন।”
“কিয়ামতে যখন সবাই নীরব থাকবে, তখন আমি কথা বলব। কেউ যখন নড়াচড়া করতে পারবে না, তখন আমিই তাদের জন্য শাফায়াতকারী” হাদীস শরীফ
খুশিতে ভরে উঠল সমগ্র সৃষ্টিকুল,
দুঃখ দূর হলো, জগৎ নতুন প্রাণ পেল।
জগতের সকল কণা আওয়াজ তুলে
একে অপরকে ডেকে বলল, মারহাবা।
মারহাবা, হে মহান সুলতান, মারহাবা,
মারহাবা, হে মারিফাতের খনি, মারহাবা।
মারহাবা, হে ফুরকানের রহস্য, মারহাবা,
মারহাবা, হে সব ব্যথার উপশম, মারহাবা।
মারহাবা, হে সৌন্দর্য-বাগানের বুলবুল,
মারহাবা, হে মহিমাময় রবের অন্তরঙ্গ জন।
মারহাবা, হে আল্লাহর চাঁদ ও সূর্য,
মারহাবা, হে হক থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন নন যিনি।
মারহাবা, হে গুনাহগার উম্মতের আশ্রয়, মারহাবা,
মারহাবা, হে অসহায়দের আশ্রয়স্থল, মারহাবা।
মারহাবা, হে খলিলের নয়নমণি,
মারহাবা, হে মহিমাময়ের একান্ত প্রিয়জন।
মারহাবা, হে জগৎসমূহের জন্য রহমত,
মারহাবা, তুমিই গুনাহগারদের শাফায়াতকারী।
মারহাবা, হে দুই জাহানের বাদশাহ,
তোমারই জন্য সৃষ্টি হয়েছে এই জগৎ ও স্থান।
সাফিয়া খাতুন এভাবে বর্ণনা করেছেন, “মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন চারদিক নূরে ছেয়ে গেল। জন্মের পরপরই তিনি সিজদা করলেন, তারপর মাথা মুবারক তুলে স্পষ্ট ভাষায় বললেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ইন্নি রাসূলুল্লাহ।’ আমি তাঁকে গোসল করাতে চাইলে বলা হলো, ‘আমি তাঁকে গোসল করানো অবস্থাতেই পাঠিয়েছি।’ দেখা গেল, তাঁর নাড়ি কাটা এবং খতনা করা। জন্মের পরপরই তিনি সিজদা করলেন। তখন তিনি মৃদুস্বরে কিছু বলছিলেন; আমি তাঁর মুখ মুবারকের কাছে কান নিয়ে গেলাম। তিনি বলছিলেন, ‘উম্মাতি, উম্মাতি!’ (আমার উম্মত, আমার উম্মত!)”3
বাইতুল্লাহর দিকে ফিরে সেই রাসূল
মাটিতে মুখ রেখে সিজদা করলেন তখন।
সিজদায় তাঁর মাথা ও জিহ্বা হামদ করে,
আঙুল তুলে তিনি তাওহিদের ঘোষণা দেন।
বলেন, “হে মাওলা! তোমার দিকে মুখ ফিরিয়েছি,
হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে দান করো আমায়।”
অন্তরের সব হিম্মত হকের সঙ্গে বেঁধে
তিনি বলছিলেন, “উম্মাতি, হায় উম্মাতি!”
