বদরের যুদ্ধ
এই গাজওয়াকে দ্বিতীয় বদর, বদরে কিতাল ও বদরে কুবরাও বলা হয়। সারিয়্যাগুলোতে সাহাবায়ে কেরামের সাফল্য কাফিরদের ভীত করে তুলতে লাগল। এখন তাদের কাফেলাগুলো দলে দলে এবং সঙ্গে সৈন্য নিয়ে যাত্রা করত। হিজরতের দ্বিতীয় বছরে মক্কার মুশরিকরা প্রতিটি পরিবার থেকে পুঁজি সংগ্রহ করে এক হাজার উটের একটি কাফেলা দামেস্কে পাঠাল। এর নেতৃত্বে ছিল মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একজন আবু সুফিয়ান; সে তখনো মুসলমান হয়নি।1 কাফেলা পাহারা দেওয়ার জন্য প্রায় চল্লিশজন প্রহরীও নিযুক্ত করা হয়েছিল… তাদের পরিকল্পনা ছিল, পণ্য বিক্রির পর সমস্ত অর্থ দিয়ে তারা অস্ত্র কিনবে, আর সেই অস্ত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করা হবে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন খবর পেলেন যে, মুশরিকরা ব্যবসার জন্য দামেস্কে একটি বড় কাফেলা পাঠিয়েছে, তখন তাদের অবস্থা জানার জন্য মুহাজিরদের কয়েকজনকে দায়িত্ব দিলেন। জুল উশাইরা নামক স্থানে পৌঁছে তাঁরা জানতে পারলেন যে, কাফেলা চলে গেছে; তখন তাঁরা মদিনায় ফিরে এলেন। কুফরের অনুসারীদের হাত থেকে অস্ত্র ও সম্পদ কেড়ে নেওয়া গেলে তারা ইসলামের অনুসারীদের ক্ষতি করতে পারত না এবং তাদের প্রতিরোধ ভেঙে যেত। এ কারণে রাসূলুল্লাহ পরিস্থিতি বিবেচনা করে সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করলেন।
মহানবী নিজের স্থলে নামাজ পড়ানোর জন্য আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে রেখে গেলেন।2 কাফেলার ফেরার খবর জানার জন্য হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ও হযরত সাঈদ ইবনে জায়েদকে গুপ্তচর হিসেবে পাঠালেন।3 হযরত উসমানের স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ থাকায় তাঁকে মদিনায় থাকার আদেশ দিলেন। তারপর আরও চারজনকে দায়িত্ব দিলেন। এভাবে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সংখ্যা দাঁড়াল আটজনে।
এমন সুযোগ হাতছাড়া করার মতো ছিল না। মহানবী সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুতি নিলেন এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্য থেকে তিনশো পাঁচজন সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে বরকতময় রমজান মাসের বারো তারিখে বদরের দিকে রওনা হলেন। দায়িত্বপ্রাপ্তদের নিয়ে তাঁদের সংখ্যা দাঁড়াল ৩১৩ জনে।4 তাঁদের মধ্যে চৌষট্টিজন ছিলেন মুহাজির।
বদর ছিল মক্কা, মদিনা ও সিরিয়াগামী পথগুলোর মিলনস্থল।
এই অভিযানে বের হওয়ার জন্য সদ্য বেড়ে ওঠা কিশোর-তরুণেরা, এমনকি নারীরাও মহানবীর কাছে মিনতি করছিলেন। উম্মে ওয়ারাকা রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বললেন, “আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অনুমতি দিলে আমি আপনাদের সঙ্গে যেতে চাই। আহতদের ক্ষতস্থানে পট্টি বাঁধব, অসুস্থদের সেবা করব। হয়তো আল্লাহ তাআলা আমাকেও শাহাদাত নসিব করবেন!” তখন হাবিবে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “তুমি তোমার ঘরে থাকো, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তোমাকে শাহাদাত নসিব করবেন।”
“তুমি (উম্মে ওয়ারাকা) তোমার ঘরে থাকো, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তোমাকে শাহাদাত নসিব করবেন” হাদীস শরীফ
বদরের গাজওয়ার পথ
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহ যখন আমাদের সঙ্গে গাজওয়ায় যেতে ইচ্ছুক শিশু-কিশোরদের ফিরিয়ে দিতে চাইলেন, তখন দেখলাম, আমার ভাই উমাইর এক পাশে লুকিয়ে থাকার, চোখের আড়ালে থাকার চেষ্টা করছে। তখন তার বয়স ষোলো বছর। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার কী হয়েছে, এভাবে লুকিয়ে আছ কেন?’ সে বলল, ‘ভয় পাচ্ছি, রাসূলুল্লাহ আমাকেও ছোট মনে করে ফিরিয়ে দেবেন! অথচ আমি গাজওয়ায় অংশ নিতে চাই, যাতে আল্লাহ তাআলা আমাকে শাহাদাত নসিব করেন।’ এ সময় তার কথা রাসূলুল্লাহকে জানানো হলে তিনি আমার ভাইকে বললেন, ‘তুমি ফিরে যাও।’ তখন আমার ভাই উমাইর কাঁদতে শুরু করল। দয়ার সাগর হাবিবে আকরাম মহানবী তার চোখের পানি সহ্য করতে পারলেন না এবং অনুমতি দিলেন। আমার ভাই নিজে তলোয়ার বাঁধতে পারত না বলে তার কোমরে তলোয়ারটি আমিই বেঁধে দিয়েছিলাম।”5 জগৎসমূহের সরদার আমাদের প্রিয় নবীর পতাকা বহন করছিলেন মুসআব ইবনে উমাইর, সাদ ইবনে মুআজ ও হযরত আলি।6 সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে ছিল মাত্র তিনটি ঘোড়া ও সত্তরটি উট। ঘোড়াগুলোর একটি মিকদাদের, একটি জুবাইরের, আরেকটি মারসাদ ইবনে আবি মারসাদের। দুই বা তিনজন পালা করে একটি উটে চড়তেন। রাসূলুল্লাহ হযরত আলি, আবু লুবাবা ও মারসাদ ইবনে আবি মারসাদের সঙ্গে পালা করে চড়তেন। কিন্তু রাসূল আলাইহিস সালাম যেন হেঁটে না গিয়ে সবসময় উটের পিঠেই থাকেন, এ জন্য তাঁরা সবাই মিনতি করে বলতেন, “আমাদের প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি উট থেকে নামবেন না। আপনার মহান সত্তার বদলে আমরাই হাঁটব।” কিন্তু বিশ্বজগতের সুলতান নিজেকে তাঁদের থেকে আলাদা মনে করলেন না; তিনি ইরশাদ করলেন, “তোমরা যেমন হাঁটায় আমার চেয়ে বেশি শক্তিশালী নও, তেমনি আমিও সওয়াব ও প্রতিদানের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে কম মুখাপেক্ষী নই।” রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর মহান সাহাবীগণ মরুভূমির ঝলসানো রোদে হেঁটে চলছিলেন। তার ওপর তাঁরা ছিলেন রোজাদার। সাহাবায়ে কেরাম ইসলাম প্রচারের জন্য অসংখ্য কষ্ট সহ্য করে প্রেম ও উদ্দীপনা নিয়ে মহানবীর পেছনে পেছনে চলছিলেন। কেননা শেষে রয়েছে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি, রয়েছে তাঁদের প্রাণভরে কাঙ্ক্ষিত শাহাদাত ও জান্নাত… আমাদের প্রিয় নবী সাহাবীগণের অবস্থার দিকে তাকিয়ে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! এঁরা পদাতিক, তুমি এঁদের বাহন দান করো! হে আল্লাহ! এঁরা বস্ত্রহীন, তুমি এঁদের পোশাক দান করো! হে আল্লাহ! এঁরা ক্ষুধার্ত, এঁদের তৃপ্ত করো! এঁরা দরিদ্র, তোমার অনুগ্রহ ও দয়ায় এঁদের ধনী করে দাও!”
মহানবী ও তাঁর বরকতময় বাহিনী এই প্রচণ্ড গরমে বদরের দিকে এগিয়ে চলছিলেন; এদিকে দামেস্ক থেকে আসা মুশরিকদের কাফেলাও বদরের কাছাকাছি এসে পড়েছিল। কাফেলার খবর সংগ্রহের জন্য মহানবী যে দুজন সাহাবীকে পাঠিয়েছিলেন, তাঁরা জানতে পারলেন যে, কাফেলা এক-দুই দিনের মধ্যে বদরে পৌঁছাতে পারে; তাঁরা দ্রুত ফিরে এলেন। তাঁরা যে গ্রাম থেকে খবর নিয়েছিলেন, কাফেলার লোকেরা সেখানে এসে গ্রামবাসীদের জিজ্ঞেস করল, “মুসলমানদের গুপ্তচরদের ব্যাপারে তোমরা কিছু জানো?” তারা বলল, “জানি না। তবে দুজন লোক এসে এই যে এখানে কিছুক্ষণ বসেছিল, তারপর উঠে চলে গেছে।”
আবু সুফিয়ান বর্ণিত জায়গায় গিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। মাটিতে পড়ে থাকা উটের মল পিষে তার ভেতরে খাদ্যদানার বিচি দেখে বলল, “এগুলো মদিনার পশুখাদ্য। আমার মনে হয়, ওই দুজন মুহাম্মদের (আলাইহিস সালাম) গুপ্তচর।” মুসলমানরা খুব কাছেই আছে – এই অনুমান করে আবু সুফিয়ান ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। কাফেলার পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে সে দিনরাত পথ চলে, এক মুহূর্তও নষ্ট না করে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দ্রুত মক্কায় পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নিল। এ ছাড়া পরিস্থিতি জানানোর জন্য দামদাম ইবনে আমর গিফারি নামে এক লোককে দূত হিসেবে মক্কায় পাঠাল।7
“হে আল্লাহ! এঁরা (আমার সাহাবীগণ) পদাতিক, তুমি এঁদের বাহন দান করো! হে আল্লাহ! এঁরা বস্ত্রহীন, তুমি এঁদের পোশাক দান করো! হে আল্লাহ! এঁরা ক্ষুধার্ত, এঁদের তৃপ্ত করো! এঁরা দরিদ্র, তোমার অনুগ্রহ ও দয়ায় এঁদের ধনী করে দাও!” হাদীস শরীফ
লোকটি মক্কায় এসে নিজের জামা সামনে ও পেছন থেকে ছিঁড়ে ফেলল। উটের হাওদা উল্টো করে বসাল। অদ্ভুত এক চেহারা নিয়ে সে আর্তনাদ করে চিৎকার করতে লাগল, “বাঁচাও! বাঁচাও!… হে কুরাইশরা! ছুটে এসো!… মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীরা তোমাদের কাফেলার ওপর, আবু সুফিয়ানের কাছে থাকা তোমাদের মালের ওপর হামলা করেছে। যদি সময়মতো পৌঁছাতে পারো, তবে কাফেলা বাঁচাতে পারবে!…”
এ কথা শুনে মক্কাবাসীরা সঙ্গে সঙ্গে জড়ো হয়ে প্রস্তুতি নিল। তারা সাতশো উটারোহী, একশো অশ্বারোহী ও দেড়শো পদাতিক সৈন্য সংগ্রহ করল। আবু লাহাবকে “চলো, তুমিও যোগ দাও!” বলা হলে সে ভয়ে অসুস্থতার অজুহাত দেখাল। নিজের বদলে আস ইবনে হিশামকে পাঠাল। উমাইয়া ইবনে খালাফ নামের এক মুশরিক যুদ্ধের প্রস্তুতিতে খুবই ঢিলেমি করছিল। কারণ সে শুনেছিল, মহানবী ইরশাদ করেছেন, “আমার সাহাবীগণ উমাইয়াকে হত্যা করবেন।” সে জানত, তিনি কখনো সত্য থেকে বিচ্যুত হন না; তাই সে ভয় পাচ্ছিল। এ কারণে আবু জাহলের পীড়াপীড়ির জবাবে সে নিজের বার্ধক্য ও অতিরিক্ত মোটা হওয়ার অজুহাত দেখাল। কিন্তু আবু জাহল তাকে কাপুরুষ বলে খোঁটা দিলে সে যেতে বাধ্য হলো।
মুশরিক বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার। তাদের সবার গায়ে ছিল লোহার বর্ম। তাদের সঙ্গে ছিল সুকণ্ঠী নারীরা। বাদ্যযন্ত্র ও মদ নিতেও তারা ভোলেনি। তারা ভাবছিল, এত শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে তিনশো লোক তো দূরের কথা, এক হাজার লোকের বাহিনীকেও মুহূর্তে পরাজিত করবে। যাত্রার আগেই কাকে কাকে হত্যা করবে, কী কী গনিমত পাবে, তার হিসাব কষছিল এমন লোকও ছিল। কিন্তু তাদের সবার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা। উন্মত্ত মুশরিকদের এই দল নারীদের বাজানো দফ আর তাদের গাওয়া গানের সঙ্গে যাত্রা করল।
এদিকে আবু সুফিয়ান বদর থেকে বেশ দূরে সরে গিয়ে মক্কার দিকে অনেকটা পথ এগিয়ে গিয়েছিল। বিপদ কেটে গেছে – এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে সে কাইস ইবনে ইমরিউল কাইস নামে তার এক লোককে কুরাইশদের কাছে পাঠিয়ে বলল, “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের কাফেলা, লোকজন ও মালামাল রক্ষার জন্য মক্কা থেকে বেরিয়েছিলে। আমরা বিপদ থেকে বেঁচে গেছি। এখন ফিরে যাও!…” সে আরও উপদেশ দিল, “মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই করতে মদিনায় যাওয়া থেকে বিরত থাকো!”
কাইস মুশরিক বাহিনীর কাছে খবরটি পৌঁছালে আবু জাহল বলল, “কসম খেয়ে বলছি, আমরা বদরে গিয়ে তিন দিন তিন রাত উৎসব করব, উট জবাই করব, মদ পান করব। আশপাশের গোত্রগুলো আমাদের দেখে আমাদের অবস্থায় ঈর্ষা করবে এবং দেখবে যে, আমরা কাউকে ভয় করি না। এরপর আমাদের প্রতাপের ভয়ে কেউ আমাদের ওপর হামলা করার সাহস পাবে না। হে অপরাজেয় কুরাইশ বাহিনী! এগিয়ে চলো!…” কাইস দেখল, আবু জাহল কারও কথা শোনার অবস্থায় নেই; তাই সে ফিরে গিয়ে আবু সুফিয়ানকে পরিস্থিতি জানাল। দূরদর্শী ও সতর্ক মানুষ আবু সুফিয়ান না বলে পারল না, “হায় হায়! কুরাইশদের সর্বনাশ হলো!… এটা আমর ইবনে হিশামের (আবু জাহলের) পরিকল্পনা। সে নিশ্চয়ই মানুষের নেতা হওয়ার লোভে এ কাজ করেছে। অথচ এমন ঔদ্ধত্য সবসময়ই বড় এক ত্রুটি ও অমঙ্গল। মুসলমানরা যদি তাদের মুখোমুখি হয়, তবে কুরাইশদের দুর্ভোগ আছে!…”
আবু সুফিয়ান দ্রুত কাফেলাকে মক্কায় পৌঁছে দিয়ে বাহিনীর সঙ্গে গিয়ে মিলিত হলো। এ সময় সরওয়ারে কায়েনাত মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীগণকে নিয়ে বদরের কাছাকাছি এসে পড়েছিলেন। এক সময় তিনি ইসলামি বাহিনীর মধ্যে মদিনার মুশরিকদের মধ্য থেকে খুবাইব ইবনে ইয়াসাফ ও কাইস ইবনে মুহাররিসকে দেখতে পেলেন। খুবাইবের মাথায় লোহার শিরস্ত্রাণ থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁকে চিনে ফেললেন এবং হযরত সাদ ইবনে মুআজকে বললেন, “এ কি খুবাইব নয়?” তিনি বললেন, “জি, ইয়া রাসূলাল্লাহ!” খুবাইব ছিলেন যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী এক সাহসী বীর পালোয়ান। তিনি কাইসকে নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে এলেন। মহানবী তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা আমাদের সঙ্গে কেন যাচ্ছ?” তাঁরা বললেন, “আপনি আমাদের বোনের ছেলে এবং আমাদের প্রতিবেশী। আমরাও আমাদের সম্প্রদায়ের সঙ্গে গনিমত সংগ্রহ করতে যাচ্ছি!” মহানবী খুবাইবকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছ?” তিনি বললেন, “না।” রাসূল আলাইহিস সালাম ইরশাদ করলেন, “তাহলে ফিরে যাও! যে আমাদের দ্বীনে নেই, সে আমাদের সঙ্গে থাকতে পারে না!” খুবাইব বললেন, “আমার বীরত্ব, সাহসিকতা এবং আমি যে শত্রুর বুকে ক্ষত সৃষ্টিকারী পালোয়ান, তা সবাই জানে। গনিমতের জন্য আমি আপনার পাশে থেকে আপনার শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করব।” মহানবী তাঁর সাহায্য গ্রহণ করলেন না।
কিছু দূর যাওয়ার পর খুবাইব আবার তাঁর অনুরোধ জানালেন, কিন্তু মহানবী জানিয়ে দিলেন যে, মুসলমান না হলে তাঁর ইচ্ছা পূরণ করা যাবে না। রাওহা নামক স্থানে পৌঁছালে খুবাইব রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে এসে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা যে জগৎসমূহের রব, তা এবং আপনার নবুয়ত আমি বিশ্বাস করলাম, ঈমান আনলাম।” এতে সরওয়ারে কায়েনাত মহানবী খুবই আনন্দিত হলেন। কাইসও মদিনায় ফেরার পর ঈমানের মর্যাদায় ভূষিত হলেন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
ইসলামি বাহিনী সাফরা উপত্যকায় পৌঁছালে খবর পেল যে, মক্কাবাসীরা সৈন্য সমাবেশ করে তাদের কাফেলা রক্ষার জন্য বদরের দিকে এগিয়ে আসছে। মহানবী সাহাবীগণকে একত্র করে এ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। কারণ মদিনার মুসলমানরা আকাবায় রাসূলুল্লাহর হাতে বাইআত করার সময় এই বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাদের শহরে আসুন। সেখানে আমরা প্রাণের বিনিময়ে হলেও আপনাকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করব এবং আপনার অনুসরণ করব।” অথচ এখন তাঁরা মদিনার বাইরে এসে পড়েছেন। আর তাঁদের সামনে রয়েছে সংখ্যা, অস্ত্র ও সম্পদে তাঁদের চেয়ে বহু গুণ শ্রেষ্ঠ এক শত্রুবাহিনী।
রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণের মতামত জানতে চাইলে মুহাজিরদের মধ্য থেকে আবু বকর সিদ্দিক ও উমর ফারুক একে একে উঠে দাঁড়িয়ে জানালেন যে, শত্রুবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করা প্রয়োজন। মুহাজিরদের মধ্য থেকে মিকদাদ ইবনে আসওয়াদও উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলার যা আদেশ, আপনি তা-ই পালন করুন। তাঁর ফরমান নিয়ে এগিয়ে চলুন। আমরা প্রতিটি মুহূর্ত আপনার সঙ্গে আছি, এক মুহূর্তের জন্যও আপনার পাশ থেকে সরব না। বনি ইসরাইল মূসা আলাইহিস সালামকে যেমন বলেছিল, ‘হে মূসা! পরাক্রমশালী জালিম সম্প্রদায় যতদিন সেই অঞ্চলে থাকবে, ততদিন আমরা সেখানে যাব না এবং সেই দেশে কখনো প্রবেশ করব না। অতএব তুমি ও তোমার রব দুজনে যাও এবং তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো, লড়াই করো। আমরা এখানেই বসে থাকব…’8 – তেমন কথা আমরা কখনো বলব না। আমরা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের পথে আমাদের জান ও মাথা কুরবান করব। যে আল্লাহ তাআলা আপনাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম করে বলছি, আপনি যদি আমাদের সমুদ্রের ওপারে হাবশায়ও পাঠান, তবু আমরা যাব। আমরা কখনো কোনো বিষয়ে আপনার সামান্যতম বিরোধিতাও করব না। আপনার প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ করতে আমরা প্রস্তুত। আমার মা-বাবা, আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ!…”
“যে আমাদের দ্বীনে নেই, সে আমাদের সঙ্গে থাকতে পারে না!” হাদীস শরীফ
বদরের যুদ্ধ
মিকদাদের এই কথাগুলো আমাদের প্রিয় নবীকে অত্যন্ত আনন্দিত করল; তিনি তাঁর জন্য কল্যাণের দোয়া করলেন।9
