উহুদের যুদ্ধ
হিজরতের তৃতীয় বছর, শাওয়াল মাস… মক্কার মুশরিকরা বদরের যুদ্ধে যে পরাজয়ের শিকার হয়েছিল, তা থেকে তারা শিক্ষা তো নেয়ইনি, বরং তার যন্ত্রণাও কিছুতেই ভুলতে পারছিল না। কুরাইশরা এই যুদ্ধে তাদের নেতৃস্থানীয় বহু ব্যক্তিকে হারিয়েছিল। তার ওপর শামের বাণিজ্যপথ মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় তারা ক্রোধে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল।
আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে বাণিজ্য-কাফেলাটি শতভাগ মুনাফা নিয়ে মক্কায় ফিরেছিল। মূলধনে যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের বেশির ভাগ বদরের যুদ্ধে নিহত হওয়ায় কাফেলার মুনাফা দারুন নাদওয়া নামের ভবনে সংরক্ষিত ছিল; মুশরিকরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এই ভবনেই সমবেত হতো।
সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, ইকরিমা ইবনে আবি জাহল, আবদুল্লাহ ইবনে রাবিআর মতো যারা বদরে তাদের পিতা, ভাই, স্বামী ও পুত্রদের হারিয়েছিল, তারা আবু সুফিয়ানের কাছে গিয়ে বলল, “মুসলমানরা আমাদের নেতাদের হত্যা করেছে। আমাদের সর্বনাশ করেছে। এখন তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার সময় এসেছে। এসো, কাফেলার মুনাফা দিয়ে একটি বাহিনী প্রস্তুত করি। মদিনায় হামলা চালাই, প্রতিশোধ নিই!”
আবু জাহল, উতবা, শাইবার মতো দুর্ধর্ষ কাফিররা আগেই নিহত হওয়ায় মুশরিকদের নেতৃত্বে ছিল আবু সুফিয়ান, যে তখনো মুসলমান হয়নি। শামের বাণিজ্য থেকে এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা অর্জিত হয়েছিল। এর অর্ধেক ছিল মূলধন, অর্ধেক মুনাফা। মূলধন তখনই মালিকদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হলো, আর মুনাফা দুই ভাগ করে এক ভাগ দিয়ে অস্ত্র কেনা হলো, অন্য ভাগ দিয়ে সৈন্য সংগ্রহ করা হলো। কবি ও বক্তাদেরও অর্থ দেওয়া হলো। বক্তা ও কবিরা জনগণকে উত্তেজিত করে যুদ্ধে উৎসাহিত করার জন্য কবিতা ও শোকগাথা আবৃত্তি করত, আর নারীরা দফ ও ঢোল বাজিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিত। মুসলমানদের মদিনা থেকে বিতাড়িত করা, আমাদের প্রিয় নবীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা ছিল মুশরিকদের লক্ষ্য। এই লক্ষ্যে তারা আশপাশের গোত্রগুলোতে ঘুরে ঘুরেও সৈন্য সংগ্রহ করল।
অবশেষে মক্কায় ৩,০০০ জনের একটি বিশাল বাহিনী প্রস্তুত হলো। তাদের ৭০০ জন ছিল বর্মধারী, ২০০ জন অশ্বারোহী; এ ছাড়া তাদের ৩,০০০ উটও ছিল। বাদ্যকর ও নারীরাও যে বিশাল বাহিনীতে শামিল হয়েছিল, তার সেনাপতি ছিল আবু সুফিয়ান। তার স্ত্রী হিন্দ ছিল নারীদের নেতৃত্বে, আর মুশরিকদের যুদ্ধে উসকে দেওয়ার ব্যাপারে সে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কারণ বদরের যুদ্ধে সে তার পিতা ও দুই ভাইকে হারিয়েছিল। এই যন্ত্রণা সে ভুলতে পারছিল না। নারীরা যুদ্ধে না যাক – যারা এমনটি চাইত, তাদের সে এই বলে চুপ করিয়ে দিত, “বদরের যুদ্ধের কথা মনে করো! স্ত্রী-সন্তানদের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য তোমরা বদর থেকে পালিয়েছিলে!… এরপর যারা পালাতে চাইবে, তারা সামনে আমাদের দেখতে পাবে!…” এভাবে সে কুরাইশদের উত্তেজিত করে পূর্ণ শক্তিতে তাদের যুদ্ধে উৎসাহ দিচ্ছিল।1
মুশরিকদের মধ্যে জুবাইর ইবনে মুতইমের ওয়াহশি নামে এক গোলাম ছিল, বর্শা নিক্ষেপে সে ছিল অত্যন্ত দক্ষ। যা লক্ষ্য করে ছুড়ত, তাতেই আঘাত হানত – এমনই অব্যর্থ নিশানাবাজ ছিল সে। হযরত হামজা বদরে হিন্দের পিতা উতবাকে এবং জুবাইরের চাচা তুআইমাকে হত্যা করেছিলেন বলে হিন্দ ও জুবাইর তাঁর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিল। জুবাইর তার গোলাম ওয়াহশিকে বলল,
“যদি তুমি হামজাকে হত্যা করো, তবে তোমাকে আজাদ করে দেব, মুক্ত করে দেব!” হিন্দও প্রতিশ্রুতি দিল, “তাকে হত্যা করলে তোমাকে অনেক সোনা আর রত্ন দেব!”2
“উহুদ আমাদের ভালোবাসে, আমরাও তাকে ভালোবাসি” হাদীস শরীফ
সব প্রস্তুতি শেষ করে কুরাইশ বাহিনী তাদের পতাকাগুলো উত্তোলন করল: একটি দিল তালহা ইবনে আবি তালহাকে, একটি আহাবিশের এক ব্যক্তিকে, আর একটি উওয়াইফের পুত্র সুফিয়ানকে।
মক্কায় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। হযরত আব্বাস একজন বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ মদিনায় একটি চিঠি পাঠালেন। তাতে তিনি জানালেন যে, মুশরিকরা তিন হাজারজনের একটি বাহিনী গঠন করেছে, তাদের সাতশোজন বর্মধারী ও দুইশোজন অশ্বারোহী, তাদের তিন হাজার উট এবং অগণিত অস্ত্র রয়েছে। বাহিনীটি যে রওনা হওয়ার উপক্রম হয়েছে, তা-ও জানিয়ে তিনি সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করলেন।
এরপর মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরিস্থিতি যাচাই করার জন্য কয়েকজন সাহাবীকে দায়িত্ব দিলেন। এই সাহাবীগণ মক্কার দিকে রওনা হলেন। পথে মুশরিক বাহিনীর আগমনের খবর পেয়ে তাঁরা অনুসন্ধানে লেগে গেলেন। অল্প সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে দ্রুত মদিনায় ফিরে এলেন। তাঁরা যা দেখেছিলেন ও জেনেছিলেন, তা আগত চিঠির সঙ্গে হুবহু মিলে গেল।
জগৎসমূহের সরদার তৎক্ষণাৎ প্রস্তুতি শুরু করলেন। এ ছাড়া আকস্মিক হামলার শিকার না হওয়ার জন্য তিনি মদিনার চারপাশে পাহারাদার নিযুক্ত করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলেন। সাহাবায়ে কেরাম অল্প সময়ের মধ্যে একত্র হয়ে তাঁদের প্রস্তুতি শেষ করলেন। ঘরে যাঁরা থেকে যাচ্ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, পরস্পরের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে তাঁরা নবীদের সুলতানের চারপাশে সমবেত হলেন।