আমাদের প্রিয় নবী যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব সম্মানিত কাবার পাশে আল্লাহ তাআলার কাছে কাকুতি-মিনতি করে দোয়া করছিলেন। শিশুর জন্মের এই সুসংবাদ তাঁকে এভাবে দেওয়া হলো:
হঠাৎ কাবা মাকামে ইবরাহিমের দিকে সিজদা করল এবং আবার আগের অবস্থায় ফিরে এল। আবদুল মুত্তালিব শুনলেন, কাবা স্পষ্ট ভাষায় বলছে, “আল্লাহু আকবার! মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আওয়াজ আমাকে মূর্তি থেকে পবিত্র করবে।” সে সময় হুবাল মূর্তিটি উপুড় হয়ে পড়ে গেল। তখন একটি আওয়াজ এল, “আমিনার এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছেন। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে গোমরাহির অন্ধকার থেকে হিদায়াতের নূরে পৌঁছে দেবেন। হক তাআলা তাঁকে মানুষ ও জিনের জন্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন। হে ফেরেশতাগণ, তোমরা সাক্ষী থাকো, তাঁকে সমস্ত ভান্ডারের চাবি দেওয়া হয়েছে। তাঁর জন্মদিনকে ভুলে যেয়ো না; কিয়ামত পর্যন্ত সেদিনটি তোমাদের ঈদ হোক।” এ কথাগুলো শুনে বিস্ময়ে আবদুল মুত্তালিবের মুখে আর কথা সরল না। “আমি কি স্বপ্ন দেখছি?” – এই ভেবে তিনি বুকে হাত বুলালেন। আবারও একটি আওয়াজ শুনলেন, “হে কুরাইশের সরদার! কিসে তোমাকে এমন ভীত করে তুলেছে?” উত্তর দেওয়ার শক্তি তাঁর ছিল না।
আমিনার ঘরের কাছে পৌঁছে তিনি ঘরের ছাদে একটি পাখি দেখলেন। পাখিটি ডানা মেলে ঘরটিকে ঢেকে রেখেছিল। মক্কার পাহাড়গুলো তার নূরে ঝলমল করছিল। একখণ্ড সাদা মেঘ ঘরটিকে ছায়া দিচ্ছিল। দরজার সামনে দাঁড়ানো দুজন ফেরেশতা তাঁকে ভেতরে ঢুকতে দিলেন না। “এ কী অবস্থা! আমি কি স্বপ্ন দেখছি?” – তিনি এ কথা ভাবছিলেন, এমন সময় ভেতর থেকে মেশকের সুবাস এসে তাঁর নাকে লাগল।
মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের জন্মের দিনে বহু ঘটনা প্রত্যক্ষ করে আবদুল মুত্তালিব এই সুসংবাদে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং বললেন, “আমার এই পুত্রের শান ও মর্যাদা অনেক উঁচু হবে।”4
এত বড় আনন্দ উদযাপনের জন্য আবদুল মুত্তালিব জন্মের সপ্তম দিন থেকে তিন দিন ধরে মক্কাবাসীকে ভোজে আপ্যায়ন করলেন। এ ছাড়া তিনি শহরের প্রতিটি মহল্লায় উট জবাই করে মানুষ ও প্রাণীর উপকারের জন্য রেখে দিলেন।5 ভোজের সময় যারা জিজ্ঞেস করল, “শিশুটির কী নাম রেখেছ?”, তাদের তিনি বললেন, “আমি তাঁর নাম রেখেছি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।” আর যারা জিজ্ঞেস করল, “পূর্বপুরুষদের কারও নাম কেন রাখলে না?”, তাদের তিনি উত্তর দিলেন, “কারণ আমি চেয়েছি, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রশংসা করুন এবং মানুষও তাঁর গুণগান করুক।”6 অন্য এক বর্ণনায় জানা যায়, “মুহাম্মদ” নামটি রেখেছিলেন মা আমিনা।
হে পূর্ণিমার চাঁদের মতো দীপ্ত মুখের অধিকারী,
হে সকল দুর্দশাগ্রস্তের তুমিই সহায়।
হে সকল হৃদয়ের ব্যথার তুমিই উপশম,
হে সমগ্র সৃষ্টির তুমিই সুলতান।
তুমিই সেই সকল নবীর সুলতান,
আউলিয়া ও পুণ্যাত্মাদের নয়নের নূর।
হে রিসালাতের সিংহাসনের তুমিই শেষ অধিকারী,