এখানে মদিনার মুসলমানদের মতামত খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ তাঁরা সংখ্যায়ও বেশি ছিলেন, আবার রাসূলুল্লাহকে মদিনায় রক্ষা করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। মদিনার বাইরে যুদ্ধ করার কোনো অঙ্গীকার তাঁদের ছিল না। এই ভাবনা আঁচ করতে পেরে আনসারদের মধ্য থেকে সাদ ইবনে মুআজ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! অনুমতি দিলে আনসারদের পক্ষ থেকে কিছু বলতে চাই।” অনুমতি দেওয়া হলে তিনি বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি, আপনার নবুয়তকে সত্য বলে মেনেছি। আপনি যা কিছু এনেছেন, সবই হক, সবই সত্য। এ ব্যাপারে শোনা ও মানার জন্য আমরা আপনাকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, কসম করেছি। আমরা সেই প্রতিশ্রুতি থেকে কখনো ফিরব না; আপনি যেখানেই যান, আমরা আপনার আদেশের অধীন। আপনার আদেশ আমরা মাথায় তুলে রাখি। আমাদের জান ও মাথা আপনার পথে কুরবান করব। যে আল্লাহ তাআলা আপনাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম করে বলছি, আপনি সমুদ্রে ঝাঁপ দিলে আপনার পেছনে আমরাও ঝাঁপ দেব। আমাদের কেউ এক পা-ও পিছিয়ে থাকবে না। আপনার মুবারক অন্তরে যা আছে, আদেশ করুন – আমরা তা-ই আঁকড়ে ধরব। আমাদের জানের সঙ্গে আমাদের মালও আপনার জন্য কুরবান হোক। আমরা কখনো শত্রু থেকে মুখ ফেরাব না। যুদ্ধে আমরা ধৈর্যশীল। আমাদের আশা, আপনাকে আনন্দিত করা এবং আপনার সন্তুষ্টি লাভ করা। আপনার ওপর আল্লাহ তাআলার রহমত বর্ষিত হোক…” এ কথাগুলো শুনে সাহাবায়ে কেরাম ভীষণ উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলেন। তাঁরা সবাই জানালেন যে, তাঁরা মনেপ্রাণে এ কথার সঙ্গে একমত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন এবং হযরত সাদ ও সাহাবীগণের জন্য দোয়া করলেন। এবার সব দ্বিধা দূর হয়ে গেল। শত্রু যত বেশি, যত শক্তিশালীই হোক না কেন, গৌরবময় সাহাবীগণ আমাদের প্রিয় নবীর পেছনে পেছনে চোখের পলক না ফেলে শাহাদাতের দিকে এগিয়ে যাবেন এবং আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি অর্জন করবেন। বিশ্বজগতের সরদার যতক্ষণ তাঁদের সামনে আছেন, ততক্ষণ এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে তাঁরা যাবেন না… বিশ্বজগতের গৌরব মহানবী তাঁর প্রতি সাহাবীগণের আনুগত্য ও উদ্দীপনা দেখে তাঁদের সুসংবাদ দিয়ে ইরশাদ করলেন, “চলো, এগিয়ে চলো! আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে আনন্দিত হও। আল্লাহর কসম, যুদ্ধের ময়দানে কুরাইশ সম্প্রদায় যেসব জায়গায় আঘাত খেয়ে লুটিয়ে পড়বে, আমি যেন এখনই সেগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি, তাদের দেখতে পাচ্ছি!” এই সুসংবাদের পর সাহাবায়ে কেরাম প্রেম ও আবেগ নিয়ে রাসূলুল্লাহর পেছনে পেছনে চলতে লাগলেন।
ফেরেশতাদের সাহায্যে আগমন
তাঁরা যখন বদরের আশপাশে পৌঁছালেন, তখন ছিল জুমার রাত। আমাদের প্রিয় নবী সাহাবীগণকে বললেন, “আশা করি, ওই ছোট টিলার পাশের কূপের কাছ থেকে তোমরা কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে।” তিনি সেখানে আল্লাহ তাআলার সিংহ হযরত আলি, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, জুবাইর ইবনে আওয়াম এবং আরও কয়েকজন সাহাবীকে পাঠালেন। হযরত আলি ও তাঁর সঙ্গীরা সঙ্গে সঙ্গে কূপের কাছে গেলেন। সেখানে তাঁরা কুরাইশদের উটচালক ও পানিবাহকদের দেখতে পেলেন। মুসলমানদের দেখামাত্র তারা পালিয়ে গেল। কিন্তু তাদের দুজন ধরা পড়ল। এদের একজন বনু হাজ্জাজের গোলাম আসলাম, অন্যজন বনু আস ইবনে সাঈদের গোলাম আরিজ আবু ইয়াসার।
তাদের মহানবীর কাছে আনা হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, “কুরাইশরা কোথায়?” তারা উত্তর দিল, “ওই যে বালির টিলা দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে তাঁবু ফেলেছে।” মহানবী জিজ্ঞেস করলেন, “কুরাইশরা কতজন?” তারা বলল, “জানি না।” “দিনে কয়টি উট জবাই করে?” – এই প্রশ্নের উত্তরে তারা বলল, “একদিন নয়টি, একদিন দশটি।” তখন মহানবী ইরশাদ করলেন, “তারা এক হাজারের কম, নয়শোর বেশি।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “কুরাইশদের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে কারা কারা আছে?” তারা বলল, “উতবা, শাইবা, হারিস ইবনে আমর, আবুল বাখতারি, হাকিম ইবনে হিজাম, আবু জাহল, উমাইয়া ইবনে খালাফ…” এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণের দিকে ফিরে ইরশাদ করলেন, “মক্কাবাসীরা তাদের কলিজার টুকরাগুলোকে তোমাদের সামনে উৎসর্গ করে দিয়েছে।” এরপর তিনি ওই দুজনকে জিজ্ঞেস করলেন, “আসার পথে কুরাইশদের মধ্য থেকে কেউ কি ফিরে গেছে?” তারা উত্তর দিল, “জি। বনু জুহরা থেকে আখনাস ইবনে আবি শারিক ফিরে গেছে।” মহানবী ইরশাদ করলেন, “সে নিজে সঠিক পথে না থেকেও, আখিরাত, আল্লাহ তাআলা ও কিতাব সম্পর্কে না জেনেও বনু জুহরাকে সঠিক পথ দেখিয়েছে… তারা ছাড়া আর কেউ কি ফিরে গেছে?” তারা জবাব দিল, “বনু আদি ইবনে কাব ফিরে গেছে।”10
“ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলার যা আদেশ, আপনি তা-ই পালন করুন। তাঁর ফরমান নিয়ে এগিয়ে চলুন। আমরা প্রতিটি মুহূর্ত আপনার সঙ্গে আছি, এক মুহূর্তের জন্যও আপনার পাশ থেকে সরব না” মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)
মহানবী কুরাইশদের শেষবারের মতো সতর্ক করার জন্য হযরত উমরকে সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে তাদের কাছে পাঠালেন। উমর ইবনে খাত্তাব তাদের বললেন, “হে জেদি সম্প্রদায়! রাসূল আলাইহিস সালাম বলছেন, ‘প্রত্যেকে এ কাজ থেকে বিরত হোক এবং নিরাপদে ফিরে যাক। কেননা তোমাদের ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে যুদ্ধ করা আমার কাছে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার চেয়ে বেশি পছন্দনীয়!…’”
এই প্রস্তাবের মুখে কুরাইশ মুশরিকদের মধ্য থেকে হাকিম ইবনে হিজাম এগিয়ে এসে বলল, “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! মুহাম্মদ তোমাদের সঙ্গে খুবই ন্যায়সংগত আচরণ করেছে। সে যা চায়, এখনই মেনে নাও। যদি তার কথামতো কাজ না করো, তবে কসম খেয়ে বলছি, এরপর সে আর তোমাদের প্রতি কোনো ন্যায্যতা দেখাবে না!…” হাকিমের এ কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে আবু জাহল বলল, “আমরা এটা কখনো মেনে নেব না এবং মুসলমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ না নিয়ে ফিরব না, যাতে আর কেউ কখনো আমাদের কাফেলায় হামলা করতে না পারে।” এভাবে সে সন্ধির সব পথ বন্ধ করে দিল। হযরত উমর ফিরে এলেন।
সেই রাতে মহানবী ও তাঁর গৌরবময় সাহাবীগণ মুশরিকদের আগেই বদরে পৌঁছে কূপগুলোর কাছে এক জায়গায় অবস্থান নিলেন। মহানবী সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করে শিবির কোথায় স্থাপন করা উচিত, সে বিষয়ে তাঁদের মত জানতে চাইলেন। তাঁদের মধ্য থেকে তখন মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সী হুবাব ইবনে মুনজির উঠে দাঁড়িয়ে কথা বলার অনুমতি চাইলেন। অনুমতি পেয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি কি এমন জায়গা, যেখানে শিবির স্থাপনের জন্য আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ দিয়েছেন এবং যেখানে অবশ্যই থাকতে হবে? নাকি ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে, যুদ্ধের কৌশল হিসেবে এটি বেছে নেওয়া হয়েছে?” মহানবী ইরশাদ করলেন, “না! যুদ্ধের কৌশল হিসেবেই এই জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছে।”
তখন হযরত হুবাব বললেন, “আমার মা-বাবা, আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আমরা যুদ্ধে অভিজ্ঞ মানুষ। এই অঞ্চলও আমরা ভালো চিনি। কুরাইশরা যেখানে তাঁবু ফেলবে, তার কাছের কূপটিতে মিষ্টি ও প্রচুর পানি আছে। অনুমতি দিলে আমরা সেখানে অবস্থান নেব, আশপাশের সব কূপ বন্ধ করে দেব। তারপর একটি হাউজ বানিয়ে তা পানিতে ভরে রাখব। শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ের সময় যখনই পিপাসা লাগবে, আমরা আমাদের হাউজে এসে পানি পান করব। আর শত্রু পানি পাবে না, দুর্বল হয়ে পড়বে।”11 ঠিক তখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম এই মতটি সঠিক বলে জানিয়ে ওহী নিয়ে এলেন। মহানবী ইরশাদ করলেন, “হে হুবাব! তুমি যে মতের দিকে ইঙ্গিত করেছ, সেটিই সঠিক।” এরপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সবাই মিলে উল্লিখিত কূপের কাছে এলেন। মিষ্টি পানির কূপটি ছাড়া বাকি সব কূপ বন্ধ করে দিয়ে তাঁরা একটি বড় হাউজ বানালেন। তা পানিতে ভরে পান করার জন্য পাত্র রেখে দিলেন।
এ সময় হযরত সাদ ইবনে মুআজ মহানবীর কাছে এসে প্রস্তাব দিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি খেজুরগাছের ডাল দিয়ে আপনার জন্য একটি ছাউনি বানিয়ে দেব, যার ভেতরে আপনি বসবেন?” বিশ্বজগতের গৌরব মহানবী সাদের এই চিন্তায় খুশি হলেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করলেন। সঙ্গে সঙ্গে একটি ছাউনি তৈরি করা হলো। নবীদের সুলতান তাঁর সম্মানিত সাহাবীগণকে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ঘুরে ঘুরে দেখলেন। মাঝে মাঝে থেমে তিনি নিজের মুবারক হাতে কুরাইশ মুশরিকদের নিহত হওয়ার স্থানগুলো একে একে দেখিয়ে ইরশাদ করলেন, “ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল সকালে অমুক যেখানে আঘাত খেয়ে লুটিয়ে পড়বে, সে জায়গা এটি! ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল সকালে অমুক যেখানে আঘাত খেয়ে লুটিয়ে পড়বে, সে জায়গা এটি! এই যে এখানে! এখানে!…”
পরে হযরত উমর এ বিষয়ে জানিয়েছেন, “আমি দেখেছি, তাদের প্রত্যেকে ঠিক সেই জায়গার ওপরেই আঘাত খেয়ে নিহত হয়েছে, যেখানে রাসূলে আকরাম তাঁর মুবারক হাত রেখেছিলেন। কেউ একটু সামনেও ছিল না, পেছনেও ছিল না।”
জগৎসমূহের সরদার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবায়ে কেরামকে তিনটি দলে ভাগ করলেন। মুহাজিরদের পতাকা দিলেন মুসআব ইবনে উমাইরকে, আওস গোত্রের পতাকা সাদ ইবনে মুআজকে এবং খাজরাজ গোত্রের পতাকা হুবাব ইবনে মুনজিরকে। প্রত্যেকে নিজ নিজ পতাকার নিচে সমবেত হলেন।12 মহানবী বাহিনীকে সারিবদ্ধ করে সুশৃঙ্খলভাবে সাজালেন।
বাহিনী সাজানোর সময় তিনি নিজের মুবারক হাতের লাঠি দিয়ে সারি থেকে সামনে বেরিয়ে থাকা সাওয়াদ ইবনে গাজিয়্যার বুকে স্পর্শ করে বললেন, “সোজা হয়ে দাঁড়াও, হে সাওয়াদ!” সাওয়াদ বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার হাতের লাঠি আমাকে ব্যথা দিয়েছে। যে আল্লাহ তাআলা আপনাকে সত্য দ্বীন, কিতাব ও ন্যায়বিচার দিয়ে পাঠিয়েছেন, তাঁর দোহাই, আমিও আপনাকে লাঠি দিয়ে এভাবে স্পর্শ করতে চাই।” তাঁর এ কথায় সব সাহাবী বিস্মিত হয়ে গেলেন। বিশ্বজগতের সরদারের কাছে কি কিসাস (বদলা) চাওয়া যায়? এমন কাজ কি করা সম্ভব? কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাঁর মুবারক জামার সামনের দিক খুলে দিয়ে বললেন, “এসো, কিসাস নাও, তোমার হক আদায় করে নাও।” তখন হযরত সাওয়াদ গভীর আনন্দ ও ভালোবাসায় হাবিবে আকরাম মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুবারক বুকে চুমু খেলেন।
সবাই কিসাস দেখার অপেক্ষায় ছিলেন; কিন্তু চোখের সামনের দৃশ্য দেখে তাঁরা তাঁদের দ্বীনি ভাই সাওয়াদের প্রতি মুগ্ধ হলেন, তাঁর সৌভাগ্যে ঈর্ষা করলেন। আমাদের প্রিয় নবী জিজ্ঞেস করলেন, “কেন এমন করলে?” সাওয়াদ বললেন, “আমার মা-বাবা, আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আমি দেখছি, আল্লাহ তাআলার আদেশে আমার মৃত্যুর সময় এসে গেছে, আর আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয় করছি। তাই আমাদের মধ্যকার এই শেষ মুহূর্তগুলোতে আমার ঠোঁট আপনার মুবারক দেহ স্পর্শ করুক – এটাই চেয়েছিলাম। কিয়ামতের দিন আপনি যেন আমার জন্য শাফায়াত করেন, আর এভাবে আমি যেন শাস্তি থেকে মুক্তি পাই – এটিকে আমি তার উসিলা বানাতে চেয়েছি।” তাঁর এই ভালোবাসায় মহানবীও গভীরভাবে অভিভূত হলেন এবং হযরত সাওয়াদের জন্য দোয়া করলেন।
বরকতময় ইসলামি বাহিনীর ডান বাহুর নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল বীর মুজাহিদ জুবাইর ইবনে আওয়ামের, আর বাম বাহুর মিকদাদ ইবনে আসওয়াদের।13
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কীভাবে যুদ্ধ শুরু করা হবে, সে বিষয়ে তাঁর সম্মানিত সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করতে চাইলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কীভাবে লড়াই করো?” আসিম ইবনে সাবিত হাতে ধনুক ও তির নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের মত জানালেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! কুরাইশরা আমাদের প্রায় একশো মিটারের মধ্যে চলে এলে আমরা তাদের দিকে তির ছুড়ব। তারপর হাতে পাথর ছোড়ার দূরত্বে এলে পাথর ছুড়ব। বর্শা নাগালে পাওয়ার মতো কাছে এলে বর্শা না ভাঙা পর্যন্ত বর্শা দিয়ে লড়ব। তারপর তলোয়ার কোষমুক্ত করে লড়াই করব!” এই কৌশল মহানবীর পছন্দ হলো। তিনি সাহাবীগণকে এই নির্দেশনা দিলেন, “তোমাদের সারি ছেড়ে সরে যেয়ো না। এক চুলও না নড়ে নিজ নিজ জায়গায় অবিচল থাকো। আমি আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু কোরো না। শত্রু তোমাদের কাছে আসার আগে তির ছুড়ে অপচয় কোরো না। শত্রু যখন ঢাল সরাবে, তখন তির ছুড়বে। শত্রু বেশ কাছে এসে পড়লে হাতে পাথর ছুড়বে। আরও কাছে এলে বর্শা ব্যবহার করবে। শত্রুর সঙ্গে বুকে বুক মিলে গেলে তলোয়ার দিয়ে লড়বে…”
“ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল সকালে অমুক যেখানে আঘাত খেয়ে লুটিয়ে পড়বে, সে জায়গা এটি! ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল সকালে অমুক যেখানে আঘাত খেয়ে লুটিয়ে পড়বে, সে জায়গা এটি! এই যে এখানে! এখানে!…” হাদীস শরীফ
এরপর প্রহরী নিযুক্ত করে সাহাবায়ে কেরামকে বিশ্রাম দেওয়া হলো। আল্লাহ তাআলার হিকমতে তাঁরা এমন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন যে, চোখের পাতা খোলারও অবস্থা ছিল না। মহানবী খেজুরের ডাল দিয়ে বানানো ছাউনিতে প্রবেশ করলে হযরত আবু বকর, তারপর সাদ ইবনে মুআজ তলোয়ার কোষমুক্ত করে ছাউনির দরজায় পাহারা দিতে লাগলেন। আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মুবারক দুই হাত তুলে গভীর বেদনা নিয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে মিনতি করতে লাগলেন, “হে আমার রব! তুমি যদি এই মুষ্টিমেয় জামাআতকে ধ্বংস করে দাও, তবে পৃথিবীর বুকে আর কখনো তোমার ইবাদত করা হবে না…” এই করুণ দোয়া ভোর পর্যন্ত চলতে থাকল।
বরকতময় ইসলামি বাহিনী যেখানে শিবির স্থাপন করেছিল, সে জায়গা ছিল বালুময়। তাই হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল, পা বালিতে দেবে যাচ্ছিল। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে এবং রাসূলুল্লাহর দোয়ার বরকতে সেই রাতে বৃষ্টি শুরু হলো, যা ক্রমেই বাড়তে লাগল; নালাগুলো উপচে পড়ার মতো ঢল নামল। পানির পাত্রগুলো ভরে নেওয়া হলো, আর মাটি এতটা শক্ত হয়ে গেল যে, পা আর দেবে যাচ্ছিল না।
অন্যদিকে মুশরিকরা কাদা ও ঢলের মধ্যে আটকে পড়ল।
সুবহে সাদিকের পর রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণকে নামাজের জন্য জাগালেন।
ফজরের নামাজ পড়ানোর পর তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ ও শাহাদাতের ফজিলত বর্ণনা করে তাঁদের লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করলেন। তিনি ইরশাদ করলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা যা হক ও সত্য, তারই আদেশ দেন। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য করা হয়নি এমন কোনো আমল তিনি কারও কাছ থেকে কবুল করেন না… এই স্থানগুলোতে আমাদের রব তোমাদের প্রতি তাঁর রহমত ও মাগফিরাতের যে ওয়াদা দিয়েছেন, তাঁর সেই আদেশ পালনের চেষ্টা করো এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হও! কেননা তাঁর ওয়াদা সত্য, তাঁর বাণী সত্য, আর তাঁর শাস্তিও কঠোর। আমি ও তোমরা চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী (হাইয়ু ও কাইয়ুম) আল্লাহ তাআলার সঙ্গে বাঁধা। আমরা তাঁরই আশ্রয় নিয়েছি, তাঁকেই আঁকড়ে ধরেছি, তাঁরই ওপর ভরসা করেছি। আমাদের শেষ প্রত্যাবর্তনও তাঁরই কাছে। আল্লাহ তাআলা আমাকে ও সকল মুসলমানকে ক্ষমা করুন!…”
বরকতময় রমজান মাসের সতেরো তারিখে জুমার দিনের সূর্য উঠল। কিছুক্ষণ পরই শুরু হবে ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম, সবচেয়ে অসম, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে বড় যুদ্ধ…
একদিকে বিশ্বজগতের গৌরব (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং প্রাণ উৎসর্গ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করা তাঁর মুষ্টিমেয় সম্মানিত সাহাবী; অন্যদিকে ইসলামকে অঙ্কুরেই বিনাশ করতে, আল্লাহ তাআলার হাবিব হওয়ার মর্যাদায় ভূষিত এক নবীকে নিশ্চিহ্ন করতে জড়ো হওয়া উদ্ধত, সীমালঙ্ঘনকারী কাফিরদের এক দল। দুঃখের বিষয়, তাদের মধ্যে রাসূলে আকরামের আত্মীয়স্বজনও ছিল। তারাও তাদের প্রিয় ভাতিজার সঙ্গে লড়াই করার জন্য বদরে এসেছিল।
মহানবী তাঁর বাহিনীর বিন্যাস আবার খুঁটিয়ে দেখলেন এবং দেওয়া নির্দেশনাগুলো পুনরায় বলে দিলেন। এ সময় কুরাইশ মুশরিকরা তাদের শিবির থেকে বেরিয়ে বদর উপত্যকার দিকে স্রোতের মতো এগিয়ে আসতে লাগল। তাদের অধিকাংশের গায়ে ছিল বর্ম। প্রচণ্ড দম্ভ ও অহংকার নিয়ে তারা ইসলামি বাহিনীর ওপর আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুশরিকদের এ অবস্থা দেখে রাসূলুল্লাহ হযরত আবু বকরকে নিয়ে তাঁবুতে প্রবেশ করলেন এবং মুবারক দুই হাত তুলে মহান আল্লাহর কাছে মিনতি করতে লাগলেন, “হে আমার রব! এই যে কুরাইশ মুশরিকরা তাদের সমস্ত দম্ভ ও অহংকার নিয়ে আসছে!… তারা তোমাকে চ্যালেঞ্জ করছে, তোমার নবীকে মিথ্যাবাদী বলছে। হে আল্লাহ! আমাকে তুমি যে সাহায্য ও বিজয়ের ওয়াদা দিয়েছ, তা পূরণ করার জন্য তোমার কাছে প্রার্থনা করছি!… হে আল্লাহ! তুমি যদি এই মুষ্টিমেয় মুসলমানের ধ্বংস চাও, তবে এরপর তোমার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না!…”