সেদিন ছিল জুমার দিন। মহানবী সাহাবীদের নিয়ে জুমার নামাজ আদায় করলেন। খুতবায় তিনি আল্লাহ তাআলার দ্বীন প্রচারের জন্য জিহাদ করার, আল্লাহর পথে লড়াই করার গুরুত্ব তুলে ধরলেন। এই পথে যাঁরা প্রাণ দেবেন, তাঁরা শহিদ হয়ে জান্নাতে যাবেন – এই সুসংবাদ দিলেন। শত্রুর মোকাবিলায় যাঁরা অবিচল থাকবেন, কষ্টের সামনে বুক পেতে দেবেন, আল্লাহ তাআলা তাঁদের সাহায্য করবেন – এ কথাও জানালেন।
রাসূলে আকরাম জানালেন যে, যুদ্ধ কোথায় হওয়া উচিত, সে বিষয়ে তিনি সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করতে চান। তিনি সেই রাতে দেখা একটি স্বপ্নের কথাও বর্ণনা করলেন। তিনি ইরশাদ করলেন, “স্বপ্নে দেখলাম, আমি একটি মজবুত বর্মের ভেতরে আছি। দেখলাম, আমার তলোয়ার জুলফিকারের ধারে একটি ফাটল দেখা দিয়েছে; আরও দেখলাম, একটি জবাই করা গরু, তারপর একটি দুম্বা আনা হচ্ছে।” সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এই স্বপ্নের কী ব্যাখ্যা করলেন?” তিনি ইরশাদ করলেন, “মজবুত বর্ম পরা মদিনার দিকে, মদিনায় থাকার দিকে ইঙ্গিত করে। তোমরা সেখানেই থাকো…
আমার তলোয়ারের ধারে ফাটল দেখা আমার কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার দিকে ইঙ্গিত। জবাই করা গরু আমার কিছু সাহাবীর শহিদ হওয়ার দিকে ইঙ্গিত। আর এর পরে একটি দুম্বা আনার বিষয়টি হলো, দুম্বা একটি সেনাদলের দিকে ইঙ্গিত করে, ইনশাআল্লাহ মহান আল্লাহ তাদের ধ্বংস করবেন।”
আরেক বর্ণনায় তিনি ইরশাদ করেন, “স্বপ্নে আমি আমার তলোয়ার মাটিতে আঘাত করলাম, তার ধার ভেঙে গেল। এটি উহুদের দিন আমার কিছু সাহাবীর শহিদ হওয়ার দিকে ইঙ্গিত। আবার তলোয়ারটি মাটিতে আঘাত করলাম, তা আগের মতো নিখুঁত অবস্থায় ফিরে এল। এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বিজয় আসার এবং মুমিনদের একত্র হওয়ার দিকে ইঙ্গিত।”
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেসব বিষয়ে তাঁকে ওহীর মাধ্যমে জানানো হয়নি, সেসব বিষয়ে সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতেন। শত্রুর মোকাবিলা কোথায় করা দরকার – এ বিষয়ে কোনো কোনো সাহাবী বললেন, “মদিনায় থেকে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ করি।” এই প্রস্তাব মহানবীর ইচ্ছার সঙ্গেও মিলে যাচ্ছিল। হযরত আবু বকর, উমর, সাদ ইবনে মুআজের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মতো প্রবীণ সাহাবীগণ মহানবীর মতোই চিন্তা করছিলেন। কিন্তু বদরের যুদ্ধে যাঁরা অংশ নিতে পারেননি, সেই বীর ও তরুণ সাহাবীগণ বদরে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের অর্জিত আজর ও সওয়াব3 এবং বদরের শহিদদের লাভ করা উচ্চ মর্যাদার কথা মহানবীর কাছ থেকে যতবার শুনতেন, ততবার সেই যুদ্ধে উপস্থিত থাকতে না পারার জন্য গভীর দুঃখে ভেঙে পড়তেন। তাই তাঁরা শত্রুর মোকাবিলা মদিনার বাইরে করতে এবং মুখোমুখি লড়াই করতে চাইছিলেন। হযরত হামজা, নুমান ইবনে মালিক, সাদ ইবনে উবাদা ছিলেন তাঁদেরই অন্তর্ভুক্ত। হযরত খাইসামা অনুমতি নিয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! কুরাইশ মুশরিকরা বিভিন্ন আরব গোত্র থেকে সৈন্য জড়ো করেছে। তারা উট ও ঘোড়ায় চড়ে আমাদের ভূমিতে ঢুকে পড়েছে। তারা আমাদেরকে আমাদেরই ঘরে ও দুর্গে অবরুদ্ধ করে রাখবে, তারপর ফিরে চলে যাবে। আমাদের পেছনে নানা কথা রটাবে। এতে তাদের সাহস বেড়ে যাবে, তারা নতুন নতুন হামলা চালাবে। এখন যদি আমরা তাদের মোকাবিলায় বের না হই, তবে অন্য আরব গোত্রগুলোও আমাদের দিকে লোলুপ দৃষ্টি দেবে। আমি আশা করি, আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের বিরুদ্ধে আমাদের বিজয় দান করবেন।
আর যদি দ্বিতীয়টি হয় – তা হলো শাহাদাত; বদর আমাকে তা থেকে বঞ্চিত করেছে। অথচ আমি তার জন্য কত না ব্যাকুল ছিলাম! আমি বদরের যুদ্ধে যেতে চাই শুনে আমার ছেলে আমার সঙ্গে লটারি করেছিল। সে আমার চেয়ে ভাগ্যবান ছিল, শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছে।
ইয়া রাসূলাল্লাহ! শাহাদাতের জন্য আমি খুবই ব্যাকুল। গত রাতে স্বপ্নে আমার ছেলেকে সুন্দর চেহারায় দেখলাম। সে জান্নাতের বাগান ও নদীগুলোর মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর আমাকে বলছিল, ‘জান্নাতবাসীদের সঙ্গে এসে মিলিত হোন! আল্লাহ তাআলা যে সত্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমি তা পেয়ে গেছি!’
ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কসম, সকাল থেকে জান্নাতে আমার ছেলের সঙ্গী হওয়ার জন্য আমার মনে প্রবল আকাঙ্ক্ষা জেগেছে। আমার বয়সও অনেক হয়েছে। আমার রবের সাক্ষাৎ লাভ ছাড়া আর কোনো চাওয়া আমার নেই।
আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! শহিদ হয়ে জান্নাতে আমার ছেলের সঙ্গী হওয়ার মর্যাদা যেন লাভ করতে পারি, সে জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করুন!…” – এভাবে তিনি কাকুতি-মিনতি করলেন। মহানবী তাঁর এই অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন না এবং তাঁর শহিদ হওয়ার জন্য দোয়া করলেন।
অধিকাংশ সাহাবী এই মত পোষণ করছেন দেখে আমাদের প্রিয় নবী মদিনার বাইরে শত্রুর মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তারপর ইরশাদ করলেন, “(হে আমার সাহাবীগণ!) তোমরা যদি ধৈর্য ধরো ও অবিচল থাকো, তাহলে এবারও মহান আল্লাহ তোমাদের তাঁর সাহায্য দান করবেন। আমাদের কর্তব্য হলো দৃঢ় সংকল্প ও প্রচেষ্টা দেখানো!”