হে নবুয়তের মোহরের তুমিই সমাপ্তি।
“কিয়ামতের দিন নবীগণের ইমাম, তাঁদের খতিব এবং তাঁদের সকলের শাফায়াতকারী আমিই। এসব কথা আমি গর্ব করার জন্য বলছি না” হাদীস শরীফ
তোমার নূর যখন আলোকিত করল সমগ্র জগৎ,
গোলাপসম মুখ তোমার জগৎকে করল ফুলবাগান।
দূর হলো অজ্ঞতা আর গোমরাহির অন্ধকার,
মারিফাতের বাগান পেল পূর্ণতার শিখর।
ইয়া হাবিবাল্লাহ! আমাদের সাহায্য করো,
শেষ নিঃশ্বাসে তোমার দিদারে আনন্দিত করো।
রাসূলুল্লাহর জন্মের রাতে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি
রাসূলে আকরামের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্মের আগে এবং জন্মের সময় তাঁর দুনিয়ায় শুভাগমনের নিদর্শন হিসেবে বহু ঘটনা ঘটেছিল। মহানবীর জন্মের আগেই সে যুগের বিখ্যাত ব্যক্তিরা নানা স্বপ্ন দেখেছিল। তারা তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা গণক ও সে যুগের বিখ্যাত জ্ঞানীদের কাছে জানতে চাইল। গণক ও জ্ঞানীরা বলেছিল, এসব স্বপ্ন মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের আগমনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আমাদের প্রিয় নবীর দাদা আবদুল মুত্তালিব বর্ণনা করেছেন, “একবার আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এমন সময় একটি স্বপ্ন দেখে ভীষণ শিহরিত হয়ে জেগে উঠলাম। তখনই এক গণকের কাছে গিয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলাম। তার কাছে পৌঁছালে সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হে কুরাইশের নেতা! তোমার কী হয়েছে? তোমার চেহারায় একেবারে ভিন্ন এক অবস্থা দেখা যাচ্ছে। তোমাকে এ অবস্থায় ফেলেছে, এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে নাকি?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, আমি একটি ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছি, যা এখনো কাউকে বলিনি।’ তারপর তার পাশে বসে বলতে শুরু করলাম:
’আজ রাতে স্বপ্নে বিশাল একটি গাছ দেখলাম। এর এক প্রান্ত আকাশে উঠে গেছে, ডালপালা পূর্ব ও পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়েছে। গাছটি থেকে এমন নূর ছড়াচ্ছিল যে, তার পাশে সূর্যও অতি ম্লান মনে হচ্ছিল।
গাছটি কখনো দেখা যাচ্ছিল, কখনো দৃষ্টির আড়ালে চলে যাচ্ছিল। মানুষ এর দিকে মুখ ফিরিয়েছিল। প্রতি মুহূর্তে এর নূর বেড়েই চলছিল। কুরাইশ গোত্রের কেউ কেউ গাছটির ডাল আঁকড়ে ধরছিল, আবার কেউ কেউ গাছটি কেটে ফেলতে চেষ্টা করছিল। যারা গাছটি কাটতে চাইছিল, এক যুবক তাদের বাধা দিচ্ছিলেন। তাঁর চেহারা ছিল অত্যন্ত সুন্দর; এমন চেহারা আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি। তা ছাড়া তাঁর দেহ থেকে চারদিকে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল। আমি গাছটির একটি ডাল ধরার জন্য হাত বাড়ালাম, কিন্তু নাগাল পেলাম না।’
আমার স্বপ্নের বর্ণনা শেষ হলে গণকের চেহারা বদলে গেল।
তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তারপর সে বলল, ‘এতে তোমার কোনো অংশ নেই!’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাহলে কার অংশ আছে?’ সে বলল, ‘যারা ওই গাছের ডাল আঁকড়ে ধরেছে, তাদের।’ তারপর কথা চালিয়ে গিয়ে বলল, ‘তোমার বংশ থেকে একজন নবী আসবেন; তিনি সবদিকের অধিপতি হবেন, মানুষ তাঁর দ্বীনে প্রবেশ করবে।’ তারপর আমার পাশে থাকা আমার পুত্র আবু তালিবের দিকে ফিরে বলল, ‘সম্ভবত ইনিই হবেন তাঁর চাচা।’” মহানবীকে নবুয়তের কথা জানানো হলে আবু তালিব এই ঘটনা তাঁকে শুনিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, “সেই গাছটি হলেন আবুল কাসিম, আল-আমিন মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম।”
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম যে রাতে দুনিয়ায় আগমন করেন, সে রাতে একটি তারা উদিত হলো। তা দেখে ইহুদি পণ্ডিতেরা বুঝতে পারল যে, মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম জন্মগ্রহণ করেছেন।
সাহাবায়ে কেরামের অন্যতম হাসসান ইবনে সাবিত বর্ণনা করেন, “আমার বয়স তখন আট বছর। এক সকালে এক ইহুদি ‘হে ইহুদিরা!’ বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়াচ্ছিল। ইহুদিরা ‘কী হয়েছে, এত চিৎকার কেন?’ বলে তার কাছে জড়ো হলে সে উত্তর দিল, ‘জেনে রাখো, আজ রাতে আহমদের তারা উদিত হয়েছে! আহমদ আজ রাতে দুনিয়ায় এসেছেন…’”
রাসূলে আকরামের জন্মের রাতে কাবার সমস্ত মূর্তি উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
উরওয়া ইবনে জুবাইর বর্ণনা করেন, “কুরাইশের একটি দলের একটি মূর্তি ছিল। বছরে একবার তারা সেটির চারপাশে প্রদক্ষিণ করত, উট জবাই করত ও মদ পান করত। এমনই এক দিনে তারা মূর্তিটির কাছে গিয়ে দেখল, সেটি উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। তারা সেটিকে তুলে দাঁড় করাল, কিন্তু সেটি আবার উপুড় হয়ে পড়ল। এমন তিনবার ঘটল। এরপর তারা যখন চারদিক থেকে ভালোভাবে ঠেকনা দিয়ে সেটিকে দাঁড় করাচ্ছিল, তখন একটি আওয়াজ শোনা গেল: ‘একজন জন্মগ্রহণ করেছেন; পৃথিবীর সবকিছু আন্দোলিত হয়ে উঠেছে। যত মূর্তি ছিল, সব ভেঙে পড়েছে। ভয়ে বাদশাহদের হৃদয় কেঁপে উঠেছে!’” এই ঘটনা ঠিক মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের জন্মের রাতেই ঘটেছিল।
মাদায়েন শহরে ইরানের সম্রাট কিসরার প্রাসাদের চৌদ্দটি মিনার (বুরুজ) ধসে পড়ল। সে রাতে প্রচণ্ড শব্দ ও আতঙ্কে কিসরা ও তার লোকজন জেগে উঠল। তাদের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছিল; সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করিয়ে তারা বুঝতে পারল, এটি কোনো বড় ঘটনার নিদর্শন।
সবচেয়ে নামকরা গণকেরা এসব স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিল এভাবে, “এগুলো সংবাদ দিচ্ছে যে, শাম (সিরিয়া), দজলা, ফোরাত, ইরাক ও ইরান ইসলামের অধিকারে আসবে।”
“প্রতিটি শতাব্দীতে, প্রতিটি যুগে যাঁরা বসবাস করেছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বোত্তম ও নির্বাচিত মানুষদের থেকে আমাকে দুনিয়ায় আনা হয়েছে” হাদীস শরীফ
মক্কা মুকাররমা ও তার আশপাশ
সে রাতেই মাজুসি, অর্থাৎ অগ্নিপূজকদের হাজার বছর ধরে জ্বলতে থাকা বিশাল অগ্নিকুণ্ডগুলোও হঠাৎ নিভে গেল। আগুন নেভার তারিখ তারা লিখে রাখল; দেখা গেল, তা কিসরার প্রাসাদের বুরুজগুলো ধসে পড়ার রাতের সঙ্গেই মিলে যায়।