এভাবে তিনি বিরামহীনভাবে বারবার সাহায্য চেয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে মিনতি করছিলেন। মহানবীর এই অত্যন্ত করুণ, হৃদয়বিদারক মিনতি এমনভাবে চলতে থাকল যে, তিনি আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়লেন এবং তাঁর চাদর মুবারক কাঁধ থেকে পড়ে গেল। এই আকুল মিনতি সহ্য করতে না পেরে হযরত আবু বকর গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে চাদর মুবারকটি মাটি থেকে তুলে মহানবীর মুবারক কাঁধে রাখলেন এবং সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এতটুকু মিনতিই যথেষ্ট!… আপনার রবের কাছে আপনি দোয়ায় অনেক পীড়াপীড়ি করেছেন! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আপনাকে যে বিজয়ের ওয়াদা দিয়েছেন, তা শিগগিরই দান করবেন।” ঠিক সেই মুহূর্তে জগৎসমূহের সরদার নিচের পবিত্র আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতে করতে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলেন। সেগুলোতে মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে, “(বদরের) এই দল শিগগিরই অবশ্যই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পালাবে। বরং তাদের আসল শাস্তির সময় কিয়ামত। সে সময়ের শাস্তি আরও ভয়াবহ, আরও তিক্ত।”14
আমাদের প্রিয় নবী তাঁর বাহিনীর সামনে এলেন। গৌরবময় সাহাবীগণকে এই পবিত্র আয়াতগুলো পড়ে শোনালেন: “হে মুমিনগণ! তোমরা যখন কোনো শত্রুদলের মুখোমুখি হও, তখন অবিচল থাকো এবং মুক্তির জন্য আল্লাহ তাআলাকে বেশি বেশি স্মরণ করো… এভাবে আশা করা যায়, তোমরা সফলকাম হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো। পরস্পরে বিবাদ কোরো না, নইলে তোমরা ব্যর্থ হবে এবং তোমাদের হাতের প্রতাপ (শক্তি, ক্ষমতা) চলে যাবে। ধৈর্য ধরো, কেননা আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।”15
এটিই হবে গোটা বাহিনী নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছিল। উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। রাসূলে আকরাম “আল্লাহ তাআলাকে বেশি বেশি স্মরণ করো…” মর্মের পবিত্র আয়াত তিলাওয়াত করার পর সকল সাহাবায়ে কেরাম একসঙ্গে “আল্লাহু আকবার!… আল্লাহু আকবার!…” বলতে এবং বিজয় দান করার জন্য মহান আল্লাহর কাছে মিনতি করতে লাগলেন। এখন তাঁরা কেবল মহানবীর একটি ইশারার অপেক্ষা করছিলেন। সে যুগের প্রথা অনুযায়ী, দুই বাহিনী মুখোমুখি হওয়ার আগে উভয় পক্ষ থেকে বীরেরা ময়দানে বেরিয়ে এসে পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করত। এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে উভয় পক্ষের লড়াইয়ের রোষ ও আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যেত, তারা যুদ্ধের জন্য উত্তপ্ত হয়ে উঠত। মুশরিকদের মধ্য থেকে আমির ইবনে হাদরামি এই নিয়ম না মেনে, তা পদদলিত করে ইসলামি বাহিনীর দিকে একটি তির ছুড়ল। তিরটি মুহাজিরদের অন্যতম মিহজার গায়ে লাগল; তিনি শহিদ হলেন এবং তাঁর মুবারক রুহ জান্নাতে উঠে গেল। নবীদের সরদার এই প্রথম শহিদ সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়ে ইরশাদ করলেন, “মিহজা শহিদদের সরদার।” সাহাবায়ে কেরাম আর নিজেদের জায়গায় স্থির থাকতে পারছিলেন না। কিন্তু মহানবীর আদেশ না আসা পর্যন্ত তাঁরা সামান্যতম নড়াচড়াও করতে পারছিলেন না।
“হে আমার রব! এই যে কুরাইশ মুশরিকরা তাদের সমস্ত দম্ভ ও অহংকার নিয়ে আসছে!… তারা তোমাকে চ্যালেঞ্জ করছে, তোমার নবীকে মিথ্যাবাদী বলছে। হে আল্লাহ! আমাকে তুমি যে সাহায্য ও বিজয়ের ওয়াদা দিয়েছ, তা পূরণ করার জন্য তোমার কাছে প্রার্থনা করছি!…” হাদীস শরীফ
তাঁদের প্রত্যেকের ভেতরটা আগ্নেয়গিরির মতো ফুটতে লাগল!…
এ সময় দেখা গেল, মুশরিক বাহিনী থেকে তিনজন লোক সামনে ছুটে এসেছে। তারা ছিল ইসলামের কট্টর শত্রু, বনু রাবিআর উতবা, তার ভাই শাইবা ও ছেলে ওয়ালিদ। তারা মুজাহিদদের দিকে চিৎকার করে বলল, “তোমাদের মধ্যে আমাদের সঙ্গে লড়তে পারে এমন কেউ আছে কি?” সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে সবার আগে হযরত আবু হুজাইফা তাঁর পিতা উতবার বিরুদ্ধে লড়ার জন্য এগিয়ে গেলে জগৎসমূহের সুলতান তাঁকে বললেন, “তুমি থামো!” তখন মদিনার মুজাহিদদের মধ্য থেকে আফরা খাতুনের দুই পুত্র মুআজ ও মুআওয়িজ এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এগিয়ে গেলেন। তাঁরা উতবা, শাইবা ও ওয়ালিদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। হাতে তলোয়ার নিয়ে তাঁরা প্রস্তুত হয়ে রইলেন।
মুশরিকরা “তোমরা কারা?” বলে তাঁদের পরিচয় জানতে চাইল। তাঁরা বললেন, “আমরা মদিনার মুসলমান।” তখন মুশরিকরা বলল, “তোমাদের সঙ্গে আমাদের কোনো কাজ নেই! আমাদের চাই আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের। আমরা তাদের সঙ্গেই লড়তে চাই।” এরপর তারা ইসলামি বাহিনীর দিকে ফিরে চিৎকার করে বলল, “হে মুহাম্মদ! আমাদের মোকাবিলায় আমাদের নিজেদের গোত্র থেকে আমাদের সমকক্ষদের বের করে দাও!”
রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ময়দানে থাকা এই তিন বীর সাহাবীর জন্য দোয়া করার পর তাঁদের নিজ নিজ জায়গায় ফিরে আসার আদেশ দিলেন। তারপর সাহাবীগণের দিকে চোখ বুলিয়ে ইরশাদ করলেন, “হে বনু হাশিম! ওঠো! যারা তাদের বাতিল ধর্ম দিয়ে আল্লাহ তাআলার নূর নিভিয়ে দিতে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে হকের পথে লড়াই করো; কেননা আল্লাহ তাআলা তোমাদের নবীকে এ জন্যই পাঠিয়েছেন। ওঠো, হে উবাইদা! ওঠো, হে হামজা! ওঠো, হে আলি!”
আল্লাহ তাআলার সিংহ হযরত হামজা, হযরত আলি ও হযরত উবাইদা শিরস্ত্রাণ পরে ময়দানে এগিয়ে গেলেন। তাঁরা তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে মুশরিকরা বলল, “তোমরা কারা? যদি আমাদের সমকক্ষ হও, তবে তোমাদের সঙ্গে লড়ব।” তাঁরা উত্তর দিলেন, “আমি হামজা! আমি আলি! আমি উবাইদা!” তখন মুশরিকরা বলল, “তোমরাও আমাদের মতো সম্ভ্রান্ত লোক। তোমাদের সঙ্গে লড়তে আমরা রাজি।” বীর ইসলামি মুজাহিদরা প্রথমে মুশরিকদের ঈমানের দাওয়াত দিলেন, কিন্তু তারা তা গ্রহণ করল না। তখন তিনজন একসঙ্গে তলোয়ার কোষমুক্ত করে মুশরিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। হযরত হামজা ও হযরত আলি এক আঘাতেই কাফির উতবা ও ওয়ালিদকে হত্যা করলেন। হযরত উবাইদা শাইবাকে আহত করলেন। শাইবাও উবাইদাকে আহত করল। হযরত হামজা ও হযরত আলি উবাইদার সাহায্যে ছুটে গিয়ে সেখানেই শাইবাকে হত্যা করলেন। তাঁরা হযরত উবাইদাকে কোলে তুলে রাসূলুল্লাহর কাছে নিয়ে এলেন।16 হযরত উবাইদা ইবনে হারিসের মুবারক পায়ের গোড়ালি থেকে রক্ত ও মজ্জা ঝরছিল। নিজের এ অবস্থার দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই অবস্থায় যদি মারা যাই, তবে কি আমি শহিদ নই?” মহানবী ইরশাদ করলেন, “হ্যাঁ, তুমি শহিদ।” এভাবে তিনি তাঁকে জান্নাতি হওয়ার সুসংবাদ দিলেন। (হযরত উবাইদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে সাফরা নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন।) এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে তিনজন গুরুত্বপূর্ণ লোক হারিয়ে মুশরিকরা হতভম্ব হয়ে পড়ল। তবু আবু জাহল তার বাহিনীর মনোবল চাঙা করার জন্য সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিল, “তোমরা উতবা, শাইবা ও ওয়ালিদের মৃত্যুর দিকে তাকিয়ো না; তারা লড়াইয়ে তাড়াহুড়া করে অনর্থক মারা গেছে! কসম খেয়ে বলছি, মুসলমানদের ধরে দড়িতে না বেঁধে আমরা ফিরব না!…” আর বীর সাহাবায়ে কেরাম এই মুশরিক দলকে যত দ্রুত সম্ভব তলোয়ারের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মুবারক মুখে অবিরাম এই দোয়া পুনরাবৃত্তি করছিলেন, “হে আল্লাহ! আমাকে দেওয়া তোমার ওয়াদা পূরণ করো!… হে আল্লাহ! তুমি যদি এই মুষ্টিমেয় মুসলমান জামাআতকে ধ্বংস করে দাও, তবে পৃথিবীর বুকে তোমার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না!…”
এ সময় মুশরিকদের সারি থেকে কুরাইশদের সবচেয়ে সাহসী ও অব্যর্থ তিরন্দাজদের একজন, হযরত আবু বকরের তখনো মুসলমান না হওয়া পুত্র আবদুর রহমান ময়দানে বেরিয়ে এসে প্রতিদ্বন্দ্বী চাইল। জুলাই মাসের এই দুপুরের প্রখর গরমে মুজাহিদদের সারি থেকেও দেখা গেল, একজন সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ারে হাত দিয়ে সামনে এগিয়ে আসছেন। তিনি ছিলেন প্রথম মুসলমান হওয়ার এবং সিদ্দিকের মর্যাদার গৌরবে ভূষিত, নবীদের পর সকল মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, বীর হযরত আবু বকর… তিনি নিজের পুত্রের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য সামনে ছুটে গেলেন। কিন্তু জগৎসমূহের সরদার তাঁকে বললেন, “হে আবু বকর! তুমি কি জানো না, তুমি আমার দেখার চোখ, শোনার কানের মতো? আমার পাশ থেকে সরে যেয়ো না! আমার দেহ ও অন্তরে যে কষ্টই আসে, তোমার মুবারক চেহারা দেখলে তা হালকা হয়ে যায়। তোমার কারণে আমার অন্তর শক্তি পায়।”
এভাবে তিনি তাঁকে লড়াই থেকে বিরত রাখলেন। আবু বকর সিদ্দিক তাঁর পুত্রকে না বলে পারলেন না, “হে দুর্বৃত্ত! আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কোথায় গেল?”
এরপর দেখা গেল, নবীদের সুলতান হাবিবে আকরাম মহানবী মাটির দিকে ঝুঁকে এক মুঠো বালি তুলে নিলেন। সেই বালি শত্রুর দিকে ছুড়ে দিয়ে তিনি বললেন, “কালো হোক তাদের চেহারা!… হে আল্লাহ! তাদের অন্তরে ভয় ঢেলে দাও, তাদের পায়ে কম্পন ধরিয়ে দাও!” তারপর সাহাবীগণের দিকে ফিরে আদেশ দিলেন, “আক্রমণ করো!… ঝাঁপিয়ে পড়ো!” গৌরবময় সাহাবীগণ এই একটি ইশারারই অপেক্ষায় ছিলেন; তাঁরা আগে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী এগোতে শুরু করলেন। “আল্লাহু আকবার!… আল্লাহু আকবার!…” ধ্বনির মাঝে তির শাঁ শাঁ করে ছুটতে লাগল, পাথর লক্ষ্যে আঘাত হানতে লাগল, বর্শা বর্মে আছড়ে পড়তে লাগল… আল্লাহ তাআলার সিংহরা বীরবিক্রমে লড়ছিলেন: হযরত হামজা দুই হাতে দুই তলোয়ার নিয়ে লড়ছিলেন; হযরত আলি, হযরত উমর, জুবাইর ইবনে আওয়াম, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, আবু দুজানা17 ও আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ মুশরিকদের সারির এক প্রান্ত দিয়ে ঢুকে অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, কাফিরদের দিশেহারা করে দিচ্ছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকে যেন এক একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছিলেন। “আল্লাহু আকবার!… আল্লাহু আকবার!…” ধ্বনি জগৎ ভরিয়ে দিচ্ছিল, আল্লাহ তাআলার মহিমার বিশালতা কাফিরদের মাথায় হাতুড়ির মতো আঘাত হানছিল। মহানবী “ইয়া হাইয়ু! ইয়া কাইয়ুম! ইয়া হাইয়ু! ইয়া কাইয়ুম!” বলে আল্লাহ তাআলার কাছে মিনতি করছিলেন। হযরত আলি বলেছেন, “বদরে আমাদের সবার মধ্যে সবচেয়ে সাহসী, সবচেয়ে বীর ছিলেন রাসূল আলাইহিস সালাম। মুশরিকদের সারির সবচেয়ে কাছে ছিলেন তিনিই। বিপদে পড়লে আমরা তাঁরই আশ্রয় নিতাম।”
মুশরিকরা তাদের নেতা আবু জাহলকে মাঝখানে রেখে ঘিরে রাখল। তাদের একজনকে আবু জাহলের মতো পোশাক পরিয়ে তার মতো সাজাল। এই হতভাগার নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবনে মুনজির। হযরত আলি আবদুল্লাহর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং আবু জাহলের চোখের সামনেই তার মাথা কেটে ফেললেন। এরপর তারা আবু কাইসকে সেভাবে সাজাল। তাকেও হযরত হামজা হত্যা করলেন।
হযরত আলি এক মুশরিকের সঙ্গে লড়ছিলেন। মুশরিকটি হযরত আলির দিকে তলোয়ার চালিয়েছিল, কিন্তু তলোয়ারটি ঢালে বিঁধে আটকে গিয়েছিল। হযরত আলি তাঁর জুলফিকার মুশরিকের বর্মাবৃত দেহে চালিয়ে বর্মসহ তাকে কাঁধ থেকে বুক পর্যন্ত চিরে ফেলছিলেন, ঠিক তখন দেখলেন, মাথার ওপর একটি তলোয়ার ঝলসে উঠেছে। তিনি দ্রুত মাথা নিচু করলেন। তখনই পেছন থেকে কেউ বলে উঠলেন, “নাও! এটা হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের পক্ষ থেকে!”, আর মুশরিকটির মাথা শিরস্ত্রাণসহ মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। হযরত আলি ফিরে তাকিয়ে দেখলেন, তাঁর চাচা হযরত হামজা দুই তলোয়ার দিয়ে লড়ছেন। মহানবী যখনই সাহাবীগণকে এভাবে বীরের মতো লড়তে দেখতেন, তাঁদের প্রশংসা করে ইরশাদ করতেন, “তাঁরা পৃথিবীর বুকে আল্লাহ তাআলার সিংহ।”
“হে আল্লাহ! আমাকে দেওয়া তোমার ওয়াদা পূরণ করো!… হে আল্লাহ! তুমি যদি এই মুষ্টিমেয় মুসলমান জামাআতকে ধ্বংস করে দাও, তবে পৃথিবীর বুকে তোমার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না!…” হাদীস শরীফ
এক সময় মহানবীর ঠিক পাশে লড়াইরত হযরত উক্কাশার তলোয়ার ভেঙে গেল। তা দেখে আমাদের প্রিয় নবী মাটিতে পড়ে থাকা একটি লাঠি তুলে তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “হে উক্কাশা! এটা দিয়ে লড়াই করো!…” উক্কাশা লাঠিটি হাতে নিতেই মহানবীর মুজিযায় তা লম্বা, ঝকঝকে, মজবুত পিঠওয়ালা ধারালো এক তলোয়ারে পরিণত হলো। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত তিনি এই তলোয়ার দিয়ে বহু মুশরিককে হত্যা করলেন।
জগৎসমূহের সরদার রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিকে লড়াই করছিলেন, অন্যদিকে সাহাবীগণকে উদ্দীপ্ত করে এই মুবারক হাদীস শরীফ বলছিলেন, “যাঁর কুদরতের হাতে আমার প্রাণ, সেই আল্লাহ তাআলার কসম, আজ যারা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় ধৈর্য ও অবিচলতা দেখিয়ে লড়াই করবে এবং পিছু না হটে সামনে এগোতে এগোতে নিহত হবে, হক তাআলা অবশ্যই তাদের তাঁর জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” এই মুবারক বাণী শুনে উমাইর ইবনে হুমাম বললেন, “কী চমৎকার! কী চমৎকার! তাহলে জান্নাতে প্রবেশের জন্য শহিদ হওয়া ছাড়া আমার আর কিছুই দরকার নেই!” – এই বলে তিনি আক্রমণ আরও তীব্র করলেন। একদিকে তিনি শত্রুর সঙ্গে লড়ছিলেন, অন্যদিকে বলছিলেন, “আল্লাহ তাআলার কাছে বস্তুগত পাথেয় নিয়ে নয়, কেবল হক তাআলার ভয়, আখিরাতের আমল এবং জিহাদে ধৈর্য ও অবিচলতা নিয়েই যাওয়া যায়। এ ছাড়া বাকি সব পাথেয় নিঃসন্দেহে ফুরিয়ে যায়, নিঃশেষ হয়ে যায়!…” এভাবে তিনি শহিদ হওয়া পর্যন্ত লড়াই করলেন।
যুদ্ধ ভীষণ তীব্র হয়ে উঠল!… একজন সাহাবীর ওপর একসঙ্গে অন্তত তিনজন মুশরিক ঝাঁপিয়ে পড়ছিল। গৌরবময় সাহাবায়ে কেরাম তাদের প্রত্যেকের দিকে আলাদা আলাদা তলোয়ার চালানোর চেষ্টা করছিলেন; কোনো কিছুই তাঁদের দমাতে পারছিল না। যতবার তাঁরা “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!…” বলতেন, ততবার নতুন শক্তি পেতেন, বারবার আক্রমণ করেও ক্লান্ত হতেন না। এক সময় মুশরিকদের আক্রমণ তীব্র হলো, সাহাবায়ে কেরাম কঠিন অবস্থায় পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ হযরত আবু বকরকে নিয়ে খেজুরের ডাল দিয়ে বানানো তাঁর তাঁবুতে প্রবেশ করলেন। মহানবী আবার আল্লাহ তাআলার কাছে মুনাজাত শুরু করলেন। তিনি মিনতি করে বলছিলেন, “হে আমার রব! আমাকে যে সাহায্যের ওয়াদা দিয়েছ, তা দান করো!…” ঠিক সেই মুহূর্তে ওহী এল। তাতে মর্মার্থে ইরশাদ হলো, “সেই সময় তোমরা তোমাদের রবের কাছে সাহায্য ও বিজয় প্রার্থনা করছিলে, আর তিনি তোমাদের বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি পরপর আগমনকারী এক হাজার ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করব।’ এভাবে তিনি তোমাদের এই প্রার্থনার জবাব দিয়েছিলেন এবং তোমাদের দোয়া কবুল করেছিলেন।”18 মহানবী সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন এবং ইরশাদ করলেন, “সুসংবাদ, হে আবু বকর! তোমার কাছে আল্লাহ তাআলার সাহায্য এসে পৌঁছেছে! ওই যে জিবরাইল। বালির টিলাগুলোর ওপর ঘোড়ার লাগাম ধরে, অস্ত্রসজ্জিত হয়ে আদেশের অপেক্ষা করছেন।” সূরা আনফালে যেমন জানানো হয়েছে, মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের মর্মার্থে বলেছিলেন, “স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের প্রতি ওহী পাঠালেন, ’আমি তোমাদের সঙ্গে আছি (মুসলমানদের বিজয় ও সাহায্য দানের ব্যাপারে)। অতএব মুমিনদের (বিজয়ের সুসংবাদ দিয়ে) সাহায্য করো, তাদের শক্তি ও সামর্থ্য জোগাও। আমি এখনই কাফিরদের অন্তরে আতঙ্ক ও ভয় ঢেলে দেব। তোমরা তাদের ঘাড়ের ওপর আঘাত করো, তাদের হাত-পায়ের আঙুলের গিরা ও জোড়াগুলো ভেঙে দাও।’ কারণ তারা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। যে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে (সে তাঁর শাস্তির সম্মুখীন হয়), আল্লাহ তাআলার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর!”19
এই আদেশের পর জিবরাইল, মিকাইল ও ইসরাফিল আলাইহিমুস সালাম প্রত্যেকে এক হাজার করে ফেরেশতা সঙ্গে নিয়ে যথাক্রমে আমাদের প্রিয় নবীর পাশে, তাঁর ডানে ও তাঁর বাঁয়ে নিজ নিজ স্থান গ্রহণ করলেন।20
জিবরাইল আলাইহিস সালামের মাথায় জড়ানো ছিল হলুদ পাগড়ি। অন্য ফেরেশতাদের মাথায় ছিল সাদা পাগড়ি। পাগড়ির প্রান্ত তাঁরা পিঠের ওপর ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন, আর চড়েছিলেন সাদা ঘোড়ায়। সরওয়ারে আলম মহানবী সাহাবীগণকে বললেন, “ফেরেশতাদের নিদর্শন ও চিহ্ন আছে। তোমরাও নিজেদের জন্য একটি করে নিদর্শন ও চিহ্ন বানিয়ে নাও!”