আসরের নামাজ আদায় করার পর বিশ্বজগতের সুলতান তাঁর বরকতময় ও সৌভাগ্যময় ঘরে গেলেন। তাঁর পেছনে হযরত আবু বকর ও উমর অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলেন। তাঁরা রাসূলে আকরামকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাগড়ি বাঁধতে ও বর্ম পরতে সাহায্য করলেন। মহানবী কোমরে তলোয়ার বাঁধলেন, ঢাল পিঠে ঝুলিয়ে নিলেন।
এ সময় বাইরে সাহাবায়ে কেরাম সমবেত হয়ে মহানবীর অপেক্ষা করছিলেন। যাঁরা মদিনায় থেকে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, তাঁরা অন্যদের বললেন, “রাসূলুল্লাহ মদিনার বাইরে যাওয়ার মত পোষণ করছিলেন না। তোমাদের কথায় তিনি তা মেনে নিয়েছেন। অথচ রাসূলুল্লাহ আদেশ গ্রহণ করেন আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে। তোমরা এ বিষয়টি তাঁর ওপরই ছেড়ে দাও। তিনি যা আদেশ করেন, তা-ই করো।” অন্যরাও নিজেদের কাজের জন্য অনুতপ্ত হলেন এবং “আমরা যেন রাসূলে আকরামের বিরোধিতা না করি” বলে তাঁদের মত থেকে সরে এলেন। আমাদের প্রিয় নবী সৌভাগ্যময় ঘর থেকে বের হয়ে এলে তাঁরা তাঁর মহান দরবারে হাজির হয়ে এই বলে ক্ষমা চাইলেন, “আমাদের প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যেমন চান, তেমনই করুন। মদিনায় থাকতে চাইলে আমরা থেকে যাব। আপনার আদেশের বিরোধিতা করা থেকে আমরা মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।”
“আমার সাহাবীদের নিন্দা কোরো না! তোমরা উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনা সদকা করলেও তা তাঁদের এক মুঠো যবের সদকার সওয়াবের সমানও হবে না!” হাদীস শরীফ
হাবিবে আকরাম মহানবী ইরশাদ করলেন, “কোনো নবী বর্ম পরিধান করলে যুদ্ধ না করে তা খোলেন না – যতক্ষণ না মহান আল্লাহ তাঁর ও তাঁর শত্রুর মধ্যে ফয়সালা করে দেন। তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ হলো, তোমরা যদি আমার আদেশগুলো পালন করো, আল্লাহ তাআলার নাম স্মরণ করে ধৈর্য ধরো ও অবিচল থাকো, তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের সাহায্য করবেন…”
এ সময় হযরত আমর ইবনে জামুহ ঘরে তাঁর চার ছেলেকে বলছিলেন, “বাবারা! আমাকেও এই যুদ্ধে নিয়ে চলো!” আর ছেলেরা পিতাকে বোঝানোর চেষ্টা করে বলছিলেন, “আব্বাজান! আপনার পা অক্ষম হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা আপনাকে অপারগ গণ্য করেছেন। রাসূলুল্লাহও আপনাকে অপারগ গণ্য করেছেন। জিহাদে বের হওয়া আপনার ওপর আবশ্যক নয়। আপনার বদলে আমরা যাচ্ছি!” কিন্তু হযরত আমর বললেন, “তোমাদের মতো সন্তানদের জন্য আফসোস! বদরের যুদ্ধেও এমন কথা বলে তোমরা আমাকে জান্নাত অর্জন থেকে বিরত রেখেছিলে। এই অভিযান থেকেও কি বঞ্চিত করবে?…” তারপর তিনি আমাদের প্রিয় নবীর দরবারে হাজির হয়ে বললেন, “আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার ছেলেরা নানা অজুহাত দেখিয়ে আমাকে এই যুদ্ধ থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে। আল্লাহর কসম, আমি আপনার সঙ্গে অভিযানে বের হয়ে জান্নাতে প্রবেশের মর্যাদা লাভ করতে চাই। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আল্লাহর পথে লড়াই করব, শহিদ হয়ে আমার এই খোঁড়া পা নিয়ে জান্নাতে ঘুরে বেড়াব – আপনি কি এটিকে সংগত মনে করেন না?” বিশ্বজগতের গৌরব মহানবী ইরশাদ করলেন, “হ্যাঁ, সংগত মনে করি।” এতে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে হযরত আমর ইবনে জামুহ প্রস্তুত হয়ে বাহিনীতে যোগ দিলেন।4
মদিনায় নামাজ পড়ানোর জন্য আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে রেখে যাওয়া হলো।5
রাসূলদের সুলতান তিনটি পতাকা বাঁধলেন। একটি দিলেন হুবাব ইবনে মুনজিরকে, একটি উসাইদ ইবনে হুদাইরকে, আরেকটি মুসআব ইবনে উমাইরকে। প্রায় এক হাজারজনের এই বাহিনীতে দুজন অশ্বারোহী ও একশোজন বর্মধারী ছিলেন।6
জুমার দিন আসরের পর আমাদের প্রিয় নবী “আল্লাহু আকবার!” তাকবিরের ধ্বনির মধ্যে, যেন ঈদের নামাজে যাচ্ছেন এমনভাবে, উহুদের দিকে রওনা হলেন। সামনে ছিলেন বর্ম পরিহিত হযরত সাদ ইবনে উবাদা ও সাদ ইবনে মুআজ, ডানে মুহাজিরগণ, বামে আনসারগণ।
পথে তাঁরা ইহুদিদের নিয়ে গঠিত ছয়শোজনের একটি সেনাদলের দেখা পেলেন। এরা ছিল মুনাফিকদের সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুলের মিত্র এবং ইসলামি বাহিনীতে যোগ দিতে চাইছিল। মহানবী জিজ্ঞেস করলেন, “তারা কি মুসলমান হয়েছে?” সাহাবীগণ উত্তর দিলেন, “না, ইয়া রাসূলাল্লাহ।” তখন তিনি ইরশাদ করলেন, “তোমরা গিয়ে তাদের বলো, তারা যেন ফিরে যায়। কারণ আমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাহায্য চাই না।” সম্মানিত নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদিনা ও উহুদের মাঝে শাইখাইন নামক স্থানে পৌঁছালেন। এখানে রাত কাটানোর জন্য তাঁরা যাত্রাবিরতি করলেন। তখনো সূর্য অস্ত যায়নি। বাহিনীর মধ্যে শিশু বয়সী কয়েকজন সাহাবীও ছিলেন, যাঁরা শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করতে চাইছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী এখানে বাহিনী পরিদর্শন করে দেখলেন, তাতে প্রায় সতেরোজন শিশু রয়েছে।
তাদের মধ্যে রাফি ইবনে খাদিজ লম্বা দেখানোর জন্য পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হযরত জুহাইর বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাফি ভালো তির ছুড়তে পারে।” এ কথায় তাঁকে বাহিনীতে নেওয়া হলো। তা দেখে সামুরা ইবনে জুনদুব বললেন, “আমি কুস্তিতে রাফিকে হারাতে পারি। তাই আমিও যুদ্ধে অংশ নিতে চাই।” মহানবী মুচকি হেসে দুজনের মধ্যে কুস্তি লড়িয়ে দিলেন। হযরত সামুরা রাফিকে হারিয়ে দিলে তাঁকেও মুজাহিদদের মধ্যে নেওয়া হলো। অন্য শিশুদের মদিনায় যাঁরা ছিলেন, তাঁদের পাহারা দেওয়ার জন্য মদিনায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো।7
মাগরিব ও এশার আজান বিলাল হাবশি তাঁর হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠে দিলেন। নামাজ আদায় করানোর পর আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ইবনে মাসলামাকে পঞ্চাশজনের একটি দলের প্রধান নিযুক্ত করলেন এবং সকাল পর্যন্ত পাহারা দেওয়ার আদেশ দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম বিশ্রামে গেলেন। সেই রাতে মহানবীর শিয়রে পাহারা দেওয়ার সৌভাগ্য লাভ করলেন হযরত জাকওয়ান।
এদিকে শত্রুবাহিনী ইসলামি বাহিনীর শাইখাইনে বিশ্রামে যাওয়ার খবর পেয়ে ইকরিমার নেতৃত্বে একটি অশ্বারোহী দলকে টহলের দায়িত্ব দিল। তখনো মুসলমান না হওয়া ইকরিমা তার দল নিয়ে হাররা নামক স্থান পর্যন্ত ইসলামি বাহিনীর কাছাকাছি এলেও মুজাহিদদের টহলদলের ভয়ে পিছু হটে গেল। ফজরের পর জগৎসমূহের সরদার সাহাবীদের জাগালেন। তাঁরা উহুদ পাহাড়ের কাছে এলেন। এখানে দুই বাহিনী একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিল। বিলাল হাবশি তাঁর হৃদয় উদ্বেলিত করা, অন্তর গলানো করুণ কণ্ঠে ফজরের আজান দিলেন। মুজাহিদগণ অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় আমাদের প্রিয় নবীর পেছনে নামাজ আদায় করলেন, দোয়া করলেন। বিশ্বজগতের সুলতান গায়ে দ্বিতীয় একটি বর্ম এবং মাথা মুবারকে শিরস্ত্রাণ পরলেন।