সে যুগে পবিত্র বলে গণ্য সাওয়া হ্রদের পানিও সে রাতে মুহূর্তের মধ্যে নেমে গিয়ে হ্রদটি শুকিয়ে গেল।
শামের দিকে হাজার বছর ধরে যার পানি প্রবাহিত হয়নি, শুকিয়ে যাওয়া সেই সামাওয়া নদীর উপত্যকা সে রাতে কানায় কানায় ভরে উপচে পড়ে বইতে শুরু করল।
মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের জন্মের রাত থেকে শয়তান ও জিনেরা আর কুরাইশের গণকদের কাছে ঘটনাবলির খবর পৌঁছাতে পারত না। গণকবিদ্যার অবসান ঘটল…
হাবিবে আকরাম মহানবীর জন্মের রাতে এবং তার পরেও, তখন পর্যন্ত কখনো দেখা যায়নি এমন এসব ঘটনা ছাড়াও আরও বহু ঘটনা ঘটেছিল। এর সবই ছিল শেষ নবী মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের জন্মের ইঙ্গিত।7
মাওলিদের রাত
মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে রাতে জন্মগ্রহণ করেন, সেই রাতকে “মাওলিদের রাত” বলা হয়। মাওলিদ মানে “জন্মের সময়”।
কদরের রাতের পর এটিই সবচেয়ে মূল্যবান রাত; এ রাতে আমাদের প্রিয় নবীর জন্মে যাঁরা আনন্দিত হন, তাঁদের ক্ষমা করা হয়।
এ রাতে মহানবীর জন্মের সময় যেসব অবস্থা ও মুজিযা দেখা গিয়েছিল, সেগুলো পড়া, শোনা ও শেখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আমাদের প্রিয় নবী নিজেও এগুলো বর্ণনা করতেন।
সাহাবায়ে কেরামও এ রাতে এক জায়গায় সমবেত হতেন, সেদিনটিকে স্মরণ করতেন এবং সে রাতের ঘটনাবলি পাঠ ও বর্ণনা করতেন।
পৃথিবীর সব প্রান্তের মুসলমানরা প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসের ১২তম রাতকে মাওলিদের রাত হিসেবে উদযাপন করে থাকেন। সর্বত্র মাওলিদ কাসিদা পাঠ করে বিশ্বজগতের সুলতানকে স্মরণ করা হয়।
প্রত্যেক নবীর উম্মত নিজ নবীর জন্মদিনকে ঈদ হিসেবে পালন করেছে। এই দিনটিও মুসলমানদের ঈদ, আনন্দ ও খুশির দিন।
“আমার প্রশংসা করা (মাওলিদ ও নাত পাঠ করা) ইবাদত। দফ (বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে, আমোদ-প্রমোদ ও খেলাধুলার মধ্যে ইবাদত জায়েজ নয়” হাদীস শরীফ
মা আমিনা ছিলেন তাঁর জননী,
সেই ঝিনুকেই জন্ম নিল সেই মুক্তামণি।
সেই রবিউল আউয়াল মাসের
বারো তারিখের রাত, সোমবারের রাত,
যে রাতে জন্ম নিলেন মানুষের সেরা জন,
তাঁর মা সে রাতে কত কী দেখলেন, কত কী!
সেই হাবিবের মা বললেন, দেখলাম আমি
এক বিস্ময়কর নূর – সূর্য যেন তার পতঙ্গ।
হঠাৎ বিদ্যুতের মতো ঝলকে বের হলো আমার ঘর থেকে,
আসমান পর্যন্ত জগৎ ভরে গেল নূরে।
আসমান খুলে গেল, দূর হলো অন্ধকার,
তিন ফেরেশতা দেখলাম, হাতে তাঁদের তিনটি আলো।
একজন পূর্বে, একজন পশ্চিমে,
আরেকজন দাঁড়ালেন কাবার ছাদে।
ঠিক সে মুহূর্তে হঠাৎ কাবা আওয়াজ দিল,
বলল, আজ রাতে জন্ম নিয়েছেন জগতের সূর্য।
হে আল্লাহ! সেই মুহাম্মদের খাতিরে,
শাফায়াতের খনি সেই আহমদের খাতিরে,
তাঁর উম্মতের প্রতি সন্তুষ্ট হোন সেই মহান সাহায্যকারী,
রহমাতুল্লাহি আলাইহিম আজমাইন।
আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া হাবিবাল্লাহ!
আসসালাতু ওয়াসসালামু আলাইকা ইয়া নূরা আরশিল্লাহ!
Süleyman Çelebi