জুবাইর ইবনে আওয়াম মাথায় হলুদ এবং আবু দুজানা লাল একটি কাপড় পাগড়ির মতো করে জড়ালেন। হযরত আলি লাগালেন একটি সাদা পালক, আর হযরত হামজা বুকে গুঁজে দিলেন উটপাখির পালক। ফেরেশতারা যুদ্ধে প্রবেশ করতেই মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেল। সাহাবায়ে কেরাম সামনের কাফিরের দিকে তলোয়ার চালানোর আগেই তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। দেখা যাচ্ছিল, মহানবীর ডানে-বাঁয়ে, সামনে ও পেছনে অপরিচিত কিছু লোক মুশরিকদের সঙ্গে লড়াই করছেন।
হযরত সাহল বর্ণনা করেন, “বদরের গাজওয়ায় আমরা কেউ যখন কোনো মুশরিকের মাথা লক্ষ্য করে তলোয়ার চালাতাম, তলোয়ার লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগেই দেখতাম, তার মাথা দেহ থেকে আলাদা হয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে!…”
আবু জাহলের নিহত হওয়া
মুশরিকদের পতাকাবাহী আবু আজিজ ইবনে উমাইর বন্দি হলো। আর তাদের সেনাপতি আবু জাহল কুরাইশদের সাহস জোগানোর জন্য অনবরত কবিতা আবৃত্তি করে তার বাহিনীর মনোবল চাঙা করার চেষ্টা করছিল। সে টগবগে যুবকের মতো আক্রমণ করছিল, “আমার মা আমাকে এই দিনগুলোর জন্যই জন্ম দিয়েছে!…” বলে দম্ভ করছিল এবং তরুণদের উৎসাহিত করছিল। মুশরিকদের মধ্যে উবাইদা ইবনে সাঈদ আপাদমস্তক বর্মে ঢাকা ছিল। কেবল তার চোখ দুটো দেখা যাচ্ছিল। ঘোড়ার পিঠে একবার এদিকে, একবার ওদিকে ঘুরে সে “আমি আবু জাতুল কারিশ! আমি আবু জাতুল কারিশ!”, অর্থাৎ “আমি বড় পেটওয়ালা, পেটের বাপ” বলে নিজের মতো করে যুদ্ধের আহ্বান জানাচ্ছিল। বীর মুজাহিদ হযরত জুবাইর ইবনে আওয়াম তার কাছে এগিয়ে গেলেন, বর্শাটি ঠিক তার চোখ বরাবর তাক করলেন এবং “আল্লাহু আকবার!” বলে ছুড়ে মারলেন। লক্ষ্যভেদী বর্শা তাকে ঘোড়া থেকে মাটিতে ফেলে দিল। হযরত জুবাইর দৌড়ে তার কাছে পৌঁছালে দেখা গেল, উবাইদা মরে গেছে। তার গালে পা রেখে সর্বশক্তি দিয়ে টানার পর বর্শাটি অনেক কষ্টে বের হলো; সেটি বেঁকে গিয়েছিল। বদরের যুদ্ধে হযরত জুবাইরের দেখানো বীরত্ব ছিল অসাধারণ। তাঁর দেহে আঘাত না পাওয়া কোনো জায়গা বাকি ছিল না। তাঁর পুত্র উরওয়া এ সম্পর্কে বলেছেন, “আমার বাবা তলোয়ারের তিনটি গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন। তার একটি ছিল ঘাড়ে। ক্ষতটি এত গভীর দাগ রেখে গিয়েছিল যে, আমি তার ভেতরে আঙুল ঢোকাতে পারতাম।” আবদুর রহমান ইবনে আওফও কুরাইশদের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করছিলেন; আঘাত থেকে ঝরা রক্তের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সামনে যে-ই আসছিল, তাকেই ধরাশায়ী করছিলেন। হযরত আবদুর রহমান নিজের চোখে দেখা একটি ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেন, “এক সময় আমার সামনে আর কেউ ছিল না। ডানে-বাঁয়ে তাকাতেই আনসারদের দুজন তরুণ আমার চোখে পড়ল। আমি চাইছিলাম, এদের মধ্যে যে বেশি শক্তিশালী ও সাহসী, তার সঙ্গে থাকি। এই দুই তরুণের একজন আমাকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিল, তারপর আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, ‘চাচা! আপনি কি আবু জাহলকে চেনেন?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, চিনি।’ তারপর জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাতিজা, আবু জাহলকে দিয়ে তুমি কী করবে?’ সে বলল, ‘আমাকে জানানো হয়েছে, সে নাকি রাসূলুল্লাহকে গালি দেয়। আল্লাহ তাআলার কসম, তাকে একবার দেখতে পেলে তাকে হত্যা না করা পর্যন্ত কিংবা নিজে মারা না যাওয়া পর্যন্ত আমি কখনো তার পিছু ছাড়ব না।’ এক তরুণের আবেগভরা এই দৃঢ় ও অটল কথায় সত্যি বলতে আমি অবাক হয়ে গেলাম।
“হে আবু বকর! তুমি কি জানো না, তুমি আমার দেখার চোখ, শোনার কানের মতো? আমার পাশ থেকে সরে যেয়ো না! আমার দেহ ও অন্তরে যে কষ্টই আসে, তোমার মুবারক চেহারা দেখলে তা হালকা হয়ে যায়। তোমার কারণে আমার অন্তর শক্তি পায়” হাদীস শরীফ
এই দুই তরুণের অন্যজনও আমাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে প্রথমজন যা বলেছিল, তা-ই বলল। ঠিক তখন আমি আবু জাহলকে দেখতে পেলাম! সে কুরাইশ বাহিনীর মধ্যে এক মুহূর্তও না থেমে সামনে-পেছনে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমি বললাম, ‘হে তরুণেরা! ওই যে এদিক-ওদিক ব্যস্ত হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, ওই লোকটিই আবু জাহল।’ এ কথা শুনেই তারা তলোয়ার আঁকড়ে ধরে আবু জাহলের দিকে এগিয়ে গেল।
তারা লড়াই শুরু করল। এই তরুণেরা ছিলেন আফরা খাতুনের দুই পুত্র – মুআজ ও মুআওয়িজ নামের দুই ভাই।” এ সময় সাহাবায়ে কেরামের অন্যতম বীর মুআজ ইবনে আমর আবু জাহলের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পেয়ে গেলেন। লম্বা লেজওয়ালা এক ঘোড়ার পিঠে বসা আবু জাহলের ওপর তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং সর্বশক্তি দিয়ে তার পায়ে তলোয়ারের আঘাত হানলেন। আবু জাহলের পা কেটে মাটিতে পড়ে গেল। ঠিক তখন ইকরিমা – যে তখনো মুসলমান হয়নি – পিতার সাহায্যে ছুটে এসে হযরত মুআজ ইবনে আমরের সঙ্গে লড়াই শুরু করল।
সেই মুহূর্তে মুআজ ও মুআওয়িজ দুই ভাই বাজপাখির মতো সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সামনে যে-ই এল, তাকে ধরাশায়ী করে তাঁরা আবু জাহলের কাছে পৌঁছে গেলেন। তাকে মৃত মনে না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা তলোয়ার দিয়ে আঘাত করতে থাকলেন।
আর হযরত মুআজ ইবনে আমর ইকরিমার সঙ্গে লড়াইয়ের সময় হাতে ও বাহুতে আঘাত পেয়েছিলেন। তাঁর মুবারক হাত কবজি থেকে কেটে গিয়ে চামড়ার সঙ্গে ঝুলে ছিল। মুআজ ইবনে আমর লড়াইয়ে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন; হাতের দিকে মনোযোগ দেওয়ার, চিকিৎসার জন্য তা বেঁধে নেওয়ার সময় তাঁর ছিল না। কাটা হাত চামড়ার সঙ্গে ঝুলে দুলতে থাকলেও তিনি বীরের মতো লড়াই করে যাচ্ছিলেন।
আল্লাহু আকবার!… এ কী মজবুত ঈমান!… এ কী দেখার মতো দৃশ্য!… কিছুক্ষণ এভাবে লড়াই করার পর হযরত মুআজ দেখলেন, তাঁর নড়াচড়ার সামর্থ্য কমে আসছে। এর কারণ ছিল কাটা হাতটি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেটি পায়ের নিচে চেপে ধরে ছিঁড়ে ফেলে দিলেন…21
ইসলামের কট্টর শত্রুদের অন্যতম নওফল ইবনে খুওয়াইলিদ ছিল কুরাইশদের সবচেয়ে নামকরা পালোয়ানদের একজন। সে অনবরত চিৎকার করছিল, মুশরিকদের দলকে উত্তেজিত ও উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। তার এ অবস্থা দেখে মহানবী দোয়া করেছিলেন, “হে আল্লাহ! নওফল ইবনে খুওয়াইলিদের বিরুদ্ধে আমার সাহায্যকারী হও। তার উপযুক্ত ব্যবস্থা করো।” আল্লাহ তাআলার সিংহ হযরত আলি মুশরিক নওফলকে দেখামাত্র তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এমন প্রচণ্ড শক্তিতে তলোয়ার নামালেন যে, বর্মে ঢাকা থাকা সত্ত্বেও তার দুটি পা একসঙ্গে কেটে গেল। তারপর তার ঘাড়ে তলোয়ার চালিয়ে মাথা দেহ থেকে আলাদা করে দিলেন।22
উমাইয়া ইবনে খালাফ ছিল মুশরিকদের মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুরদের একজন; এই লোকই বিলাল হাবশিকে উত্তপ্ত বালিতে শুইয়ে তাঁর বুকে বড় বড় পাথর চাপিয়ে দিয়েছিল। রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কষ্ট দেওয়ার কোনো সুযোগই সে হাতছাড়া করত না। ইসলামের এই বড় শত্রু বদর উপত্যকায়ও মুশরিকদের একত্র করার এবং ইসলামের নূর নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। তার এ অবস্থা দেখে হযরত বিলাল খোলা তলোয়ার হাতে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়ালেন এবং “হে কুফরের মাথা উমাইয়া ইবনে খালাফ!… তুমি বেঁচে গেলে আমি বাঁচব না!” বলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। একই সঙ্গে তিনি চিৎকার করে বললেন, “হে আনসার ভাইয়েরা! ছুটে এসো, কুফরের মাথা এখানে!” – আর তখনই সাহাবায়ে কেরাম উমাইয়াকে ঘিরে ফেললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তাকে হত্যা করলেন।23
মুশরিক বাহিনীতে এখন আর কোনো নেতা অবশিষ্ট ছিল না। তাদের প্রত্যেকে কী করবে ভেবে না পেয়ে যেদিকে পারছিল, পালানোর চেষ্টা করছিল। কুফরের দুর্গ ধসে পড়ল। গৌরবময় সাহাবীগণ তাদের ধাওয়া করে চললেন। মুশরিকদের একাংশ বন্দি হলো। বন্দিদের মধ্যে আমাদের প্রিয় নবীর চাচা আব্বাসও ছিলেন।24
বিজয় ছিল ঈমানদারদের
মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর গৌরবময় সাহাবীগণকে জিজ্ঞেস করলেন, “নওফল ইবনে খুওয়াইলিদ সম্পর্কে কেউ কিছু জানো?” হযরত আলি এগিয়ে এসে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাকে আমি হত্যা করেছি।” এ খবরে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে আমাদের প্রিয় নবী “আল্লাহু আকবার!” বলে তাকবির দিলেন এবং ইরশাদ করলেন, “আল্লাহ তাআলা তার ব্যাপারে আমার দোয়া কবুল করেছেন।”
উমাইয়া ইবনে খালাফের নিহত হওয়ার খবর দেওয়া হলে তিনি এতেও অত্যন্ত খুশি হলেন এবং ইরশাদ করলেন, “আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তাআলার শোকর। আমার রব তাঁর বান্দাকে সত্য প্রমাণ করেছেন, তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করেছেন।”
রাসূলে আকরাম আবু জাহল সম্পর্কে বললেন, “আবু জাহল কী করল, তার কী হলো, কে গিয়ে একটু দেখে আসবে?” – এই বলে তিনি নিহতদের মধ্যে তাকে খুঁজে দেখার আদেশ দিলেন। তাঁরা খুঁজলেন, কিন্তু পেলেন না। মহানবী ইরশাদ করলেন, “খোঁজো, তার ব্যাপারে আমার একটি কথা আছে। যদি তাকে চিনতে না পারো, তবে তার হাঁটুর ক্ষতচিহ্ন দেখো। একদিন আমি আর সে আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ভোজসভায় ছিলাম। আমরা দুজনই তখন তরুণ। আমি তার চেয়ে একটু বড় ছিলাম। ভিড়ের চাপে আমি তাকে ধাক্কা দিয়েছিলাম। সে হাঁটুর ওপর পড়ে গিয়েছিল। তার এক হাঁটুতে আঘাত লেগেছিল, আর সেই ক্ষতের দাগ তার হাঁটু থেকে কখনো মুছে যায়নি।”
এরপর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আবু জাহলকে খুঁজতে গেলেন। তিনি তাকে আহত অবস্থায় পেলেন এবং চিনে ফেললেন। তিনি বললেন, “তুমিই কি আবু জাহল?” তিনি তার ঘাড়ে পা রাখলেন। তার দাড়ি ধরে টেনে বললেন, “হে আল্লাহ তাআলার দুশমন! অবশেষে আল্লাহ তাআলা তোমাকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করলেন তো?” আবু জাহল বলল, “কেন তিনি আমাকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করবেন! ওরে মেষপালক! আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করুন। তুমি তো এমন খাড়া জায়গায় চড়ে বসেছ, যেখানে চড়া খুবই কঠিন! তুমি আমাকে বলো, আজ বিজয় ও প্রাধান্য কোন পক্ষে?” হযরত ইবনে মাসউদ বললেন, “বিজয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষে।” আবু জাহলের মাথা থেকে শিরস্ত্রাণ খুলতে খুলতে তিনি বললেন, “হে আবু জাহল! আমি তোমাকে হত্যা করব।” আবু জাহল বলল, “তুমিই প্রথম নও, যে নিজ সম্প্রদায়ের সরদারকে হত্যা করছে। তবে সত্যি বলতে, তোমার হাতে মরা আমার কাছে খুবই কঠিন লাগবে। অন্তত আমার ঘাড়টা বুকের কাছাকাছি থেকে কেটো, যাতে আমার মাথা প্রতাপশালী দেখায়!” – এ কথা বলে সে দেখিয়ে দিল, তার কুফর, দম্ভ ও অহংকার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
ইবনে মাসউদ নিজের তলোয়ার দিয়ে আবু জাহলের মাথা কাটতে না পেরে আবু জাহলেরই তলোয়ার দিয়ে কাটলেন। তারপর তার অস্ত্র, বর্ম, শিরস্ত্রাণ ও মাথা এনে মহানবীর সামনে রেখে বললেন, “আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি আল্লাহ তাআলার দুশমন আবু জাহলের মাথা।” আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।” তারপর তিনি উঠে সাহাবীগণকে সঙ্গে নিয়ে আবু জাহলের লাশ পর্যন্ত গেলেন। সেখানে ইরশাদ করলেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি তোমাকে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ করেছেন।
হে আল্লাহর দুশমন! তুমি ছিলে এই উম্মতের ফিরআউন।” এরপর “হে আমার রব! আমাকে দেওয়া ওয়াদা তুমি পূরণ করেছ” বলে তিনি আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আহত সাহাবায়ে কেরামের ক্ষতস্থান বাঁধার ব্যবস্থা করলেন। শহিদদের চিহ্নিত করালেন। মুহাজিরদের ছয়জন ও আনসারদের আটজন – মোট চৌদ্দজন শহিদ হয়েছিলেন। তাঁদের সবার মুবারক রুহ যখন জান্নাতে উড়ে যাচ্ছিল, তখন ইসলামের নূর নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত মুশরিকদের সত্তরজন নিহত হলো এবং সত্তরজন বন্দি হলো। রাসূলুল্লাহ বিজয়ের সুসংবাদ পৌঁছানোর জন্য আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ও জায়েদ ইবনে হারিসাকে মদিনায় পাঠালেন। মহানবী শহিদদের জানাজার25 নামাজ পড়িয়ে তাঁদের কবরে দাফন করালেন। মুশরিকদের লাশগুলোর চব্বিশটি একটি পরিত্যক্ত শুকনো কূপে এবং বাকিগুলো একসঙ্গে গর্তে ফেলে মাটি চাপা দেওয়া হলো। জগৎসমূহের সরদার তাঁর সম্মানিত সাহাবীগণকে নিয়ে কূপের কাছে এসে বললেন, “হে কূপে নিক্ষিপ্তরা!” তারপর নিহত মুশরিকদের নাম তাদের পিতার নামসহ এক এক করে উল্লেখ করে ইরশাদ করলেন, “হে উতবা ইবনে রাবিআ! হে উমাইয়া ইবনে খালাফ! হে আবু জাহল ইবনে হিশাম!… তোমাদের নবীর প্রতি তোমরা কত মন্দ এক সম্প্রদায় ছিলে! তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছ, আর অন্যরা আমাকে সত্যায়ন করেছে, সত্য বলে মেনে নিয়েছে। তোমরা আমাকে আমার শহর, আমার দেশ থেকে বের করে দিয়েছ, আর অন্যরা আমার জন্য তাদের দরজা খুলে দিয়েছে এবং আমাকে বুকে টেনে নিয়েছে। তোমরা আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছ, আর অন্যরা আমাকে সাহায্য করেছে। আমার রব যে ওয়াদা দিয়েছিলেন, তা কি তোমরা পেয়েছ? আমি আমার রবের ওয়াদা করা বিজয় পেয়েছি।”
“(হে আমার সাহাবীগণ!) ফেরেশতাদের নিদর্শন ও চিহ্ন আছে। তোমরাও নিজেদের জন্য একটি করে নিদর্শন ও চিহ্ন বানিয়ে নাও!” হাদীস শরীফ
হযরত উমর জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি পচে যাওয়া লাশদের সঙ্গে কথা বলছেন?” তখন রাসূলে আকরাম ইরশাদ করলেন, “যে রব আমাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম করে বলছি, তোমরা আমার কথা তাদের চেয়ে বেশি শুনতে পাও না। কিন্তু তারা উত্তর দিতে পারে না।”
যুদ্ধের ময়দান থেকে প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া মুশরিকরা সঙ্গে আনা কোনো কিছুই নিয়ে যেতে পারেনি। সবই মুসলমানদের হাতে এল। মহানবী গনিমতের মাল বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল সাহাবীর মধ্যে ভাগ করে দিলেন। তাঁরা বদরে আরও তিন রাত থাকলেন এবং উনিশ দিন পর মদিনায় ফিরে এলেন। এদিকে সুসংবাদদাতা হিসেবে পাঠানো আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ও জায়েদ ইবনে হারিসা মদিনার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। রবিবার পূর্বাহ্ণে আকিক নামক স্থানে পৌঁছে তাঁরা আলাদা হয়ে গেলেন। আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এক দিক দিয়ে, আর জায়েদ ইবনে হারিসা অন্য দিক দিয়ে মদিনায় প্রবেশ করলেন। তাঁরা ঘরে ঘরে গিয়ে বিজয়ের খবর জানাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহর কবি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা উচ্চকণ্ঠে এই কবিতা আবৃত্তি করে বিজয়ের সুসংবাদ দিচ্ছিলেন:
হে আনসার জামাআত! তোমাদের দিই সুসংবাদ,
সুস্থ ও নিরাপদ আছেন আল্লাহর নবী।
মুশরিকরা নিহত হলো, হলো বন্দিও,
বন্দিদের মাঝে আছে বহু নামকরা লোক।
রাবিআ আর হাজ্জাজের পুত্ররা সবাই,
বদরে নিহত হলো আবু জাহল আমর ইবনে হিশামও।
হযরত আসিম ইবনে আদি জিজ্ঞেস করলেন, “হে ইবনে রাওয়াহা! তুমি যা বলছ, তা কি সত্য?” আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা বললেন, “হ্যাঁ, আল্লাহর কসম, সত্য! ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল রাসূলুল্লাহও হাত বাঁধা বন্দিদের সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসবেন!”