এ সময় মুনাফিকদের সরদার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বলল, “আমরা কি এখানে মারা পড়তে এসেছি? শুরুতেই এ কথা কেন বুঝতে পারলাম না?” এরপর সে প্রায় ৩০০ মুনাফিকসহ ইসলামি বাহিনী ছেড়ে মদিনায় ফিরে গেল।
যাঁরা ঈমান এনেছিলেন, অন্তরে অন্তরে এক হয়েছিলেন, চোখের পলক না ফেলে এই পথে জান ও মাথা বাজি রেখেছিলেন এবং শাহাদাতের মর্যাদা লাভের জন্য ব্যাকুল ছিলেন, তাঁদের সংখ্যা ছিল প্রায় সাতশো। তাঁরা সবাই প্রতিজ্ঞা করলেন যে, রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে হলেও আমাদের প্রিয় নবীকে রক্ষা করবেন।
নবীদের সরদার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুজাহিদদের সারিবদ্ধ করলেন। বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যস্ত করলেন যে, তার পেছনে থাকল উহুদ পাহাড়, আর সামনে মদিনা।
“কোনো নবী বর্ম পরিধান করলে যুদ্ধ না করে তা খোলেন না – যতক্ষণ না মহান আল্লাহ তাঁর ও তাঁর শত্রুর মধ্যে ফয়সালা করে দেন” হাদীস শরীফ
উহুদের যুদ্ধ
ডান বাহুর সেনাপতি হিসেবে তিনি উক্কাশা ইবনে মিহসানকে এবং বাম বাহুর সেনাপতি হিসেবে আবু সালামা ইবনে আবদুল আসাদকে নিযুক্ত করলেন। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ সামনের দিকে তিরন্দাজ দলগুলোর নেতৃত্বে অবস্থান নিলেন। বর্মধারী বাহিনীর নেতৃত্বে গেলেন জুবাইর ইবনে আওয়াম, আর সামনের বর্মহীন বাহিনীর নেতৃত্বে হযরত হামজা। মিকদাদ ইবনে আমরকে পেছনের বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হলো।
শুধু আল্লাহর জন্যই মানুষকে ভালোবাসতেন, শুধু তাঁর জন্যই করতেন ঘৃণা,
নিজের জন্য কারও বন্ধু বা শত্রু হননি কভু সেই দানশীলতার খনি।
অট্টহাসি হাসেননি কখনো, কোনো কিছুকে গালি দেননি কোনো দিন,
মধুর ছিল তাঁর কথা, হাসিমুখ ছিলেন সর্বক্ষণ সেই দানশীলতার খনি।
লজ্জাশীলতা, সহনশীলতা, দয়া ও সম্মানে ভূষিত ছিলেন তিনি,
কাতর মিনতি নিয়ে যে আসত, তাকে কাঁদিয়ে ফেরাতেন না সেই দানশীলতার খনি।
ইসলামি বাহিনীর বাম দিকে ছিল আইনাইন টিলা। এই টিলায় একটি সরু গিরিপথ ছিল। রাসূলে আকরাম এই গিরিপথে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরের নেতৃত্বে পঞ্চাশজন তিরন্দাজ নিযুক্ত করলেন। তিরন্দাজগণ গিরিপথে নিজ নিজ স্থান গ্রহণ করলেন। আমাদের প্রিয় নবী তাঁদের কাছে এসে এই কঠোর আদেশ দিলেন:
“তোমরা পেছন দিক থেকে আমাদের রক্ষা করো। নিজেদের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকো এবং এখান থেকে কিছুতেই সরবে না। আমরা শত্রুকে পরাজিত করেছি দেখলেও, যতক্ষণ আমি তোমাদের খবর না দিই, লোক না পাঠাই, ততক্ষণ কোনোক্রমেই নিজেদের জায়গা ছাড়বে না। শত্রুরা আমাদের হত্যা করতে যাচ্ছে, হত্যা করছে দেখলেও এসে আমাদের সাহায্য করবে না।
তাদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করার চেষ্টা করবে না। শত্রুর অশ্বারোহীরা যতবার তোমাদের দিকে ধেয়ে আসবে, ততবার তাদের দিকে তির ছুড়বে। কারণ অশ্বারোহীরা ছুটে আসা তিরের সামনে এগোতে পারে না। হে আল্লাহ! আমি যে এগুলো তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি, এর ওপর তোমাকে সাক্ষী রাখছি!” এই আদেশগুলো কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করার পর আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “যদি দেখো পাখিরা আমাদের লাশ নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে, তবুও আমি লোক না পাঠানো পর্যন্ত কিছুতেই নিজেদের জায়গা থেকে সরবে না।8 যদি দেখো আমরা কাফিরদের ধরাশায়ী করে পায়ের নিচে মাড়িয়ে চলেছি, তবুও আমি খবর না পাঠানো পর্যন্ত কখনো নিজেদের জায়গা ছাড়বে না!…” তারপর তিনি সেখান থেকে চলে গিয়ে বাহিনীর সামনে অবস্থান নিলেন।
পতাকাটি তিনি মুসআব ইবনে উমাইরকে দিলেন। হযরত মুসআব হাতে পতাকা নিয়ে মহানবীর সামনে নিজের স্থান গ্রহণ করলেন।9 এ সময় সদ্য বিবাহিত হযরত হানজালা মদিনা থেকে দ্রুত উহুদে এসে মুজাহিদদের সারিতে যোগ দিলেন।
মুশরিক বাহিনী তিন দিন আগেই উহুদে এসে পৌঁছেছিল; তার সেনাপতি ছিল আবু সুফিয়ান। তারা মদিনাকে পেছনে রেখে অবস্থান নিল। ডান বাহুর অশ্বারোহীদের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল খালিদ ইবনে ওয়ালিদের, আর বাম বাহুর অশ্বারোহীদের নেতৃত্ব ইকরিমার। বর্ণিত আছে যে, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াও অশ্বারোহী দলগুলোর নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করেছিল। মুশরিকদের পতাকা বহন করছিল তালহা ইবনে আবি তালহা।
দুই বাহিনীর মধ্যে শক্তির ভারসাম্য ছিল একেবারেই অসম। সংখ্যা, অস্ত্র ও রসদের দিক থেকে কুরাইশ বাহিনী ছিল ইসলামি বাহিনীর চার গুণেরও বেশি।
কুরাইশ বাহিনীতে হইচই আর হট্টগোলের কোনো শেষ ছিল না; প্রতিশোধের লালসায় দিশেহারা নারীরা দফ ও ঢোল বাজাচ্ছিল, গান গেয়ে সৈন্যদের যুদ্ধে উসকে দিচ্ছিল এবং যেসব মূর্তির পূজা করত, সেগুলোর কাছে সাহায্য চাইছিল।
মুজাহিদদের দিকে অবশ্য দোয়া করা হচ্ছিল, “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!…” বলে তাকবির দেওয়া হচ্ছিল। দ্বীন ইসলামের সুরক্ষা ও প্রসারের জন্য তাঁরা আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিলেন।
আমাদের প্রিয় নবী তাঁর বীর সাহাবীদের জিহাদের প্রতি, মহান আল্লাহর পথে লড়াইয়ের প্রতি উৎসাহিত করছিলেন। এই পথে তাঁরা যে সওয়াব লাভ করবেন, তা বর্ণনা করে তিনি ইরশাদ করছিলেন, “হে আমার সাহাবীগণ! যাদের সংখ্যা কম, শত্রুর সঙ্গে লড়াই তাদের জন্য কঠিন হয়। যদি তারা অবিচল থাকে ও প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের স্বস্তি দান করেন। কারণ আল্লাহ তাআলা তাঁর আনুগত্যকারীদের সঙ্গে আছেন… আল্লাহ তাআলা তোমাদের যে প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা প্রার্থনা করো…” উহুদের যুদ্ধ সম্পর্কিত পবিত্র আয়াতগুলোতেও মর্মার্থে ইরশাদ হয়েছে, “(হে মুমিনগণ!) তোমরা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের (আদেশসমূহের) আনুগত্য করো, যাতে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়।
তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা লাভের দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে ছুটে যাও (এর জন্য যেন প্রতিযোগিতা করো), যার প্রশস্ততা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমান, যা তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যারা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে। (সেই মুত্তাকিরা) সচ্ছলতায় ও অসচ্ছলতায় আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে। তারা ক্রোধ সংবরণ করতে জানে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আল্লাহ তাআলা ইহসানকারীদের (সৎকর্মশীলদের) ভালোবাসেন।”10
“এদেরই প্রতিদান হলো তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং এমন জান্নাতসমূহ, যার গাছপালার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। যারা এমন করে, যারা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, তাদের প্রতিদান কতই না উত্তম!”11
“যদি দেখো আমরা কাফিরদের ধরাশায়ী করে পায়ের নিচে মাড়িয়ে চলেছি, তবুও আমি খবর না পাঠানো পর্যন্ত কখনো নিজেদের জায়গা ছাড়বে না!…” হাদীস শরীফ
ঈমানে ভরপুর হৃদয়, চোখে সাহসের স্ফুলিঙ্গ, শহিদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় জ্বলন্ত সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের জায়গায় স্থির থাকতে পারছিলেন না; যত দ্রুত সম্ভব শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তাঁরা আদেশের অপেক্ষা করছিলেন। বদরের যুদ্ধের মতোই হযরত আলি সাদা, জুবাইর ইবনে আওয়াম হলুদ আর আবু দুজানা লাল রঙের পাগড়ি মাথায় বাঁধলেন। হযরত হামজাও উটপাখির পালকে তৈরি তাঁর শিরোভূষণ পরলেন। দুই বাহিনী একে অপরের একেবারে কাছাকাছি চলে এল। উত্তেজনা তখন চরমে পৌঁছেছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একদিকে আল্লাহ তাআলার দ্বীন প্রচারের জন্য নিজেদের সবচেয়ে নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে লড়াই করতেও যাঁরা একটুও দ্বিধা করেননি, সেই ইসলামের মুজাহিদগণ, আর অন্যদিকে নিজেদের বাতিল পথে অনড় ইসলামের শত্রুদের মধ্যে এক বিরাট সম্মুখযুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছিল।
দুই বাহিনী যখন একটি তির ছোড়ার দূরত্বে এসে পৌঁছাল, তখন শত্রুর সারি থেকে এক বর্মধারী মুশরিক উট হাঁকিয়ে সামনে এগিয়ে এল এবং মুজাহিদদের কাছে দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য প্রতিপক্ষ দাবি করল। সবাই তাকে ভয় পাচ্ছে ভেবে সে তার দাবি তিনবার পুনরাবৃত্তি করল। তখন দেখা গেল, ইসলামি বাহিনী থেকে দীর্ঘদেহী, হলুদ পাগড়ি পরা এক বীর মুজাহিদ পায়ে হেঁটে ময়দানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ছিলেন মহানবীর ফুফাতো ভাই জুবাইর ইবনে আওয়াম (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। ইসলামি বাহিনী থেকে “আল্লাহু আকবার!…” ধ্বনি উঠছিল, হযরত জুবাইরের বিজয়ের জন্য দোয়া করা হচ্ছিল। দেখা গেল, জুবাইর ইবনে আওয়াম মুশরিকের কাছাকাছি পৌঁছেই এক লাফে তার উটের ওপর উঠে পড়লেন। উটের পিঠে ভয়ংকর লড়াই শুরু হলো। এ সময় শোনা গেল, আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করছেন, “ওকে মাটিতে ফেলে দাও!” এই আদেশ পাওয়ামাত্র হযরত জুবাইর প্রতিপক্ষকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিলেন। এরপর নিজেও লাফিয়ে নেমে তলোয়ার দিয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করলেন। মুশরিকের শিরস্ত্রাণ-পরা মাথা বর্মে ঢাকা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। মহানবী হযরত জুবাইরের জন্য দোয়া করলেন।
এরপর মুশরিকদের পতাকাবাহী তালহা ইবনে আবি তালহা ময়দানে ছুটে এসে চিৎকার করে বলল, “তোমাদের মধ্যে আমার মোকাবিলায় আসার মতো কেউ আছে কি?” তার সামনে এলেন আল্লাহ তাআলার সিংহ হযরত আলি। তিনি এক আঘাতেই আপাদমস্তক বর্মে মোড়া মুশরিক পতাকাবাহীর মাথা চিবুক পর্যন্ত চিরে ফেললেন। তা দেখে আমাদের প্রিয় নবী “আল্লাহু আকবার!… আল্লাহু আকবার!…” বলে তাকবির দিলেন। সাহাবায়ে কেরামও তাতে শামিল হলে তাকবিরের ধ্বনিতে আকাশ-পাতাল কেঁপে উঠল।12
এরপর মুশরিকদের পতাকা মাটিতে পড়ে গেছে দেখে তালহার ভাই উসমান ইবনে আবি তালহা ময়দানে ছুটে এল। সে তাদের পতাকা তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষ চাইল। তার সামনে এলেন হযরত হামজা। তিনি “ইয়া আল্লাহ!” বলে উসমানের কাঁধে এমনভাবে তলোয়ারের আঘাত হানলেন যে, পতাকা ধরা হাতটি কেটে গিয়ে মুশরিক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে প্রাণ হারাল।13
এবার মুশরিকদের পতাকা আবার মাটিতে পড়েছে দেখে আবু সাদ ইবনে আবি তালহা পায়ে হেঁটে ময়দানে এল। সেও ছিল আপাদমস্তক বর্মে ঢাকা। সে কুফরের পতাকা মাটি থেকে তুলে নিল এবং ইসলামি বাহিনীর দিকে ফিরে চিৎকার করতে লাগল, “আমি কুসামের পিতা। কে আমার মোকাবিলায় আসতে পারে?” মহানবী তার সামনেও হযরত আলিকে পাঠালেন। হযরত আলি সেই মুশরিককেও হত্যা করে তাদের পতাকা মাটিতে ফেলে দিলেন, তারপর মুজাহিদদের সারিতে নিজের জায়গায় ফিরে গেলেন।
এরপর বহু মুশরিক একে একে ময়দানে নেমে মাটিতে পড়ে থাকা পতাকা তুলে নিল এবং মুজাহিদদের কাছে মোকাবিলার জন্য বীর যোদ্ধা দাবি করল। কিন্তু প্রতিবারই আল্লাহ তাআলার অনুমতিতে বীর সাহাবীগণ বিজয়ী হলেন। প্রত্যেক পতাকাবাহী নিহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামি বাহিনী থেকে তাকবিরের ধ্বনি উঠত, আর শত্রুর সারিগুলোতে গভীর দুঃখ ও হতাশা নেমে আসত। এমনকি যাদের হট্টগোল আকাশ ছুঁয়েছিল, সেই মুশরিক নারীরাও একদিকে “ধিক তোমাদের!…” বলে নিজেদের সৈন্যদের অপমান করছিল, অন্যদিকে “আর কিসের অপেক্ষা করছ?…” বলে তাদের যুদ্ধে উসকে দিচ্ছিল।
এই তলোয়ারের হক কে আদায় করবে?
দুই পক্ষই যখন নিজেদের জায়গায় স্থির থাকতে পারছিল না, এমনই এক উত্তপ্ত মুহূর্তে আমাদের প্রিয় নবী হাতে ধরা তাঁর তলোয়ারটি দেখালেন। তার গায়ে এই কবিতা লেখা ছিল:
ভীরুতায় আছে লজ্জা, এগিয়ে যাওয়ায় সম্মান ও মর্যাদা।
ভয় পেলেই মানুষ তাকদির থেকে রেহাই পায় না।
তারপর শোনা গেল, তিনি ইরশাদ করছেন, “আমার কাছ থেকে এই তলোয়ার কে নেবে?” এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরামের অনেকে একসঙ্গে তা নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। মহানবী আবার ইরশাদ করলেন, “এর হক আদায় করার জন্য কে নেবে?” তখন সাহাবায়ে কেরাম চুপ হয়ে গেলেন এবং পিছিয়ে এলেন। তলোয়ারটি যাঁরা আগ্রহভরে চাইছিলেন, তাঁদের মধ্যে জুবাইর ইবনে আওয়াম বললেন, “আমি নেব, ইয়া রাসূলাল্লাহ।” মহানবী তলোয়ারটি হযরত জুবাইরকে দিলেন না। আবু বকর, উমর ও আলির (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) অনুরোধও মহানবী গ্রহণ করলেন না।
আবু দুজানা জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই তলোয়ারের হক কী?” আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “এর হক হলো, বেঁকে না যাওয়া পর্যন্ত এ দিয়ে শত্রুকে আঘাত করা। এর হক হলো, এ দিয়ে কোনো মুসলমানকে হত্যা না করা, এ নিয়ে কাফিরদের সামনে থেকে পালিয়ে না যাওয়া। আল্লাহ তাআলা তোমাকে বিজয় অথবা শাহাদাত নসিব না করা পর্যন্ত এ দিয়ে আল্লাহর পথে লড়াই করা।” তখন আবু দুজানা বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এর হক আদায় করার জন্যই এটি নিচ্ছি।” মহানবী হাতের তলোয়ারটি তাঁর হাতে তুলে দিলেন।14
আবু দুজানা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) যেমন অত্যন্ত সাহসী ও বীর ছিলেন, তেমনি যুদ্ধের ময়দানে খুবই কৌশলী আচরণ করতেন; “যুদ্ধ হলো কৌশল”15 – এই হাদীস শরীফ তিনি পুরোপুরি মেনে চলতেন। তলোয়ারটি হাতে নিয়ে হযরত আবু দুজানা কবিতা আবৃত্তি করতে করতে দম্ভভরে, গাম্ভীর্য ও গর্বের সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানের দিকে হেঁটে চললেন। তাঁর গায়ে একটি জামা আর মাথায় লাল পাগড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