হযরত রুকাইয়ার ইন্তেকাল
সেদিন আমাদের প্রিয় নবীর কন্যা হযরত রুকাইয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ইন্তেকাল করেছিলেন। তাঁর স্বামী হযরত উসমান জানাজার নামাজ পড়িয়েছিলেন। এই শোকের ওপর আসা বিজয়ের খবর তাঁদের মন কিছুটা হালকা করল।
যে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বদরের বিজয় দান করেছেন, মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীগণকে নিয়ে তাঁর প্রশংসা করলেন এবং শোকরের সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। তারপর বন্দিদের সঙ্গে নিয়ে মদিনা মুনাওয়ারার দিকে রওনা হলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ও জায়েদ ইবনে হারিসা আগেই সুসংবাদ পৌঁছে দিয়ে বদরের গাজওয়ায় যা যা ঘটেছে এবং কারা কারা শহিদ হয়েছেন, তা জানিয়েছিলেন। মদিনায় থেকে যাওয়া শিশু, নারী ও দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিজয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। তাঁরা মহানবীকে অভ্যর্থনা জানাতে বেরিয়ে এলেন। শহিদদের মধ্যে হারিসা ইবনে সুরাকাও ছিলেন। হযরত হারিসার মা রুবাইয়ি জানতে পেরেছিলেন যে, তাঁর পুত্র হাউজ থেকে পানি পান করার সময় শত্রুর তির লেগে শহিদ হয়েছেন। আমাদের মা রুবাইয়ি এ খবর শুনে বলেছিলেন, “রাসূল আলাইহিস সালাম না আসা পর্যন্ত আমি আমার ছেলের জন্য কাঁদব না। তিনি সৌভাগ্যের সঙ্গে মদিনায় তাশরিফ আনলে তাঁকে জিজ্ঞেস করব। যদি আমার ছেলে জান্নাতে থাকে, তবে একটুও কাঁদব না। আর যদি জাহান্নামে থাকে, তবে চোখ থেকে অশ্রুর বদলে রক্ত ঝরাব।”
আমাদের প্রিয় নবী সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে মদিনায় ফিরে এলে রুবাইয়ি তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, “আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ছেলে হারিসার প্রতি আমার ভালোবাসার কথা আপনি জানেন। সে কি শহিদ হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করেছে? যদি তা-ই হয়, তবে ধৈর্য ধরব। আর যদি না হয়, তবে চোখ থেকে রক্তের অশ্রু ঝরাব।” হাবিবে আকরাম মহানবী তাঁকে সুসংবাদ দিয়ে বললেন, “হে উম্মে হারিসা! তোমার ছেলে একটি নয়, বহু জান্নাতে আছে। তার স্থান ফিরদাউস।” এ কথা শুনে রুবাইয়ি বললেন, “এখন আর আমার ছেলের জন্য কাঁদব না।” বিশ্বজগতের সুলতান একটি পাত্রে পানি চাইলেন। দয়াপরবশ হয়ে তিনি নিজের মুবারক হাত পানিতে ডুবিয়ে তুলে আনলেন। সেই পানি তিনি হযরত হারিসার মা ও বোনকে পান করালেন। তা ছাড়া এই পানি তাঁদের মাথায় ও মুখে বুলিয়ে দিলেন। সেদিনের পর থেকে রুবাইয়ি ও তাঁর কন্যার চেহারা অত্যন্ত নূরানি হয়ে উঠল। তাঁরা অনেক দীর্ঘ আয়ুও পেলেন। খাজায়ে কায়েনাত মহানবী (আলাইহি আফজালুস সালাওয়াত) মদিনায় আনা সত্তরজন বন্দিকে সাহাবীগণের মধ্যে ভাগ করে দিলেন এবং তাদের সঙ্গে সদাচরণের আদেশ দিলেন। বন্দিদের পরিণতি সম্পর্কে তখনো আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কোনো ওহী আসেনি। রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণের সঙ্গে পরামর্শ করে বন্দিদের মুক্তিপণের (ফিদিয়ার) বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
প্রত্যেক বন্দির সম্পদ অনুযায়ী মুক্তিপণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হলো। যাদের টাকাপয়সা ছিল না, তাদের মধ্যে যারা পড়তে-লিখতে জানত, তাদের জন্য নিয়ম হলো: তারা মদিনার এমন দশজনকে লেখাপড়া শেখাবে, যারা পড়তে-লিখতে জানে না; এরপরই কেবল মক্কায় যেতে পারবে। মহানবী বন্দিদের মধ্যে থাকা তাঁর চাচা আব্বাসকে বললেন, “হে আব্বাস! তোমার নিজের জন্য এবং তোমার ভাতিজা উকাইল (আকিল) ইবনে আবি তালিব ও নওফল ইবনে হারিসের জন্য মুক্তিপণ পরিশোধ করো। কেননা তুমি ধনী।” হযরত আব্বাস বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মুসলমান। কুরাইশরা আমাকে জোর করে বদরে নিয়ে এসেছে।” রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “তোমার মুসলমান হওয়ার কথা আল্লাহ তাআলা জানেন। তুমি সত্য বলে থাকলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাকে এর প্রতিদান দেবেন। কিন্তু বাহ্যিকভাবে তুমি আমাদের বিপক্ষে। তাই তোমাকে মুক্তিপণ পরিশোধ করতে হবে।” আব্বাস বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনারা আমার কাছ থেকে গনিমত হিসেবে যে ৮০০ দিরহাম নিয়েছেন, তা ছাড়া আমার আর কোনো সম্পদ নেই।” তখন মহানবী বললেন, “হে আব্বাস! তাহলে সেই সোনাগুলোর কথা বলছ না কেন?” তিনি বললেন, “কোন সোনা?” আমাদের প্রিয় নবী বললেন, “যেদিন তুমি মক্কা থেকে বের হচ্ছিলে, সেদিন তোমার স্ত্রী হারিসের কন্যা উম্মুল ফজলকে যে সোনাগুলো দিয়েছিলে! সেগুলো দেওয়ার সময় তোমাদের দুজন ছাড়া সেখানে আর কেউ ছিল না। তুমি উম্মুল ফজলকে সেগুলো দিয়ে বলেছিলে, ‘এই সফরে আমার কপালে কী আছে, জানি না। যদি কোনো বিপদে পড়ে ফিরতে না পারি, তবে এতটুকু তোমার, এতটুকু ফজলের জন্য, এতটুকু আবদুল্লাহর জন্য, এতটুকু উবাইদুল্লাহর জন্য, এতটুকু কুসামের জন্য।’” এ কথা শুনে হযরত আব্বাস বিস্মিত হয়ে বললেন, “কসম করে বলছি, আমি যখন এই সোনাগুলো আমার স্ত্রীকে দিচ্ছিলাম, তখন আমাদের কাছে কেউ ছিল না। আপনি এটা কোথা থেকে জানলেন?” মহানবী ইরশাদ করলেন, “আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন।” তখন আব্বাস বললেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহ তাআলার রাসূল এবং আপনি সত্য বলেন।” এভাবে তিনি কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন।26 হযরত আব্বাস মুসলমান হওয়ার পর মহানবী তাঁকে মক্কায় থেকে সেখানকার মুসলমানদের রক্ষা করার এবং ইসলামের শত্রুদের সম্পর্কে খবরাখবর পাঠানোর দায়িত্ব দিলেন।
“যে রব আমাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম করে বলছি, তোমরা তাদের (মুশরিকদের লাশগুলোর) চেয়ে বেশি শুনতে পাও না। কিন্তু তারা উত্তর দিতে পারে না” হাদীস শরীফ
বদরের গাজওয়ায় পরাজিত কুরাইশদের কাছে খবর পাঠানো হলো এবং তাদের জানানো হলো যে, তারা মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের বন্দিদের নিয়ে যেতে পারবে। তবে নাজর ইবনে হারিস হিজরতের আগে নবীদের সরদারকে অসংখ্য কষ্ট দিয়েছিল ও নির্যাতন করেছিল; তার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হলো। তেমনি নীচ উকবা ইবনে আবি মুআইতকেও হত্যা করা হলো; রাসূল আলাইহিস সালাম যখন কাবার কাছে নামাজ আদায় করছিলেন, তখন সে তাঁর মুবারক পিঠে উটের নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। ইসলামের এই কট্টর শত্রুর মাথা দেহ থেকে আলাদা হলে রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন। তার কাছে গিয়ে তিনি ইরশাদ করলেন, “আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল ও পবিত্র কুরআনকে অস্বীকারকারী, তাঁর নবীকে একের পর এক নির্যাতন করা তোমার মতো এত মন্দ লোক আমি আর কাউকে জানি না।”
বন্দিরা তাদের আত্মীয়রা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে না নেওয়া পর্যন্ত সাহাবায়ে কেরামের (আলাইহিমুর রিদওয়ান) কাছে রইল। সাহাবীগণ সবাই বন্দিদের সঙ্গে অত্যন্ত সদাচরণ করলেন, তাদের নিজেদের খাবারে শরিক করলেন।
মুসআব ইবনে উমাইরের ভাই আবু আজিজ বন্দিদের মধ্যে ছিল। সে বর্ণনা করেছে, “আমিও মদিনার এক মুসলমানের ঘরে বন্দি ছিলাম। তারা আমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করত; সকাল-সন্ধ্যায় তারা নিজেরা যে রুটি খেত, তা আমাকে দিত, আর নিজেরা কেবল খেজুর খেয়ে থাকতে বাধ্য হতো। তাদের কারও হাতে এক টুকরো রুটি এলে সোজা আমার কাছে এনে দিত। আমি লজ্জায় রুটিটি যে এনেছে, তাকেই ফিরিয়ে দিতাম। কিন্তু সে আবার রুটিটি আমাকেই ফিরিয়ে দিত।”
বন্দিদের মধ্যে ইয়াজিদ নামের এক কুরাইশিও বর্ণনা করেছে, “মুসলমানরা বদর থেকে মদিনায় ফেরার সময় আমাদের – বন্দিদের – পশুর পিঠে চড়িয়েছিল, আর নিজেরা হেঁটে গিয়েছিল।”
বন্দিদের মধ্যে খাদিজার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বোনের ছেলে, মহানবীর জামাতা আবুল আস ইবনে রাবিও ছিলেন। আবুল আস ছিলেন মক্কার ব্যবসায়ীদের একজন, তাঁর অনেক সম্পদ ছিল। বিশ্বস্ততা ও সততার জন্য তিনি খ্যাত ছিলেন। মক্কা থেকে বন্দিদের মুক্তিপণ পাঠানোর সময় হযরত জয়নব মুক্তিপণ পূর্ণ করার জন্য তাঁর মা বিয়ের সময় তাঁকে যে হার উপহার দিয়েছিলেন, সেটিও পাঠিয়েছিলেন। মুক্তিপণগুলো এসে পৌঁছালে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হারটি চিনতে পারলেন এবং বললেন, “হে আমার সাহাবীগণ! তোমরা যদি উচিত মনে করো, তবে আমার মেয়ে জয়নবের বন্দিকে তার মুক্তিপণসহ তার কাছে ফিরিয়ে দাও।” সাহাবীগণ রাজি হলেন। জয়নবকে মদিনায় পাঠিয়ে দেওয়ার শর্তে আবুল আসকে তাঁর সম্পদসহ মক্কায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। আবুল আস জয়নব ও তাঁর সঙ্গীদের নিজের ভাই কিনানার সঙ্গে পথে রওনা করিয়ে দিলেন। এ খবর পেয়ে মুশরিকরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের কয়েকজন লোককে তাঁদের পেছনে পাঠাল। তারা জি-তুওয়ায় গিয়ে তাঁদের ধরে ফেলল। হাব্বার ইবনে আসওয়াদ বর্শা ছুড়ে মারলে উট ভয় পেয়ে হযরত জয়নবকে পিঠ থেকে মাটিতে ফেলে দিল। কিনানা তার তিরগুলো সামনে ঢেলে বলল, যে জয়নবের দিকে হাত বাড়াবে, তাকে তির মেরে শেষ করে দেবে। সে জয়নবকে মক্কা থেকে বের করে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে দিল। হযরত জয়নব আঘাতের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন; মদিনায় পৌঁছে তাঁর গর্ভপাত হয়ে গেল। রাসূল আলাইহিস সালাম এ খবর শুনে অত্যন্ত ব্যথিত হলেন।
বদরে পরাজিত মুশরিকরা করুণ অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে এলে মক্কায় বিরাট হতভম্ব অবস্থার সৃষ্টি হলো। তারা যা একেবারেই আশা করেনি, এমনকি কল্পনাও করেনি, এমন এক পরিণতি দেখা দিল। প্রথম যে খবর নিয়ে এল, তার কথা আবু লাহাব ও অন্য মুশরিকরা বিশ্বাস করল না। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা আবু সুফিয়ান মক্কায় পৌঁছালে তারা সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিজেদের কাছে ডেকে আনল। আবু লাহাব তাকে জিজ্ঞেস করল, “ভাতিজা! বলো তো, কী ঘটেছে?” আবু সুফিয়ান সেখানে এক জায়গায় বসল। অনেক লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল। আবু সুফিয়ান এভাবে বর্ণনা করল:
“জিজ্ঞেস কোরো না; মুসলমানদের মুখোমুখি হতেই মনে হলো, আমাদের হাত-পা বাঁধা। তারা যেমন খুশি তেমন করল: আমাদের কাউকে হত্যা করল, কাউকে বন্দি করল। কসম খেয়ে বলছি, আমি আমাদের কাউকে তিরস্কার করছি না, দোষও দিচ্ছি না। কারণ সে সময় আমরা আসমান ও জমিনের মাঝখানে ধূসর ঘোড়ার পিঠে সাদা পোশাকে আবৃত কিছু লোকের মুখোমুখি হয়েছিলাম। তাদের সামনে কোনো কিছুই টিকতে পারছিল না, কেউই রুখে দাঁড়াতে পারছিল না!”
সেখানে ছিলেন আব্বাসের গোলাম হযরত আবু রাফি, যিনি ইসলামের প্রথম যুগেই মুসলমান হলেও মুশরিকদের অনিষ্টের ভয়ে মুসলমান হওয়ার কথা প্রকাশ করেননি। আবু রাফি চুপচাপ তাদের কথা শুনছিলেন; আনন্দে সব ভুলে গিয়ে তিনি হঠাৎ বলে ফেললেন, “আল্লাহর কসম, তাঁরা ফেরেশতা।”
আবু লাহাব তাঁকে জোরে এক চড় মারল এবং তুলে মাটিতে আছড়ে ফেলল। তারপর তাঁকে বেশ মারধর করল। তখন সেখানে উপস্থিত হযরত আব্বাসের স্ত্রী উম্মুল ফজল সহ্য করতে পারলেন না। কারণ তিনিও আগেই মুসলমান হয়েছিলেন। উম্মুল ফজল ঘরের খুঁটিগুলোর একটি তুলে নিয়ে “তার কেউ নেই বলে তাকে দুর্বল মনে করলে, তাই না?” বলে আবু লাহাবকে সজোরে আঘাত করলেন। আবু লাহাবের মাথা ফেটে গেল। রক্ত ঝরতে ঝরতে লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও অপমানিত অবস্থায় সে ফিরে গেল। সাত দিন পর আল্লাহ তাআলা তাকে “কালো বসন্ত” নামের এক রোগ দিলেন। এই রোগেই সে মারা গেল। তার ছেলেরা দুই বা তিন রাত তাকে দাফন না করে ফেলে রাখল। অবশেষে লাশ পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে লাগল। আবু লাহাবের রোগ থেকে সবাই প্লেগ (তাউন) থেকে পালানোর মতো পালাত এবং এ রোগকে ঘৃণা করত। তখন কুরাইশদের একজন আবু লাহাবের ছেলেদের বলল, “ধিক তোমাদের! লজ্জা করে না? বাবাকে ঘরে ফেলে রেখেছ, আর সে পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অন্তত তাকে কোথাও মাটিচাপা দিয়ে সরিয়ে ফেলো।” ছেলেরা লোকটিকে উত্তর দিল, “আমরা তার রোগকে ভয় পাচ্ছি!” এবার লোকটি তাদের বলল, “তোমরা যাও, আমিও আসছি, তোমাদের সাহায্য করব।” তারপর তিনজন একত্র হলো। লাশটি বয়ে নিয়ে দূরের এক নির্জন জায়গায় রেখে দিল। পাথরের নিচে ঢাকা পড়ে আর দেখা না যাওয়া পর্যন্ত তার ওপর পাথর ছুড়ল। এভাবে আবু লাহাব তার কবরে প্রবেশ করল – যে কবর অন্ধকার, জাহান্নামের এক গর্ত, চিরকাল শাস্তি ও আগুনের মধ্যে থাকার আবাস।
বদরে বন্দি হওয়া কুরাইশদের মধ্যে ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদও ছিলেন। তাঁকে বন্দি করেছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ। ওয়ালিদের ভাই হিশাম এবং তখনো মুসলমান না হওয়া খালিদ ইবনে ওয়ালিদ মদিনায় এল। আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ মুক্তিপণ (ফিদিয়া) ছাড়া তাঁকে ছাড়তে চাইলেন না। ভাইদের মধ্যে খালিদ রাজি হলেও বৈমাত্রেয় ভাই হিশাম তা মানল না। রাসূলুল্লাহ তাদের পিতার অস্ত্র ও সাজসরঞ্জাম দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। হিশাম এতে রাজি হলেও খালিদ মানল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের পিতার একশো দিনার মূল্যের তলোয়ার, বর্ম ও শিরস্ত্রাণের বিনিময়ে তারা সমঝোতায় পৌঁছাল। ওয়ালিদকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে তারা মক্কার পথে রওনা হলো। কিন্তু মক্কার পথে মদিনা থেকে চার মাইল দূরে জুলহুলাইফায় ওয়ালিদ তাদের ছেড়ে মহানবীর কাছে চলে এলেন, ঈমান আনলেন এবং সাহাবায়ে কেরামের অন্তর্ভুক্ত হলেন। মুসলমান হওয়ার কিছুকাল পর তিনি মক্কায় ভাইদের কাছে গেলেন। তখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ জিজ্ঞেস করল, “মুসলমান যখন হবেই, তখন মুক্তিপণ দেওয়ার আগেই হলে না কেন? বাবার রেখে যাওয়া স্মৃতিচিহ্নটা আমাদের হাতছাড়া করলে। কেন এমন করলে?” ওয়ালিদ উত্তর দিলেন, “আমি ভয় পেয়েছিলাম যে, কুরাইশরা বলবে, ‘বন্দিদশা সহ্য করতে না পেরে সে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের অনুসারী হয়েছে।’”
“হে আব্বাস! তোমার মুসলমান হওয়ার কথা আল্লাহ তাআলা জানেন। তুমি সত্য বলে থাকলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তোমাকে এর প্রতিদান দেবেন। কিন্তু বাহ্যিকভাবে তুমি আমাদের বিপক্ষে। তাই তোমাকে মুক্তিপণ পরিশোধ করতে হবে” হাদীস শরীফ
এই উত্তরে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে বনু মাখজুমের কয়েকজন মুসলমান – আইয়াশ ইবনে আবি রাবিআ ও সালামা ইবনে হিশামের (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) সঙ্গে বন্দিশালায় আটকে রাখল। ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ঈমান আনার কারণে বছরের পর বছর বন্দি ছিলেন। ইসলামের কট্টর শত্রুদের অন্যতম তাঁর চাচা হিশাম এবং মুশরিক আত্মীয়দের হাতে তিনি অনেক জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করলেন। রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুশরিকদের জুলুমের শিকার আইয়াশ ইবনে আবি রাবিআ, সালামা ইবনে হিশাম ও ওয়ালিদের জন্য এভাবে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সালামা ইবনে হিশাম, আইয়াশ ইবনে রাবিআ এবং (কাফিরদের হাতে কষ্টে জর্জরিত হয়ে) দুর্বল (ও অসহায়) বলে বিবেচিত অন্য মুমিনদের মুক্তি দাও। হে আল্লাহ, মুদারকে (কুরাইশদের) আরও কঠোরভাবে (অত্যন্ত কঠিনভাবে) পিষ্ট করো। এই বছরগুলোকে (তাদের জন্য) ইউসুফের বছরগুলোর মতো করে দাও।”
রাসূলুল্লাহর দোয়ার বরকতে হযরত ওয়ালিদ এক সুযোগে যেখানে বাঁধা ছিলেন, সেখান থেকে পালিয়ে গেলেন। তিনি মদিনা মুনাওয়ারায় এসে আমাদের প্রিয় নবীর সান্নিধ্যে পৌঁছালেন। হাবিবুল্লাহ মহানবী আইয়াশ ইবনে রাবিআ ও সালামা ইবনে হিশামের অবস্থা জানতে চাইলে ওয়ালিদ জানালেন যে, তাঁদের দুজনের পা একসঙ্গে বাঁধা, আর তাঁরা কঠিন শাস্তি ও নির্যাতনের মধ্যে ছটফট করছেন।
বিশ্বজগতের সুলতান তাঁদের অবস্থার কথা শুনে অত্যন্ত ব্যথিত হলেন এবং তাঁদের মুক্তির উপায় খুঁজতে লাগলেন। কে তাঁদের মুক্ত করতে পারবে, তিনি জিজ্ঞেস করলে বছরের পর বছর নির্যাতনের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও ওয়ালিদ বিরাট সাহস ও প্রেম নিয়ে উত্তর দিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তাঁদের মুক্ত করব, আপনার কাছে নিয়ে আসব।” তিনি আবার মক্কায় গেলেন এবং তাঁদের জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া এক নারীকে অনুসরণ করে নির্যাতিত মুসলমানদের অবস্থান জেনে নিলেন। দুজনই ছাদহীন একটি ঘরে বন্দি ছিলেন। ওয়ালিদ রাতের বেলা মৃত্যুর ভয় উপেক্ষা করে গভীর সাহসের সঙ্গে দেয়াল বেয়ে নেমে সঙ্গীদের কাছে পৌঁছে গেলেন। ঈমান আনা ছাড়া যাঁদের আর কোনো অপরাধ ছিল না, সেই দুই মজলুমকে মুশরিকরা একটি পাথরের সঙ্গে বেঁধে আরবের মরুভূমির ঝলসানো গরমে নানা রকম জুলুম-নির্যাতন করছিল। ওয়ালিদ তাঁর এই বরকতময় ভাইদের মুক্ত করে নিজের উটে চড়ালেন। আর নিজে পায়ে হেঁটে, খালি পায়ে মদিনা মুনাওয়ারায় – প্রাণপ্রিয় রাসূলুল্লাহর কাছে যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছানোর জন্য রওনা হলেন। মরুভূমির ঝলসানো গরম নয়, তাঁকে পোড়াচ্ছিল জগৎসমূহের সরদারের সান্নিধ্যে পৌঁছানোর প্রেম।
তিন দিনে তিনি ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও খালি পায়ে মদিনায় এসে পৌঁছালেন। পাথরের আঘাতে তাঁর আঙুলগুলো ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। রক্তাক্ত অবস্থায় ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ তাঁর প্রাণপ্রিয় হাবিবুল্লাহর কাছে পৌঁছালেন।
বদরের বিজয় মুসলমানদের গভীর আনন্দে ভাসিয়ে দিল। আর মুশরিকরা গভীর দুঃখ ও হতাশায় ডুবে গেল। হাবশার বাদশাহ নাজাশিও রাসূলুল্লাহর বিজয়ের কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দেশে থাকা সাহাবায়ে কেরামের কাছে গিয়ে সুসংবাদ দিয়ে বললেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি তাঁর রাসূলকে বদরে বিজয়ী করেছেন এবং তাঁকে বিজয় দান করেছেন।”
বদরের গাজওয়ার পরের ঘটনাবলি
আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদিনায় একদিকে ইহুদিদের সঙ্গে, অন্যদিকে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মতো মুসলমান সেজে থাকা মুনাফিকদের সঙ্গে, আবার মুশরিকদের সঙ্গেও সংগ্রাম করছিলেন। এ ছাড়া তিনি মদিনার বাইরের মুশরিক গোত্রগুলোকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন, তারা যেন মুসলমান হওয়ার মর্যাদা লাভ করে, সে জন্য চেষ্টা করছিলেন। কারকারা, বনু কাইনুকা, সাবিক, গাতাফান, বাহরান… প্রভৃতি গাজওয়া সবই বদরের গাজওয়ার পরে সংঘটিত হয়।
হিজরতের দ্বিতীয় বছরের কয়েকটি ঘটনা
এই বছর যাকাত ফরজ হলো এবং সদকাতুল ফিতর আদায় করা, ঈদের নামাজ পড়া ও কুরবানি করার আদেশ এল। রাসূলুল্লাহ তাঁর কন্যা উম্মে কুলসুমকে হযরত উসমানের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। মহানবী হযরত উমরের কন্যা হাফসা এবং জয়নব বিনতে খুজাইমাকে (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) নিজে বিয়ে করলেন। হযরত আলির পুত্র হযরত হাসান জন্মগ্রহণ করলেন।
হযরত আয়েশার সঙ্গে বিবাহ
মহানবী মক্কায় থাকতেই হযরত আয়েশার সঙ্গে তাঁর বিয়ের কথা পাকা হয়েছিল, কিন্তু তখনো তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়নি। একদিন হযরত আবু বকর সরওয়ারে আলম মহানবীকে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার স্ত্রীকে ঘরে তুলে নিতে আপনাকে কিসে বাধা দিচ্ছে?” রাসূলুল্লাহ বললেন, “মোহর।” এরপর হযরত আবু বকর রাসূলুল্লাহর কাছে মোহরের অর্থ পাঠিয়ে দিলেন।27
তারপর আমাদের মা হযরত আয়েশার বিয়ের অনুষ্ঠান হলো। তখন মহানবীর বয়স ছিল পঞ্চান্ন বছর।28 আমাদের মা হযরত আয়েশা অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিভাবান ছিলেন; ঘটনাবলি তাৎক্ষণিকভাবে কবিতার আকারে বলতে পারতেন। যা শিখতেন ও মুখস্থ করতেন, তা কখনো ভুলতেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, তীক্ষ্ণধী, আলেমা, সাহিত্যিকা, সতী ও নেককার। তাঁর স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল বলে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কাছ থেকে অনেক বিষয় জিজ্ঞেস করে জেনে নিতেন। পবিত্র আয়াতে তাঁর প্রশংসা করা হয়েছে।
কারকারাতুল কুদরের গাজওয়া
খবর এল যে, বনু সুলাইম ও গাতাফান গোত্রের একটি দল কারকারায় জড়ো হয়েছে। এরপর মহানবী মুহাজির ও আনসারদের মধ্য থেকে দুইশো লোক নিয়ে মদিনা থেকে রওনা হলেন। মদিনায় প্রতিনিধি হিসেবে রেখে যাওয়া হলো হযরত ইবনে উম্মে মাকতুমকে। সাদা পতাকা বহন করছিলেন হযরত আলি। তাঁরা সেই জায়গায় পৌঁছালেন, কিন্তু কাউকে পেলেন না: ইসলামি বাহিনীর আগমনের খবর পেয়ে মুশরিকরা জায়গাটি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। উপত্যকা ধরে এগোনোর সময় তাঁরা এক উটচালকের দেখা পেলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বনু সুলাইম ও গাতাফানের লোকেরা কোথায়। উটচালক বলল, “তারা তাদের পশুগুলো দেখাশোনার জন্য আমাকে পাঁচ দিনের জন্য ভাড়া করেছিল। এখন তারা কোথায় আছে, জানি না।” গনিমত হিসেবে পাঁচশো উট হস্তগত করা হলো। রাখাল ইয়াসারও বন্দি হলো। কারকারাতুল কুদর উপত্যকায় তিন রাত কাটানোর পর উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে তাঁরা মদিনার দিকে রওনা হলেন। মহানবী দিরার নামক স্থানে উটগুলোর এক-পঞ্চমাংশ আলাদা করে বাকিগুলো বণ্টন করে দিলেন। প্রত্যেকের ভাগে দুটি করে উট পড়ল। পরদিন ফজরের নামাজ আদায়ের সময় তাঁরা দেখলেন, ইয়াসার নামের সেই উটচালক তাঁদের সঙ্গে নামাজ পড়ছে। তখন মহানবী এই গোলামকে আজাদ করে দিলেন। তারপর তাঁরা নিরাপদে মদিনায় ফিরে এলেন।
“আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল ও পবিত্র কুরআনকে অস্বীকারকারী, তাঁর নবীকে একের পর এক নির্যাতন করা (উকবা ইবনে আবি মুআইত) তোমার মতো এত মন্দ লোক আমি আর কাউকে জানি না” হাদীস শরীফ
সীমাহীন আকুলতার আগুনে যে প্রাণ পোড়ে, সে নূর হয়ে যায়,
প্রেমের ব্যথায় যে হৃদয় ভাঙে, তা আবার আবাদ হয়ে যায়।
বনু কাইনুকার গাজওয়া
একদিন বনু কাইনুকার ইহুদিরা এক মুসলমান নারীকে নিয়ে উপহাস করতে চাইল। সাহাবীগণের একজন তা দেখে সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার বের করে উপহাসকারী সেই ইহুদিকে হত্যা করলেন। ইহুদিরা জোট বেঁধে সেই বরকতময় সাহাবীকে হত্যা করল, তিনি শহিদ হলেন। ঘটনাটি মহানবীকে জানানো হলো। রাসূলে আকরাম তাদের কাইনুকার বাজার চত্বরে জড়ো করে ইরশাদ করলেন, “হে ইহুদি সম্প্রদায়! আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের যে শাস্তি দিয়েছেন, তেমন শাস্তিতে পড়ার ভয় করো এবং মুসলমান হয়ে যাও। আমি যে আল্লাহ তাআলার পাঠানো নবী, তা তোমরা ভালো করেই জানো। এ কথা এবং তোমাদের সঙ্গে আল্লাহ তাআলার অঙ্গীকারের কথাও তোমরা তোমাদের কিতাবে পড়েছ…”
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি তাঁর রাসূলকে বদরে বিজয়ী করেছেন এবং তাঁকে বিজয় দান করেছেন” নাজাশি আসহামা (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)
বনু কাইনুকার গাজওয়া
এমন দয়া দেখানো সত্ত্বেও ইহুদিরা কৃত চুক্তি ভঙ্গ করল এবং জগৎসমূহের সুলতানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলল, “হে মুহাম্মদ! যুদ্ধ করতে জানে না এমন এক সম্প্রদায়কে পরাজিত করেছ বলে ধোঁকায় পোড়ো না! কসম খেয়ে বলছি, আমরা যোদ্ধা জাতি! আমাদের সঙ্গে লড়াই শুরু করলে তবেই বুঝবে, আমরা কেমন বীর!…” এভাবে তারা আগের চুক্তি ভঙ্গ করে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানানোর কথা ঘোষণা করল। তখন জিবরাইল আলাইহিস সালাম ওহী নিয়ে এলেন, যাতে মর্মার্থে ইরশাদ হচ্ছিল, “(হে আমার হাবিব!) যদি (তোমার সঙ্গে) চুক্তিবদ্ধ কোনো সম্প্রদায়ের বিশ্বাসঘাতকতার (চুক্তিবিরোধী আচরণের) আশঙ্কা করো, তবে (যুদ্ধ শুরুর আগে) হক ও ন্যায়ের ভিত্তিতে তাদের অঙ্গীকার যে তুমি প্রত্যাখ্যান করলে, তা সরাসরি তাদের জানিয়ে দাও। কেননা আল্লাহ তাআলা বিশ্বাসঘাতকদের ভালোবাসেন না।”29
আরেক পবিত্র আয়াতে মর্মার্থে ইরশাদ হলো, “হে আমার রাসূল! সেই কাফির ইহুদিদের বলে দাও: তোমরা অবশ্যই পরাজিত হবে এবং তোমাদের একত্র করে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নেওয়া হবে। কত নিকৃষ্ট সেই আবাস!”30
হাবিবে আকরাম মহানবী সঙ্গে সঙ্গে শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি এক শনিবার বাহিনী গঠন করে কাইনুকার ইহুদিরা যে দুর্গে থাকত, তার দিকে রওনা হলেন। সাদা পতাকা বহন করছিলেন হযরত হামজা, আর মদিনায় প্রতিনিধি হিসেবে রেখে যাওয়া হয়েছিল আবু লুবাবাকে।31
বরকতময় বাহিনী কাইনুকার দুর্গ অবরোধ করল। “আমরা কত বড় যোদ্ধা বীর!…” – এমন দম্ভকারী ইহুদিরা প্রতিরোধ তো দূরের কথা, দুর্গ থেকে একটি তির ছোড়ারও সাহস পেল না। রাসূলুল্লাহ প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলো নিয়ন্ত্রণে নিলেন। কেউ বাইরে বের হতে পারল না। এ অবস্থা পনেরো দিন চলল।32
ইহুদিরা ভয় পেয়ে আত্মসমর্পণ করল। তারা প্রত্যেকে হত্যার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও জগৎসমূহের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত আমাদের প্রিয় নবী দয়া করে কাইনুকার ইহুদিদের দামেস্কে চলে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। তাদের কাউকে সেই অঞ্চলে থাকার অনুমতি দেওয়া হলো না। এভাবে তাদের মদিনার ভূখণ্ড থেকে বহিষ্কার করা হলো।33 বনু কাইনুকা তাদের দেশ ছেড়ে চলে গেল। তাদের সম্পদ ও অস্ত্রশস্ত্র মুসলমানদের গনিমত হলো।
সাবিকের গাজওয়া
বদরের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে মক্কায় পৌঁছে আবু সুফিয়ান মানত করল, মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছ থেকে প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত সে “মাথায় তেল দেবে না এবং স্ত্রীদের কাছে যাবে না”। মানত পূরণ করার জন্য হিজরতের দ্বিতীয় বছর জিলহজ মাসের পাঁচ তারিখ রবিবার সে দুইশো অশ্বারোহী নিয়ে মদিনার দিকে রওনা হলো। এক রাতে মদিনায় এক লোকের বাড়িতে গিয়ে সে মহানবীর খোঁজখবর নিতে চাইল। লোকটি তাকে কোনো পাত্তা দিল না।
এমনকি দরজাও খুলল না। আবু সুফিয়ান সেখান থেকে চলে গিয়ে সাল্লাম ইবনে মিশকামের অতিথি হলো। পরদিন সেখান থেকে বেরিয়ে সে আরিজ নামক এলাকায় এল। সেখানে আনসারদের অন্যতম মাবাদ ইবনে আমরুশ ও তাঁর খাদেম কাজে ব্যস্ত ছিলেন; সে তাঁদের হত্যা করল, তাঁরা শহিদ হলেন। সে একটি খেজুরবাগানে আগুন ধরিয়ে দিল এবং “আমার কসম পূর্ণ হলো” বলে সেখান থেকে চলে গেল।
এ ঘটনা মহানবীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানানো হলে তিনি আবু লুবাবাকে মদিনায় প্রতিনিধি রেখে দুইশো লোক নিয়ে আবু সুফিয়ানের পিছু নিলেন।
“তোমরা অবশ্যই পরাজিত হবে এবং তোমাদের একত্র করে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নেওয়া হবে। কত নিকৃষ্ট সেই আবাস!” আলে ইমরান: ১২
মুশরিকরা এ খবর পেয়ে পালাতে শুরু করল। রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা তাদের মালপত্র এবং “সাবিক” নামের এক ধরনের শস্যজাত খাবার রান্নার জন্য আনা হাঁড়ি-পাতিলসহ সেখানে ফেলে রেখে পালিয়ে গেল। মুসলমানরা এগুলো পেয়ে গনিমত হিসেবে নিয়ে নিলেন। এ কারণে এই গাজওয়াকে সাবিকের গাজওয়া বলা হয়।
হযরত আলি ও হযরত ফাতিমার বিবাহ
তখন হিজরতের দ্বিতীয় বছর। ফখরে কায়েনাত মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কন্যা হযরত ফাতিমার বয়স পনেরো বছর পূর্ণ হয়েছিল।
একদিন হযরত ফাতিমা কোনো এক প্রয়োজনে রাসূলে আকরামের কাছে এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ লক্ষ করলেন, তাঁর কন্যা বিয়ের বয়সে পৌঁছেছেন। সেদিনের পর থেকে আমাদের মা ফাতিমাতুজ জাহরার জন্য অনেকেই বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। রাসূল আলাইহিস সালাম তাঁদের প্রস্তাবে সাড়া দিলেন না; তিনি বললেন, “তার বিষয়টি হক তাআলার আদেশের ওপর নির্ভর করে।”
একদিন আবু বকর, উমর ও সাদ ইবনে মুআজ মসজিদে বসে আলোচনা করছিলেন, “হযরত আলি ছাড়া সবাই হযরত ফাতিমার জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন। কারও প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া হয়নি।” হযরত সিদ্দিক বললেন, “আমার মনে হয়, তিনি আলির ভাগ্যেই আছেন। চলুন, তাঁর কাছে যাই এবং বিষয়টি খুলে বলি। যদি তিনি দারিদ্র্যের কথা তোলেন, তবে আমরা সাহায্য করব।” সাদ বললেন, “হে আবু বকর! আপনি সবসময় ভালো কাজ করেন। উঠুন, আমরাও আপনার সঙ্গে যাব।” তিনজন একসঙ্গে মসজিদ থেকে বেরিয়ে হযরত আলির সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। হযরত আলি তখন উট নিয়ে আনসারদের একজনের খেজুরবাগানে পানি দিতে গিয়েছিলেন। তাঁদের দেখে তিনি এগিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানালেন এবং কুশল জিজ্ঞেস করলেন। হযরত আবু বকর বললেন, “হে আলি! প্রতিটি কল্যাণকর কাজে তুমি অগ্রগামী, আর রাসূলে আকরামের কাছে তুমি এমন মর্যাদায় আছ, যা আর কারও ভাগ্যে জোটেনি। হযরত ফাতিমার জন্য সবাই প্রস্তাব দিয়েছে। কারও প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া হয়নি। আমাদের ধারণা, তিনি তোমার ভাগ্যেই আছেন। তুমি উদ্যোগ নিচ্ছ না কেন?”