হযরত আবু দুজানার এই চলন সাহাবায়ে কেরামের কাছে তেমন ভালো ঠেকল না। তখন মহানবী ইরশাদ করলেন, “এটি এমন এক চলন, যা এ ধরনের স্থান (যুদ্ধের ময়দান) ছাড়া অন্য কোথাও আল্লাহ তাআলার ক্রোধের কারণ হয়।” এভাবে তিনি জানিয়ে দিলেন যে, দম্ভভরে হাঁটা কেবল শত্রুর মোকাবিলাতেই জায়েজ।
আর অপেক্ষা করতে না পেরে মুশরিকদের সারি থেকে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ তার অধীন বাহিনী নিয়ে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাহাবায়ে কেরামও নিজেদের জায়গায় স্থির থাকতে পারছিলেন না; আমাদের প্রিয় নবী তাঁদেরও আক্রমণের আদেশ দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের ময়দান “আল্লাহু আকবার!” ধ্বনিতে ভরে গেল। সবার আগে, বর্মহীন বাহিনীর নেতৃত্বে থেকে হযরত হামজা দুই হাতের তলোয়ার দিয়ে সামনে আসা প্রত্যেক কাফিরকে আঘাত করতে লাগলেন। খালিদ ইবনে ওয়ালিদের বাহিনী প্রবল উন্মাদনা নিয়ে এসেছিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পিছু হটতে বাধ্য হলো। এবার খালিদ ইবনে ওয়ালিদ পাহাড়ি গিরিপথের দিক দিয়ে ঘুরে পেছন থেকে আঘাত হানার জন্য বিরাট এক বৃত্তাকার পথ ঘুরে আইনাইন টিলায় এসে পৌঁছাল। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর ও তাঁর অধীন পঞ্চাশজন বীর প্রবল তিরবৃষ্টি দিয়ে তাদের হটিয়ে দিলেন।
যুদ্ধ তখন তুঙ্গে উঠেছিল। দুই পক্ষই সর্বশক্তি দিয়ে লড়ছিল। একেকজন সাহাবী কমপক্ষে চারজন মুশরিকের সঙ্গে লড়াই করে সামনে এগোনোর চেষ্টা করছিলেন।
“হে আমার সাহাবীগণ! যাদের সংখ্যা কম, শত্রুর সঙ্গে লড়াই তাদের জন্য কঠিন হয়। যদি তারা অবিচল থাকে ও প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের স্বস্তি দান করেন” হাদীস শরীফ
হযরত হামজা একদিকে “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!” বলে হুংকার দিচ্ছিলেন, অন্যদিকে বলছিলেন, “আমি আল্লাহ তাআলার সিংহ!” আর শত্রুদের কচুকাটা করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া তার চারপাশের লোকদের বলছিল, “হামজা কোথায়? আমাকে দেখিয়ে দাও।” এই বলে সে যুদ্ধের ময়দানে খুঁজে ফিরছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল দুই তলোয়ার নিয়ে লড়াইরত এক ব্যক্তির ওপর। সে জিজ্ঞেস করল, “এই যোদ্ধাটি কে?” চারপাশের লোকেরা বলল, “যাকে তুমি খুঁজছ! হামজা!” সাফওয়ান বলল, “নিজের কওমকে হত্যা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া তার মতো উন্মত্ত ও নির্ভীক আর কাউকে আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি।”
যুদ্ধ যখন ভীষণভাবে জমে উঠেছিল, তখন মুহাজিরদের অন্যতম জুবাইর ইবনে আওয়াম তলোয়ারটি তাঁকে না দেওয়ায় মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে মনে মনে বললেন, “আমি রাসূলুল্লাহর কাছে তলোয়ারটি চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি তা আবু দুজানাকে দিলেন। অথচ আমি তাঁর ফুফু সাফিয়ার ছেলে। তার ওপর আমি কুরাইশ বংশের। তা ছাড়া আমিই আগে চেয়েছিলাম। যাই, গিয়ে দেখি, আবু দুজানা আমার চেয়ে বেশি কী করে।” এরপর তিনি আবু দুজানাকে অনুসরণ করতে লাগলেন। হযরত আবু দুজানা “আল্লাহু আকবার!” বলে তাকবির দিচ্ছিলেন, আর মুশরিকদের যাকেই সামনে পাচ্ছিলেন, আঘাত করে হত্যা করছিলেন। মুশরিকদের সবচেয়ে দুর্ধর্ষদের একজন, বিশালদেহী, আপাদমস্তক বর্মে ঢাকা, কেবল চোখ দুটো দেখা যায় – এমন এক ব্যক্তি আবু দুজানার মুখোমুখি হলো। প্রথমে সে-ই হযরত আবু দুজানার ওপর আক্রমণ করল। আবু দুজানা ঢাল দিয়ে তার আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করলেন। মুশরিকের তলোয়ার আবু দুজানার ঢালে গেঁথে গেল। সে তলোয়ার ধরে টানল, কিন্তু বের করতে পারল না। এবার আবু দুজানার পালা। তিনি তলোয়ারের এক আঘাতেই প্রতিপক্ষকে হত্যা করলেন।
এরপর আবু দুজানা সামনে আসা প্রত্যেক বেঈমানকে ধরাশায়ী করতে করতে পাহাড়ের পাদদেশে দফ বাজিয়ে মুশরিকদের উসকে দেওয়া নারীদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। কিন্তু তলোয়ার তুলেও তিনি আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দকে হত্যা করা থেকে বিরত রইলেন।16 তা দেখে জুবাইর ইবনে আওয়াম মনে মনে বললেন, “তলোয়ারটি কাকে দেওয়া উচিত, তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমার চেয়ে ভালো জানেন।” তিনি আরও বললেন, “আল্লাহর কসম, তাঁর চেয়ে ভালো লড়াই করতে, আঘাত হানতে পারে এমন কাউকে আমি দেখিনি।”
মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ, জুবাইর ইবনে আওয়াম, হযরত আলি, হযরত উমর, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, মুসআব ইবনে উমাইর – তাঁরা সবাই ছিলেন যেন এক একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ। মহানবী শত্রুর একেবারে কাছে থেকে লড়াই করছেন, বারবার আক্রমণ করছেন দেখে গৌরবময় সাহাবীগণ নিজেদের জায়গায় স্থির থাকতে পারছিলেন না। রাসূলুল্লাহর কোনো ক্ষতি হতে পারে ভেবে তাঁরা তাঁর চারপাশে জড়ো হচ্ছিলেন এবং বর্মে মোড়া শত্রুকে চোখ মেলারও সুযোগ দিচ্ছিলেন না। এ সময় দেখা গেল, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর শহিদ হয়েছেন। তিনি ছিলেন উহুদের প্রথম শহিদ। তাঁকে শহিদ হতে দেখে তাঁর সাথিরা সিংহের বিক্রমে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য শত্রুর একেবারে মাঝখানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
যুদ্ধের এমনই এক কঠিন মুহূর্তে বীরত্বের প্রতীক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ এবং তিরন্দাজদের শিরোমণি হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের দেখা হলো। দুজনেই শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আহত হয়েছিলেন। হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস বর্ণনা করেন, “উহুদে তখন যুদ্ধের এক ভয়াবহ মুহূর্ত। হঠাৎ আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ আমার কাছে এসে আমার হাত ধরে আমাকে একটি পাথরের আড়ালে টেনে নিলেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘এখন এখানে তুমি দোয়া করো, আমি “আমিন” বলব। তারপর আমি দোয়া করব, তুমি “আমিন” বলবে!’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে।’ আমি এভাবে দোয়া করলাম, ‘হে আল্লাহ! আমার কাছে অত্যন্ত শক্তিশালী ও কঠিন শত্রু পাঠাও, যেন আমি তাদের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করতে পারি, তাদের সবাইকে হত্যা করতে পারি এবং গাজি হয়ে ফিরে আসতে পারি।’ আমার এই দোয়ায় তিনি সমস্ত অন্তর দিয়ে বললেন, ‘আমিন।’