এ কথা শুনে হযরত আলির মুবারক চোখ অশ্রুতে ভরে গেল। তিনি বললেন, “হে আবু বকর! আপনি আমার হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। তাঁর প্রতি আমার চেয়ে বেশি আগ্রহী আর কেউ নেই। কিন্তু আমার হাতের টানাটানি এতে বাধা।” হযরত আবু বকর বললেন, “এমন কথা বোলো না। আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের কাছে দুনিয়া কিছুই নয়। দারিদ্র্য এতে বাধা হতে পারে না। যাও, প্রস্তাব দাও।”
হযরত আলি বর্ণনা করেন, “আমি লজ্জা ও সংকোচ নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে গেলাম। রাসূলুল্লাহর সমস্ত প্রতাপ ও গাম্ভীর্য তখন তাঁর ওপর বিরাজমান ছিল। আমি তাঁর সামনে বসলাম, কিন্তু কথা বলতে পারলাম না। রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন এসেছ, কোনো প্রয়োজন আছে কি?’ আমি চুপ করে রইলাম। তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই ফাতিমার জন্য প্রস্তাব দিতে এসেছ।’ আমি শুধু বলতে পারলাম, ‘জি।’ (মহানবী হযরত ফাতিমাকে জানালেন যে, হযরত আলি তাঁর জন্য প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনিও চুপ করে রইলেন।) মহানবী জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফাতিমাকে মোহর হিসেবে দেওয়ার মতো তোমার কাছে কী আছে?’ আমি বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, তাঁকে দেওয়ার মতো আমার কাছে কিছুই নেই।’”
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আমি তোমাকে যে হুতামি বর্ম দিয়েছিলাম, সেটি কোথায়, তার কী হলো?” “সেটি আমার কাছে আছে” – এ কথা বলতেই তিনি বললেন, “সেটি বিক্রি করে টাকা আমার কাছে নিয়ে এসো। মোহর হিসেবে তা-ই যথেষ্ট।”34 আরেক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ হযরত আলিকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কাছে কী আছে?” তিনি উত্তর দিলেন, “আমার একটি ঘোড়া ও একটি বর্ম আছে।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “ঘোড়াটি তোমার কাজে লাগবে, বর্মটি বিক্রি করে দাও।” আরেক বর্ণনায় তিনি বলেছেন, “হে আলি, যাও, নিজের জন্য একটি ঘর ভাড়া নাও।”
বিয়ের আগ পর্যন্ত হযরত আলি মহানবীর সঙ্গেই থাকতেন। মহানবীর আদেশে তিনি মসজিদে নববির কাছে, হযরত আয়েশার কক্ষের সামনে অবস্থিত হারিসা ইবনে নুমানের ঘরটি ভাড়া নিলেন। বর্মটি বাজারে পাঠালেন। হযরত উসমান (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) বাজারে ঘোরার সময় হযরত আলির বর্মটি চিনতে পারলেন। দালালকে ডেকে বললেন, “এই বর্মের জন্য মালিক কত দাম চায়?” দালাল বলল, “চারশো দিরহাম চায়।” উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “এসো, টাকা নিয়ে যাও।” তারপর তিনি তাঁর সৌভাগ্যময় ঘরে ফিরে গেলেন। দালালের কাছ থেকে বর্মটি নিয়ে দাম পরিশোধ করলেন। তিনি বললেন, “এই বর্ম তিনি ছাড়া আর কারও উপযুক্ত নয়। এই টাকাও তিনি বিয়েতে খরচ করুন। আর আমাদের অক্ষমতার ওজরও কবুল করুন।” চারশো দিরহামের সঙ্গে বর্মটিও উপহার হিসেবে হযরত আলির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। হযরত আলি বর্ম ও দিরহামগুলো নিয়ে মহানবীর কাছে এলে মহানবী হযরত উসমানের জন্য অনেক কল্যাণের দোয়া করলেন এবং ইরশাদ করলেন, “উসমান জান্নাতে আমার সঙ্গী।” তারপর বিলাল হাবশিকে ডেকে টাকার একটি অংশ দিয়ে আদেশ করলেন, “এই টাকা নিয়ে বাজারে যাও! কিছু গোলাপজল আর বাকি টাকায় মধু কিনে আনো এবং মসজিদের এক কোণে পরিষ্কার পাত্রে পানির সঙ্গে গুলিয়ে নাও। মধুর শরবত বানাও, যাতে নিকাহ পড়ানোর পর আমরা পান করতে পারি। আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে যে সাহাবীগণ এখানে আছেন, তাঁদের মসজিদে ডাকো এবং লোকদের জানিয়ে দাও যে, ফাতিমা ও আলির নিকাহ পড়ানো হবে।”
বিলাল হাবশি বাইরে গিয়ে লোকদের জানিয়ে দিলেন যে, হযরত আলি ও হযরত ফাতিমার নিকাহ পড়ানো হবে। সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে নববিতে এসে এর ভেতর-বাহির ভরে ফেললেন। তখন মহানবী উঠে দাঁড়িয়ে এই খুতবা পাঠ করলেন: “সমস্ত হামদ ও শোকর জগৎসমূহের রবের জন্য নির্দিষ্ট। তিনিই সেই সত্তা, যাঁর দেওয়া নিয়ামতের জন্য তাঁর প্রশংসা করা হয়, যাঁর অসীম কুদরত ও শক্তির কারণে তাঁর ইবাদত করা হয়, যাঁর শাস্তি ও হিসাবকে ভয় করা হয়, যাঁর হুকুম ও ফরমান পৃথিবীতে ও আসমানসমূহে কার্যকর। যিনি তাঁর কুদরতে সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ন্যায়সংগত বিধান দিয়ে এগুলোকে একটি থেকে আরেকটি আলাদা করেছেন, মানুষকে (ইসলাম) দ্বীন ও নবী মুহাম্মদ (আলাইহিস সালাম) দিয়ে মর্যাদাবান করেছেন – তিনিই সেই সত্তা… আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করেছেন, আমি যেন আমার কন্যা ফাতিমাকে আলি ইবনে আবি তালিবের সঙ্গে বিয়ে দিই। এখন আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি যে, আমি (আল্লাহ তাআলার আদেশে) ৪০০ মিসকাল রুপার মোহরে ফাতিমাকে আলি ইবনে আবি তালিবের সঙ্গে বিয়ে দিলাম। আমার রব তাঁদের দুজনকে একত্র করুন এবং এটিকে তাঁদের জন্য বরকতময় করুন। তাঁদের বংশধরদের পবিত্র, রহমতের চাবি, হিকমতের খনি এবং মুহাম্মদের উম্মতের জন্য নিরাপত্তা বানিয়ে দিন।
আমার যা বলার ছিল, তা এই। আমি আমার রবের কাছে নিজের জন্য এবং তোমাদের জন্য মাগফিরাত প্রার্থনা করছি।”
এরপর হযরত আলি উঠে দাঁড়িয়ে এই সংক্ষিপ্ত খুতবা পাঠ করলেন: “…আমরা যাঁর সামনে উপস্থিত আছি, সেই মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করছি, যিনি তাঁর মুবারক কন্যা ফাতিমাকে ৪০০ মিসকাল রুপার মোহরে আমার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। হে আমার দ্বীনি ভাইয়েরা! নিঃসন্দেহে আপনারা মহানবীর কথা শুনেছেন এবং সাক্ষী হয়েছেন। আমিও এর সাক্ষী এবং এতে সন্তুষ্ট। আমি তা হুবহু কবুল করছি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার কথার সাক্ষী, আমাদের সবার অভিভাবক।”35
“উসমান জান্নাতে আমার সঙ্গী” হাদীস শরীফ
নিকাহ সম্পন্ন হওয়ার পর মহানবী তাজা খেজুর আনালেন এবং বললেন, “এসো, এই খেজুর নাও, খাও।” সবাই নিয়ে খেলেন। তারপর হযরত বিলাল মধুর শরবত পরিবেশন করলেন, তাও তাঁরা পান করলেন এবং সকল সাহাবী “বারাকাল্লাহু ফিকুমা ওয়া আলাইকুমা ওয়া জামাআ শামলাকুমা” বলে দোয়া করলেন। নিকাহ পড়ানোর সময় ফাতিমার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বয়স ছিল পনেরো, আর আলির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পঁচিশ বছর।
নিকাহের পর হযরত ফাতিমা কাঁদছিলেন। মহানবী তাঁর কাছে এসে বললেন, “হে ফাতিমা! তোমার কী হলো, কাঁদছ কেন? আল্লাহ তাআলার কসম, যারা তোমার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিল, তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় আলেম, সহনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তায় সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সবার আগে মুসলমান হয়েছে, আমি তোমাকে তার সঙ্গেই বিয়ে দিয়েছি।” হযরত ফাতিমা বললেন, “আব্বাজান! যে মেয়েরই বিয়ে হয়, তার মোহর সোনা-রুপা দিয়ে নির্ধারণ করা হয়। আমার মোহরও যদি এভাবে নির্ধারিত হয়, তবে আপনার আর অন্যদের মধ্যে কী পার্থক্য থাকল? কিয়ামতের দিন আপনি গুনাহগার মুমিনদের মধ্যে যত লোকের জন্য শাফায়াত করবেন, আমিও তাদের স্ত্রীদের জন্য শাফায়াত করতে চাই। এটাই আমার কামনা।”
আল্লাহ তাআলা যখন জানালেন যে, হযরত ফাতিমার এই কামনা কবুল করা হয়েছে, তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, “হে ফাতিমা, তুমি দেখিয়ে দিলে যে, তুমি নবীর সন্তান!”
হযরত আলি বলেছেন, “এসব ঘটনার পর কয়েক মাস কেটে গেল। এ বিষয়ে মজলিসে কোনো কথাই উঠল না। আমিও লজ্জায়, অর্থাৎ সংকোচে মুখ খুলতে পারলাম না। তবে রাসূলুল্লাহ কখনো কখনো আমাকে একা পেলে বলতেন, ‘তোমার স্ত্রী কত ভালো স্ত্রী! তোমার জন্য সুসংবাদ, সে জগতের নারীদের সরদার।’”
সে দিনগুলোতে হযরত আলির ভাই হযরত উকাইল বললেন, “হে আলি! এই বিয়েতে আমরা আনন্দিত হয়েছি। কিন্তু আমার ইচ্ছা, এই দুই সৌভাগ্যবান যেন একে অপরের কাছে আসেন।” হযরত আলি বললেন, “আমারও ইচ্ছা তা-ই, কিন্তু লজ্জা পাচ্ছি।” হযরত উকাইল হযরত আলির হাত ধরে মহানবীর ঘরের দিকে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহর দাসী উম্মে আইমানের দেখা পেলেন। তাঁকে অবস্থার কথা খুলে বললেন। উম্মে আইমান বললেন, “এ বিষয়ে আপনাদের আসার দরকার নেই। আমরা পবিত্র স্ত্রীগণের (আজওয়াজে তাহিরাতের) সঙ্গে একমত হয়ে আপনাদের জানাব। কেননা এ ব্যাপারে নারীদের কথাই শোনা হয়।”
উম্মে আইমান বিষয়টি রাসূলুল্লাহর স্ত্রীগণকে জানালেন। তখন অন্য পবিত্র স্ত্রীগণ হযরত আয়েশার ঘরে এলেন। তাঁরা হযরত খাদিজাকে স্মরণ করে বললেন, “তিনি জীবিত থাকলে আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা থাকত না।” রাসূলুল্লাহ কেঁদে ফেললেন এবং ইরশাদ করলেন, “খাদিজার মতো নারী কোথায়? লোকেরা যখন আমাকে মিথ্যাবাদী বলছিল, তখন সে আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছিল এবং তার সমস্ত সম্পদ আমার পথে খরচ করেছিল। ইসলাম ধর্মকে সে অনেক সাহায্য করেছিল। সে জীবিত থাকতেই হক তাআলা আমাকে আদেশ করেছিলেন, ‘খাদিজাকে সুসংবাদ দাও: জান্নাতে তার জন্য পান্না দিয়ে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছে।’” রাসূলুল্লাহর স্ত্রীগণ হযরত আলির ইচ্ছার কথা জানালেন। তখন রাসূলুল্লাহ উম্মে আইমানকে হযরত আলিকে ডেকে আনতে বললেন। আলি এলে মজলিসে উপস্থিত নারীরা উঠে চলে গেলেন। হযরত আলি মাথা নিচু করে বসে রইলেন। রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি তোমার স্ত্রীকে চাও, হে আলি?”
আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, “জি, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক।” রাসূলে আকরাম আসমা বিনতে উমাইসকে বললেন, “যাও, ফাতিমার ঘর প্রস্তুত করো।” আসমা হযরত ফাতিমা যে ঘরে নববধূ হয়ে যাবেন, সেখানে গেলেন। তিনি একটি গদি নতুন চামড়া দিয়ে, একটি গদি তালি দেওয়া চামড়া দিয়ে এবং একটি গদি চাটাই দিয়ে বানিয়ে সেগুলোর ভেতরে খেজুরগাছের আঁশ ভরে দিলেন। রাসূলুল্লাহ এশার নামাজের পর ফাতিমার ঘরে এসে প্রস্তুতকৃত জিনিসগুলো দেখে নিলেন।
মহানবী হযরত আলির আনা টাকার দুই-তৃতীয়াংশ দিয়ে খাবার, সাজসজ্জার জিনিস ও সুগন্ধির মতো জিনিসপত্র এবং এক-তৃতীয়াংশ দিয়ে পোশাক কেনার আদেশ দিলেন এবং ঘরের আসবাবপত্র পূর্ণ করালেন। হযরত ফাতিমার বিয়ের সামগ্রী ও ঘরের আসবাবে ছিল এসব: আসমা বিনতে উমাইসের বানানো তিনটি গদি, ঝালরওয়ালা একটি কার্পেট, খেজুরগাছের আঁশে ভরা একটি বালিশ, দুটি জাঁতা, একটি পানির মশক, মাটির তৈরি একটি পানির কলসি, চামড়ার তৈরি একটি পানপাত্র, একটি তোয়ালে, একটি পরিধেয় বস্ত্র, পাকা করা একটি দুম্বার চামড়া, পুরোনো হয়ে লোম ঝরে যাওয়া একটি নকশি ইয়েমেনি কার্পেট, খেজুরপাতায় বোনা একটি চৌকি, ইয়েমেনে তৈরি দুটি নকশি পোশাক এবং একটি মখমলের লেপ। এরপর রাসূলুল্লাহ হযরত আলিকে কিছু টাকা দিয়ে খেজুর ও ঘি কিনতে বললেন। হযরত আলি এর পরের ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেন:
“পাঁচ দিরহামে খেজুর আর চার দিরহামে ঘি কিনলাম। রাসূলুল্লাহর কাছে নিয়ে এলাম। তিনি চামড়ার একটি দস্তরখান চাইলেন। খেজুর, আটা, ঘি ও দই নিজের মুবারক হাতে মিশিয়ে এক ধরনের খাবার তৈরি করলেন এবং বললেন, ‘হে আলি! যাও, যাকে পাও, নিয়ে এসো।’ আমি বাইরে গিয়ে অনেক লোক দেখলাম, সবাইকে দাওয়াত দিলাম এবং ভেতরে এসে বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! লোক অনেক।’
জগৎসমূহের সরদার ফখরে কায়েনাত মহানবী বললেন, ‘তাদের দশজন দশজন করে ভেতরে আনো, তারা খাবার খাক।’ আমি তা-ই করলাম। হিসাব করে দেখা গেল, পুরুষ ও নারী মিলে সাতশো লোক খেয়েছে এবং পরিতৃপ্ত হয়েছে।”
হযরত আলি ও ফাতিমার ওয়ালিমা (বিয়ের ভোজ) খাওয়ার পর, উম্মে আইমানের বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী হযরত আলিকে বললেন, “হে আলি, আমার কন্যা ফাতিমা নববধূ হয়ে তোমাদের ঘরে গেছে। আমিও মাগরিবের নামাজের পর এসে দোয়া করব। আমার জন্য অপেক্ষা কোরো।”
হযরত আলি ঘরে এসে এক কোণে বসলেন। হযরত ফাতিমাও ঘরের আরেক কোণে বসলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ এসে দরজায় কড়া নাড়লেন। দরজা খুললেন উম্মে আইমান।
রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “আমার ভাই কি এখানে?” উম্মে আইমান বললেন, “আমার মা-বাবা আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার ভাই কে?” রাসূলুল্লাহ বললেন, “সে আলি ইবনে আবি তালিব।” উম্মে আইমান বললেন, “আপনি কি আপনার কন্যাকে আপনার ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন?” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ।” রাসূলুল্লাহর “আমার ভাই কি এখানে?” প্রশ্ন থেকে উম্মে আইমান ভেবেছিলেন, এই বিয়ে জায়েজ হবে না। আর রাসূলুল্লাহ “হ্যাঁ” বলে ইঙ্গিত করলেন যে, বিয়েতে বাধা হলো একই মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া।
এরপর রাসূলুল্লাহ উম্মে আইমানকে জিজ্ঞেস করলেন, “আসমা বিনতে উমাইসও কি এখানে আছে?” তিনি উত্তর দিলেন, “জি।” তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, “তাহলে সে রাসূলুল্লাহর কন্যার সেবা করতে এসেছে।” উম্মে আইমান “জি” বললে তিনি “সে কল্যাণ লাভ করুক” বলে তাঁর জন্য দোয়া করলেন।
“হে ফাতিমা! তোমার কী হলো, কাঁদছ কেন? আল্লাহ তাআলার কসম, যারা তোমার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিল, তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় আলেম, সহনশীলতা ও বুদ্ধিমত্তায় সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সবার আগে মুসলমান হয়েছে, আমি তোমাকে তার সঙ্গেই বিয়ে দিয়েছি” হাদীস শরীফ
তারপর তিনি একটি পাত্রে পানি আনালেন। নিজের মুবারক হাত ধুলেন। পানিতে কিছু মেশক মিশিয়ে দিলেন। তারপর হযরত ফাতিমাকে ডাকলেন। লজ্জায় হযরত ফাতিমা নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সেই পানি থেকে কিছু নিয়ে ফাতিমার বুকে, মাথায় ও পিঠে ছিটিয়ে দিয়ে এই দোয়া করলেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নি উয়িজুহা বিকা ওয়া জুররিয়্যাতাহা মিনাশ শাইতানির রাজিম” (হে আমার রব, তাকে ও তার বংশধরদের রাজিম, অর্থাৎ পাথর মেরে বিতাড়িত শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষার জন্য আমি তোমার আশ্রয় চাই)। তারপর হযরত আলির সঙ্গেও একই কাজ করে দোয়া করলেন, “আল্লাহুম্মা বারিক ফিহিমা ওয়া বারিক আলাইহিমা ওয়া বারিক লাহুমা ফি নাসলিহিমা।” সূরা ইখলাস ও মুআওয়িজাতাইন পড়ে বললেন, “আল্লাহ তাআলার নাম ও বরকত নিয়ে তোমার স্ত্রীর কাছে যাও।” তারপর নিজের মুবারক হাতে দরজার দুটি পাল্লা ধরে বরকতের দোয়া করলেন এবং সেখান থেকে চলে গেলেন।36
হযরত আলি বলেছেন, “আমাদের বিয়ের চার দিন পর রাসূলুল্লাহ আমাদের ঘরে তাশরিফ এনে আমাদের সম্মানিত করলেন। হৃদয় জয় করা, হিকমতে ভরা কথা দিয়ে আমাদের উপদেশ দিলেন এবং বললেন, ‘হে আলি! পানি আনো!’ আমি উঠে পানি আনলাম। তিনি একটি পবিত্র আয়াত তিলাওয়াত করে বললেন, ‘এই পানি থেকে একটু পান করো। কিছুটা রেখে দাও।’ আমি তা-ই করলাম। বাকি পানি তিনি আমার মাথায় ও বুকে ছিটিয়ে দিলেন। আবার বললেন, ‘পানি আনো।’ আমি আবার পানি আনলাম। আমার সঙ্গে যেমন করলেন, ফাতিমার সঙ্গেও তেমনই করলেন। তারপর আমাকে বাইরে পাঠিয়ে দিলেন।”
আলি বেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি কন্যার কাছে হযরত আলি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ফাতিমা বললেন, “আব্বাজান, তাঁর মধ্যে পূর্ণতার সব গুণই আছে। কিন্তু কুরাইশের কিছু নারী আমাকে বলে, ‘তোমার স্বামী গরিব।’” তখন রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “হে আমার কন্যা! তোমার বাবাও গরিব নয়, তোমার স্বামীও গরিব নয়। আমার সামনে জমিন ও আসমানের সমস্ত ভান্ডার ও গুপ্তধন পেশ করা হয়েছিল। আমি তা গ্রহণ করিনি। আল্লাহ তাআলার কাছে যা মকবুল, আমি তা-ই গ্রহণ করেছি। হে আমার আদরের মেয়ে! আমি যা জানি, তুমি যদি তা জানতে, তবে দুনিয়া তোমার চোখে তুচ্ছ ও হীন হয়ে যেত। আল্লাহ তাআলার কসম, তোমার স্বামী সাহাবীগণের মধ্যে প্রথম। ইসলামেও সে মহান, ইলমের দিক থেকেও সবচেয়ে গভীর। হে আমার কন্যা! আল্লাহ তাআলা আহলে বাইত (নবী-পরিবার) থেকে দুজনকে বেছে নিয়েছেন। একজন তোমার বাবা, আরেকজন তোমার স্বামী। খবরদার, কখনো তার অবাধ্য হয়ো না এবং তার আদেশের বিরোধিতা কোরো না।”
ফখরে কায়েনাত মহানবী (আলাইহি আফজালুস সালাওয়াত) কন্যাকে উপদেশ দেওয়ার পর হযরত আলিকে ডাকলেন। তাঁর হাতে ফাতিমাকে সোপর্দ করে বললেন, “হে আলি! ফাতিমার মনের প্রতি খেয়াল রেখো। সে আমার দেহের একটি অংশ। তাকে খুশি রেখো। যদি তুমি তাকে কষ্ট দাও, তবে আমাকেই কষ্ট দিলে।” দুজনকেই তিনি আল্লাহ তাআলার হাতে সোপর্দ করলেন। তারপর তিনি উঠে চলে যেতে উদ্যত হলে হযরত ফাতিমা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঘরের ভেতরের কাজ আমি করব, বাইরের কাজ করবেন আলি। আমাকে যদি একজন দাসী দান করেন, তবে সে আমার কিছু কাজে সাহায্য করবে। এতে আমি খুশি হব।” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হে ফাতিমা! আমি কি তোমাকে খাদেমের চেয়ে উত্তম কিছু দেব, নাকি খাদেম দেব?”