এরপর তিনি নিজে দোয়া করতে শুরু করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমার কাছে দুর্ধর্ষ শত্রু পাঠাও, যেন আমি তাদের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করতে পারি, জিহাদের হক আদায় করতে পারি, তাদের সবাইকে হত্যা করতে পারি। শেষে তাদের কেউ আমাকে শহিদ করুক। তারপর আমার ঠোঁট, নাক ও কান কেটে নিক, যেন আমি রক্তে রঞ্জিত হয়ে তোমার দরবারে উপস্থিত হতে পারি। তুমি যখন জিজ্ঞেস করবে, “আবদুল্লাহ! তোমার ঠোঁট, নাক, কান কী করেছ?” তখন আমি বলব, “হে আল্লাহ! এগুলো দিয়ে আমি অনেক ত্রুটি করেছি, এগুলোকে যথাস্থানে ব্যবহার করিনি। এগুলো তোমার দরবারে নিয়ে আসতে লজ্জা পেয়েছি। আমার প্রিয় নবী যে যুদ্ধে ছিলেন, সেই যুদ্ধে ধুলোবালিতে মাখামাখি হয়ে এভাবেই এসেছি।”’ এমন দোয়ায় ‘আমিন’ বলতে আমার মন চাইছিল না। কিন্তু তিনি তা চেয়েছিলেন এবং আমি আগেই কথা দিয়েছিলাম বলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললাম, ‘আমিন।’
এরপর আমরা তলোয়ার উঁচিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গেলাম। আমরা দুজনেই সামনে যাকে পাচ্ছিলাম, তাকেই হত্যা করছিলাম। তিনি অসাধারণ বীরত্বের সঙ্গে আক্রমণ করছিলেন এবং শত্রুর সারিগুলো ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছিলেন। তিনি বারবার শত্রুকে আঘাত হানছিলেন, শহিদ হওয়ার অফুরন্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ছিলেন। ‘আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!…’ বলে লড়াই করার সময় তাঁর তলোয়ার ভেঙে গেল। সেই মুহূর্তে আমাদের প্রিয় নবী তাঁর দিকে একটি খেজুরের ডাল বাড়িয়ে দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আদেশ দিলেন। এই ডালটি মুজিযা হিসেবে তলোয়ারে পরিণত হলো, আর তিনি সামনে যে-ই এল, তার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গেলেন। তিনি বহু শত্রুকে হত্যা করলেন। যুদ্ধের শেষ দিকে আবুল হাকাম নামের এক মুশরিকের ছোড়া তিরে তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত শাহাদাত লাভ করলেন। তিনি শহিদ হলে কাফিররা তাঁর মরদেহের ওপর হামলে পড়ে তাঁর নাক, ঠোঁট ও কান কেটে নিল। তাঁর সারা শরীর রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল।”
মুজাহিদদের সারিতে কুজমান নামে এক ব্যক্তি ছিল। সে তার তলোয়ারের খাপ ভেঙে ফেলে বলল, “পালানোর চেয়ে মরা অনেক ভালো!” এ কথা বলে সে খোলা তলোয়ার নিয়ে মুশরিকদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কুজমান অনেক বীরত্ব ও সাহসিকতা দেখাল। একাই সে সাত-আটজন কাফিরকে হত্যা করল। শেষে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। সাহাবায়ে কেরাম তার এই বীরত্বে বিস্মিত হয়ে মহানবীকে জানালে তিনি ইরশাদ করলেন, “সে জাহান্নামি।” হযরত কাতাদা ইবনে নুমান কুজমানের কাছে গিয়ে বললেন, “হে কুজমান! শাহাদাত তোমার জন্য মুবারক হোক!” তখন কুজমান বলল, “আমি দ্বীনের জন্য আত্মমর্যাদাবোধ থেকে নয়, বরং কুরাইশরা মদিনায় এসে যেন আমার খেজুরবাগান ধ্বংস না করে, সে জন্য লড়াই করেছি!” তারপর সে তির দিয়ে নিজের কবজির রগ ফুঁড়ে আত্মহত্যা করল। এভাবে মহানবীর “সে জাহান্নামি!” কথার হিকমত বোঝা গেল।
যুদ্ধের শুরু থেকেই জগৎসমূহের সরদার আমাদের প্রিয় নবী থেকে শুরু করে সকল সাহাবায়ে কেরাম এক মহা সংগ্রাম চালিয়ে গেলেন। প্রবল আক্রমণে তাঁরা মুশরিক বাহিনীকে পিছু হটিয়ে দিলেন। পাথর ও কাঠ দিয়ে নিজেদের বানানো যেসব মূর্তির তারা “লাত, উজ্জা, হুবাল!” বলে পূজা করত, মুশরিকরা সেগুলোর কাছেই উপকার ও সাহায্য চাইছিল; কিন্তু মুজাহিদদের এই বীরত্বের সামনে তাদের দলটি বিপর্যস্ত হয়ে পালাতে শুরু করল। তাদের যুদ্ধে উসকে দিতে আসা নারীরা আর্তনাদ করতে করতে পলায়নরত সৈন্যদের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করছিল।
কুরাইশ মুশরিকরা যখন যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে, সঙ্গে আনা মালপত্র ফেলে রেখে মক্কার দিকে পালাতে শুরু করল, তখন ইসলামের সৈনিকগণ আনন্দিত হয়ে আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুত বিজয় লাভ করায় তাঁর প্রশংসা করলেন। সংখ্যা ও শক্তিতে বহু গুণ শ্রেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও মুশরিকরা মুসলমানদের সামনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তারা যখন একে অপরকে মাড়িয়ে পালাচ্ছিল, তখন গৌরবময় সাহাবীগণ তাদের ধাওয়া করছিলেন এবং যাদের নাগাল পাচ্ছিলেন, আঘাত করে হত্যা করছিলেন। মুশরিক বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আবু সুফিয়ান ঘোড়ায় চড়ে পালানোর চেষ্টা করছিল; এই হট্টগোলের মধ্যে সদ্য বিবাহিত হযরত হানজালা ইবনে আবি আমির তার নাগাল পেলেন। তিনি ঘোড়ার পায়ে তলোয়ারের আঘাত হেনে ঘোড়াটিকে মাটিতে বসিয়ে দিলেন। মাটিতে পড়ে গিয়ে আবু সুফিয়ান সর্বশক্তি দিয়ে আর্তনাদ করতে লাগল, “হে কুরাইশরা!… বাঁচাও!… আমি আবু সুফিয়ান! হানজালা আমাকে তলোয়ার দিয়ে টুকরো টুকরো করতে চাইছে!…” তার সঙ্গে যারা পালাচ্ছিল, সেই মুশরিকরা এই অবস্থা দেখেও নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর চিন্তায় ব্যস্ত রইল; সেনাপতির দিকে তারা ফিরেও তাকাল না।
“যুদ্ধ হলো কৌশল” হাদীস শরীফ
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে হযরত হানজালার ঠিক পেছনে থাকা মুশরিক শাদ্দাদ ইবনে আসওয়াদ তার বর্শা হানজালার পিঠে বিঁধিয়ে দিল। হযরত হানজালা “আল্লাহু আকবার!” বলে একবার ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলেও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শহিদ হলেন, আর তাঁর মুবারক রুহ জান্নাতে উড়ে গেল। রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করলেন, “আমি দেখলাম, ফেরেশতারা আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে রুপার একটি পাত্রে বৃষ্টির পানি দিয়ে হানজালাকে গোসল দিচ্ছেন।” আবু উসাইদি বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহর এই কথা শুনে আমি হানজালার কাছে গেলাম। তাঁর মাথা থেকে বৃষ্টির পানি ঝরছিল। ফিরে এসে আমি রাসূলে আকরামকে এ কথা জানালাম।” হযরত হানজালাকে বলা হলো “গাসিলুল মালাইকা”, অর্থাৎ ফেরেশতারা যাঁকে গোসল দিয়েছেন।17
মুশরিকরা পালাচ্ছে দেখে আইনাইন গিরিপথের তিরন্দাজদের কয়েকজন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে নিজেদের জায়গা ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর ও বারোজন নিজেদের জায়গায় রয়ে গেলেন।18
হযরত আলির বীরত্ব
এ সময় কুরাইশদের তিরন্দাজ দলের সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ওত পেতে অপেক্ষা করছিল, প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টায় ছিল। গিরিপথে মুজাহিদদের সংখ্যা কমে গেছে দেখে সে তার অধীন অশ্বারোহীদের নিয়ে অভিযানে নামল।