আমাদের মা ফাতিমা বললেন, “খাদেমের চেয়ে উত্তম যা, তা-ই দান করুন।” তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, “প্রতিদিন শোয়ার সময় তেত্রিশবার ‘সুবহানাল্লাহ’, তেত্রিশবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’, তেত্রিশবার ‘আল্লাহু আকবার’ এবং একবার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির’ বলবে। সব মিলিয়ে একশোটি বাক্য। কিয়ামতের দিন তুমি এক হাজার নেকি (পুণ্য) পাবে। মিজানে (দাঁড়িপাল্লায়) তোমার নেকিগুলো ভারী হবে।” তারপর মহানবী কন্যার ঘর থেকে বেরিয়ে তাঁর সৌভাগ্যময় ঘরে চলে গেলেন।
কাব ইবনে আশরাফের নিহত হওয়া
বদরের বিজয়ে মদিনার ইহুদি ও মূর্তিপূজারি মুশরিকদের অন্তরে ভয় ঢুকে গেল। কিছু ইহুদি ন্যায়ের পথে এসে বলল, “যাঁর গুণাবলি আমরা আমাদের কিতাবে পড়েছি, তিনি নিশ্চয়ই ইনিই। এখন আর তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। কেননা তিনি সবসময় বিজয়ী হবেন।” এই বলে তারা মুসলমান হয়ে গেল। আর কেউ কেউ বলল, “মুহাম্মদ যুদ্ধ বোঝে না এমন কুরাইশদের সঙ্গে লড়েছে। তাই জিতেছে। যদি আমাদের সঙ্গে লড়ত, তবে আমরা তাকে দেখিয়ে দিতাম, যুদ্ধ কীভাবে করতে হয়, বিজয় কীভাবে অর্জন করতে হয়।”
কাব ইবনে আশরাফ নামের এক ইহুদি বদরে ইসলামি বাহিনীর বিজয়ের কথা শুনে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষের কারণে মক্কায় চলে গেল। সেখানকার মুশরিকদের জড়ো করে মদিনায় আক্রমণের জন্য সে কবিতা আবৃত্তি করল, তাদের উৎসাহিত ও উত্তেজিত করল। মহানবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সে তাদের সঙ্গে চুক্তি করল। এমনকি আমাদের প্রিয় নবীকে গোপনে হত্যার ষড়যন্ত্রও করল। আল্লাহ তাআলা এ অবস্থার কথা রাসূলুল্লাহকে জানিয়ে দিলেন এবং মর্মার্থে ইরশাদ করলেন, “এরাই তারা, যাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা লানত করেছেন (যাদের তাঁর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন)…”37
তখন রাসূলে আকরাম তাঁর সম্মানিত সাহাবীগণকে বললেন, “কে কাব ইবনে আশরাফকে হত্যা করবে? কেননা সে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে।”
মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি চান যে, আমি তাকে হত্যা করি?” রাসূলুল্লাহ বললেন, “হ্যাঁ, চাই।” মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা কয়েক দিন এ কাজ নিয়ে ভাবলেন এবং পরিকল্পনা করলেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে আবু নায়িলা, আব্বাদ ইবনে বিশর, হারিস ইবনে আওস ও আবু আবস ইবনে জাবরের কাছে গিয়ে বিষয়টি খুলে বললেন। সবাই একমত হয়ে বললেন, “আমরা একসঙ্গে তাকে হত্যা করব।” সবাই মিলে মহানবীর কাছে এসে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! অনুমতি দিলে তার সঙ্গে কথা বলার সময় আমরা কি আপনার সম্পর্কে কাবের মনঃপূত কিছু কথা বলতে পারি?” মহানবী তাঁদের যা খুশি বলার অনুমতি দিলেন।
এরপর মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা সঙ্গীদের নিয়ে কাব ইবনে আশরাফের কাছে গেলেন। তিনি বললেন, “এই মুহাম্মদ আমাদের কাছে সদকা চেয়েছেন। আমাদের ওপর অনেক কর চাপিয়েছেন। তাই তোমার কাছ থেকে কিছু ধার নিতে এসেছি।” কাব খুশি হয়ে ভাবল, মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা তার মতোই চিন্তা করছেন। সে বলল, “সে তোমাদের আরও বিরক্ত করে তুলবে।” মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা বললেন, “আমরা তো একবার তাঁর অনুসরণ করেছি। তাঁর অনুসরণ চালিয়ে যাব। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয়। এখন তুমি আমাদের কিছু খেজুর ধার দাও।” কাব বলল, “ঠিক আছে, দিচ্ছি, কিন্তু আমার কাছে তোমাদের কিছু একটা বন্ধক রাখতে হবে!” মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা ও তাঁর সঙ্গীরা বললেন, “কী চাও?” কাব বলল, “তোমাদের স্ত্রীদের বন্ধক চাই।” তাঁরা এতে রাজি হলেন না। কাব বলল, “তাহলে তোমাদের ছেলেদের বন্ধক দাও।” তাঁরা বললেন, “তাদেরও বন্ধক দিতে পারব না। তাদের কারও সম্পর্কে বলা হবে যে, এক-দুই উট-বোঝাই খেজুরের বিনিময়ে তাকে বন্ধক রাখা হয়েছিল – এটা আমাদের জন্য এমন এক কলঙ্ক হবে, যা কখনো মোছার নয়। তবে তোমার কাছে আমাদের অস্ত্র ও বর্ম বন্ধক রাখতে পারি।” কাব এই প্রস্তাব মেনে নিল। কখন আসতে হবে, তাও তাঁদের জানিয়ে দিল।38
“হে আলি! ফাতিমার মনের প্রতি খেয়াল রেখো। সে আমার দেহের একটি অংশ। তাকে খুশি রেখো। যদি তুমি তাকে কষ্ট দাও, তবে আমাকেই কষ্ট দিলে” হাদীস শরীফ
এক রাতে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা কাবের কাছে এলেন। তাঁর সঙ্গে আবু নায়িলাও ছিলেন। কাব তাঁদের দুর্গে ডাকল, আর নিজে তাঁদের অভ্যর্থনা জানাতে নিচে নেমে এল। কাবের স্ত্রী বলল, “এই সময়ে কোথায় যাচ্ছ?” কাব বলল, “যারা এসেছে, তারা মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা আর আমার ভাই আবু নায়িলা।” স্ত্রী বলল, “যে আওয়াজ শুনছি, তা আমার একটুও ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে, তা থেকে রক্ত ঝরছে।” কাব বলল, “না, ওরা মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা আর আমার দুধভাই আবু নায়িলা। সে ভালো ছেলে। রাতের বেলা তলোয়ারের লড়াইয়ে ডাকলেও একটুও দ্বিধা না করে চলে আসে। সে এমনই মানুষ।” মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা নিজের সঙ্গে আরও দুজন, এক বর্ণনা অনুযায়ী তিনজনকে দুর্গে ঢোকালেন। তাঁরা ছিলেন আবু আবস ইবনে জাবর, হারিস ইবনে আওস ও আব্বাদ ইবনে বিশর।39 হযরত মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা সঙ্গীদের বললেন, “কাব এলে আমি তাকে বলব, তার চুলের ঘ্রাণ নিতে চাই; তারপর তার মাথা ধরে ঘ্রাণ নেব। যখন দেখবে, আমি কাবের মাথা শক্ত করে ধরেছি, তখন তোমরা তলোয়ার দিয়ে আঘাত করবে।” কাব ইবনে আশরাফ সুন্দর পোশাক পরে, সুগন্ধি ছড়িয়ে তাঁদের কাছে এল। ইবনে মাসলামা “এর আগে এমন সুন্দর ঘ্রাণ আর কখনো পাইনি” বলে কাবের কাছে গেলেন। কাব দম্ভ করে বলল, “আরবের সবচেয়ে সুগন্ধি নারীরা আমার কাছে।” মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা বললেন, “তোমার মাথার ঘ্রাণ নিতে অনুমতি দেবে কি?” কাব জানাল, সে অনুমতি দিচ্ছে। ইবনে মাসলামা তার ঘ্রাণ নিলেন, সঙ্গীদেরও ঘ্রাণ নিতে দিলেন। তারপর আবার ঘ্রাণ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। এবার মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা কাবের মাথা চেপে ধরলেন এবং সঙ্গীদের তলোয়ার দিয়ে আঘাত করার ইশারা দিলেন।
প্রথম তলোয়ারের আঘাতে কাব জোরে চিৎকার করে উঠল, কিন্তু মরল না। তখন মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা তাকে খঞ্জর দিয়ে হত্যা করলেন। কাবকে হত্যা করে মুজাহিদরা সঙ্গে সঙ্গে সে জায়গা ছেড়ে মদিনায় ফিরে এলেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহকে সুসংবাদ দিলে মহানবী আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন এবং মুজাহিদদের জন্য দোয়া করলেন। কাফির কাব ইবনে আশরাফের নিহত হওয়া ইহুদিদের ভীষণ আতঙ্কে ফেলে দিল। কেননা কাবের মতো একজন নেতা নিহত হওয়ার পর তাদের নিহত হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার ছিল। সকালে তারা জড়ো হয়ে মহানবীর কাছে এল। রাতের ঘটনা নিয়ে অভিযোগ করল। রাসূলে আকরাম ইরশাদ করলেন, “সে সবসময় আমাদের উত্ত্যক্ত করত, আমাদের বিরুদ্ধে কবিতা আবৃত্তি করত। তোমাদের মধ্যে যে-ই এমন করবে, সে জেনে রাখুক, তার শাস্তি তলোয়ার।” এই সতর্কবাণীর পর ইহুদিরা ভয়ে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করল…40
গাতাফানের গাজওয়া
এই গাজওয়াকে “আনমারের গাজওয়া”ও বলা হয়, “জি আমরের গাজওয়া”ও বলা হয়। বনু সালাবা ও বনু মুহারিবের একটি দল জি আমর নামক স্থানে জড়ো হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, মদিনার আশপাশে যা পাবে, তা-ই লুট করবে। তাদের নেতা ছিল আওরাস উপাধিধারী দাসুর ইবনে হারিস ইবনে মুহারিব নামে এক লোক। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উসমান ইবনে আফফানকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মদিনায় প্রতিনিধি রেখে চারশো পঞ্চাশজনের একটি বাহিনী নিয়ে মদিনা থেকে রওনা হলেন। পথে জাব্বার নামের এক ব্যক্তির দেখা পেলেন। তাঁর কাছে শত্রু সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, “তারা আপনাদের সঙ্গে লড়তে চায় না। আপনাদের দেখে পাহাড়ে পালিয়ে গেছে।” রাসূলুল্লাহ তাঁর কাছে ইসলাম পেশ করলেন। তিনি তা গ্রহণ করে মুসলমান হলেন।
ইসলামি বাহিনী উপত্যকার দিকে এগিয়ে চলার সময় বৃষ্টি শুরু হলো। কিছুক্ষণ প্রবল বেগে বৃষ্টি হলো, তারপর ধীরে ধীরে কমে থেমে গেল। মহানবী থেকে শুরু করে সকল মুজাহিদ আপাদমস্তক ভিজে গিয়েছিলেন। প্রত্যেকে এক পাশে গিয়ে নিজের কাপড়চোপড় শুকাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহও একটি নির্জন স্থানে কাপড় শুকানোর জন্য তা খুলে একটি গাছের ওপর বিছিয়ে দিলেন। তিনি গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, এমন সময় ইসলামি বাহিনীর ওপর নজর রাখা কাফিররা রাসূলুল্লাহকে একা দেখতে পেয়ে দাসুর ইবনে হারিসকে খবর দিল। সে রাসূলুল্লাহকে হত্যা করার জন্য তাঁর বিশ্রামের জায়গার দিকে নিঃশব্দে এগিয়ে এল। তলোয়ার খুলে সে বলল, “আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করতে পারে?” রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “আল্লাহ তাআলা রক্ষা করবেন।” ঠিক সেই মুহূর্তে জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে দাসুরের বুকে আঘাত করে তাকে মাটিতে ফেলে দিলেন। তার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাসুরের তলোয়ারটি তুলে নিয়ে বললেন, “আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে?” দাসুর বলল, “কেউই রক্ষা করতে পারবে না।” এ কথা বলে তিনি কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে মুসলমান হলেন। তিনি বহু মানুষের ঈমান আনার উসিলা হলেন।41 তিনি কথা দিলেন যে, আর কখনো যুদ্ধের জন্য সৈন্য জড়ো করবেন না। মুসলমানরা কোনো সশস্ত্র সংঘর্ষ ছাড়াই মদিনায় ফিরে এলেন। এই অভিযানে এগারো দিন কাটল।
বাহরান অভিযান
এই অভিযানকে “বনু সুলাইম” অথবা “নাজরান গাজওয়া”ও বলা হয়। খবর এল যে, বনু সুলাইমে জড়ো হওয়া বিপুলসংখ্যক মুশরিক মদিনায় আক্রমণ করবে। মদিনায় হযরত ইবনে উম্মে মাকতুমকে স্থলাভিষিক্ত রেখে যাওয়া হলো। রাসূলুল্লাহ তিনশোজনের একটি বাহিনী নিয়ে শত্রুর দিকে অগ্রসর হলেন। ইসলামি বাহিনী আসছে শুনে শত্রুরা পাহাড়ে পালিয়ে গেল। ফলে মুখোমুখি হওয়া সম্ভব হলো না। এই অভিযান বারো দিন স্থায়ী হলো।
“সে (কাব ইবনে আশরাফ) সবসময় আমাদের উত্ত্যক্ত করত, আমাদের বিরুদ্ধে কবিতা আবৃত্তি করত। তোমাদের মধ্যে যে-ই এমন করবে, সে জেনে রাখুক, তার শাস্তি তলোয়ার” হাদীস শরীফ
তোমার প্রেম কেড়ে নিল আমার থেকে আমাকে;
ভালোবাসি তোমায়, হে আমার রব!
তোমার ভালোবাসা কী যে মধুর;
ভালোবাসি তোমায়, হে আমার রব!
সম্পদ পেয়ে খুশিতে মাতি না,
অভাবেও আমি আফসোস করি না।
তোমার প্রেমেই খুঁজে পাই স্বাদ;
ভালোবাসি তোমায়, হে আমার রব!
ইবাদতের আদেশ দিলে তুমি,
উত্তম অবস্থার প্রশংসা করলে,
অফুরন্ত নিয়ামত দান করলে;
ভালোবাসি তোমায়, হে আমার রব!
কী যে অকৃতজ্ঞ আমার নফস, হায়,
নিজের মজার জন্য আমায় শুধু ধ্বংসে টেনে যায়!
আমি তো পেয়েছি প্রকৃত স্বাদ;
ভালোবাসি তোমায়, হে আমার রব!
সুন্দর করে ইবাদত করা,
দুনিয়ার জন্যও খেটে চলা –
দিনরাত এই আমার কাজ, কেননা
ভালোবাসি তোমায়, হে আমার রব!
মুখের কথায় হয় না ভালোবাসা, হে হিলমি!
তোমার রব বলেছেন, “চেষ্টা করো!”
তোমার অবস্থাতেও তা ফুটে উঠুক:
ভালোবাসি তোমায়, হে আমার রব!
ইসলামের শত্রু কত যে অগণন,
গোপন চক্রান্তে দ্বীনের ওপর হানে আক্রমণ;
বসে থাকলে কি তা ঠিক হবে?
ভালোবাসি তোমায়, হে আমার রব!
প্রেমিক কি অলস হয়ে বসে থাকে?
প্রিয়তমের গায়ে ধুলো লাগতে দেয় কি সে?
শত্রুকে চুপ করিয়ে দাও, তারপর বলো:
“ভালোবাসি তোমায়, হে আমার রব!”