খালিদ ও ইকরিমা ইবনে আবি জাহল মুহূর্তের মধ্যে আইনাইন গিরিপথে এসে পৌঁছাল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর ও তাঁর বিশ্বস্ত, অনুগত সাথিরা সারিবদ্ধ হয়ে ছড়িয়ে দাঁড়ালেন। তূণের তির শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা শত্রুর ওপর তির বর্ষণ করলেন। এরপর বর্শা দিয়ে লড়লেন, আর মুখোমুখি হয়ে গেলে “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!” বলে বলে তলোয়ার দিয়ে অনেক বীরত্ব দেখালেন। ঈমানদার ও বেঈমানদের মধ্যে অনুপাত ছিল একেবারেই অসম: একজনের বিপরীতে পঁচিশজন। গৌরবময় সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের নবীর আদেশ পালনের জন্য রক্তের শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়াই করলেন। একের পর এক তাঁরা শাহাদাতের শরবত পান করলেন, তাঁদের মুবারক দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, আর রুহ জান্নাতে উড়ে গেল (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)।
মুশরিকরা আক্রোশে হযরত আবদুল্লাহর পোশাক খুলে নিয়ে তাঁর মুবারক দেহ বর্শা দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করল। তাঁর পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলল।
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ও ইকরিমা গিরিপথের মুজাহিদদের শহিদ করে দ্রুত ইসলামি বাহিনীর ওপর পেছন দিক থেকে আক্রমণ চালাল। হঠাৎ পেছনে শত্রুর আবির্ভাব দেখে সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেন না। কারণ তাঁদের অনেকে এমনকি অস্ত্রও নামিয়ে রেখেছিলেন। সবকিছু হঠাৎ পাল্টে গেল। সামনে পলায়নরত কুরাইশ মুশরিকরা খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে পেছন থেকে আক্রমণে যেতে দেখে আবার ফিরে এল। মুজাহিদগণ দুই দিক থেকে শত্রুর মাঝখানে আটকে পড়লেন। শত্রুরা সামনে ও পেছন থেকে আক্রমণ চালিয়ে মুজাহিদদের চেপে ধরতে লাগল। সাহাবীদের পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তাঁরা ছত্রভঙ্গ হতে বাধ্য হলেন।19
হযরত আলি বর্ণনা করেন, “ইকরিমা ইবনে আবি জাহলও যাদের মধ্যে ছিল, মুশরিকদের এমন একটি দলের মাঝখানে আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম। তারা আমাকে ঘিরে ফেলল, তাদের অধিকাংশকে আমি তলোয়ারের আঘাতে শেষ করলাম। আরেকটি দলের ভেতরে ঢুকে পড়লাম, তাদেরও অনেককে ঘায়েল করলাম। আমার মৃত্যুর সময় আসেনি বলে আমার কিছুই হয়নি। এক সময় আমি রাসূলুল্লাহকে দেখতে পেলাম না। মনে মনে বললাম, ‘কসম করে বলছি, তিনি যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে চলে যাওয়ার মানুষ নন। নিশ্চয়ই আমাদের অসংগত আচরণের কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁকে আমাদের মাঝ থেকে তুলে নিয়েছেন! এখন আমার জন্য লড়াই করতে করতে মৃত্যুবরণ করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।’ এ কথা বলে আমি আমার তলোয়ারের খাপ ভেঙে ফেললাম। মুশরিকদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ তাদের মাঝখানে রয়ে গেছেন। তখন বুঝলাম, আল্লাহ তাআলা তাঁর ফেরেশতাদের দিয়ে রাসূলুল্লাহকে রক্ষা করছিলেন।”
শত্রুসৈন্যরা রাসূলে আকরামের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একেবারে কাছে এসে পড়েছিল। পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমাদের প্রিয় নবী ঠিক এক খাড়া পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন, অবিচল ছিলেন, নিজের জায়গা থেকে একটুও সরছিলেন না। একদিকে তিনি শত্রুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন, অন্যদিকে ছত্রভঙ্গ সাহাবীদের একত্র করার চেষ্টা করে ইরশাদ করছিলেন, “হে অমুক, আমার দিকে এসো! হে অমুক, আমার দিকে এসো! আমি আল্লাহর রাসূল।
যে আমার কাছে ফিরে আসবে, তার জন্য জান্নাত!” হযরত আবু বকর, হযরত উমর, আবদুর রহমান ইবনে আওফ, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, আলি ইবনে আবি তালিব, জুবাইর ইবনে আওয়াম, আবু দুজানা, আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ, সাদ ইবনে মুআজ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, হুবাব ইবনে মুনজির, উসাইদ ইবনে হুদাইর, সাহল ইবনে হুনাইফ, আসিম ইবনে সাবিত, হারিস ইবনে সিম্মা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) মুহূর্তের মধ্যে আমাদের প্রিয় নবীর চারপাশে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাঁকে রক্ষা করার জন্য এক জীবন্ত দুর্গপ্রাচীর গড়ে তুললেন।
এ সময় শোনা গেল, হযরত আব্বাস ইবনে উবাদা ছত্রভঙ্গ সাহাবায়ে কেরামকে একত্র করার জন্য চিৎকার করে বলছেন, “হে আমার ভাইয়েরা! আমরা যে বিপদে পড়েছি, তা আমাদের নবীর আদেশ পালন না করারই পরিণাম। তোমরা ছত্রভঙ্গ হয়ো না! আমাদের নবীর চারপাশে চলে এসো! আমরা যদি রক্ষাকারীদের পাশে স্থান না নিই এবং আমাদের কারণে রাসূলুল্লাহর কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে আমাদের রবের দরবারে পেশ করার মতো কোনো অজুহাতই আমাদের থাকবে না!” হযরত আব্বাস ইবনে উবাদা খারিজা ইবনে জায়েদ ও আওস ইবনে আরকামকে সঙ্গে নিয়ে “আল্লাহু আকবার!” ধ্বনি দিয়ে খোলা তলোয়ার হাতে শত্রুর ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর জন্য, তাঁকে রক্ষা করার জন্য বীরের মতো লড়াই করলেন। খারিজা ইবনে জায়েদ শরীরের উনিশ জায়গায় আঘাত পেয়েছিলেন। অন্যদের আঘাতও তার চেয়ে কম ছিল না। অবশেষে তিনজনই তাঁদের বহু আকাঙ্ক্ষিত শাহাদাতের মর্যাদায় পৌঁছে গেলেন।
এই অত্যন্ত বিপজ্জনক মুহূর্তে সাহাবায়ে কেরাম ধীরে ধীরে মহানবীর চারপাশে জড়ো হতে লাগলেন। মুশরিকরা আমাদের প্রিয় নবীকে এবং যে গৌরবময় সাহাবীগণ নিজেদের দেহ দিয়ে তাঁকে আড়াল করে রেখেছিলেন, তাঁদের ঘিরে ফেলল। চারদিক থেকে দলে দলে এগিয়ে এসে তারা বৃত্তটি সংকুচিত করছিল। কুরাইশদের একটি দলকে সামনে ধেয়ে আসতে দেখে জগৎসমূহের সরদার তাঁর পাশে থাকা, জান কুরবান করতে প্রস্তুত সাহাবীদের বললেন, “এই দলটির মোকাবিলা কে করবে?” তখন দেখা গেল, হযরত ওয়াহাব ইবনে কাবুস “আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি মোকাবিলা করব!” বলে সামনে ছুটে গেলেন। আল্লাহ তাআলার সম্মানিত নাম মুখে নিতে নিতে এই বীর খোলা তলোয়ার নিয়ে মুশরিকদের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। মহানবী ইরশাদ করলেন, “আমি তোমাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছি।” শত্রুর সামনে তাঁর অবিচলতা ও প্রচেষ্টা দেখে তিনি আরও ইরশাদ করলেন, “হে আল্লাহ! তাঁর প্রতি রহমত করো! তাঁর প্রতি দয়া করো!”
মুশরিকরা হযরত ওয়াহাবকে মাঝখানে ঘিরে বর্শা দিয়ে শহিদ করেছে দেখে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস তাঁকে সাহায্য করার জন্য সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, শত্রুর মাঝখানে ঢুকে অভূতপূর্ব বীরত্ব দেখালেন। তিনি বহু কাফিরকে ঘায়েল করলেন, বাকিদের পিছু হটিয়ে তাঁর প্রিয় নবীর কাছে ফিরে এলেন। রাসূলে আকরাম হযরত ওয়াহাব সম্পর্কে ইরশাদ করলেন, “আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। আল্লাহ তাআলাও সন্তুষ্ট হোন।” মুজাহিদদের বৃত্ত ভেদ করে মুশরিকদের একটি দল তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে দেখে হাবিবে আকরাম মহানবী হযরত আলিকে বললেন, “তাদের ওপর আক্রমণ করো!” হযরত আলি আক্রমণ চালিয়ে আমর ইবনে আবদুল্লাহকে হত্যা করলেন, বাকিদের তাড়িয়ে দিলেন। তাঁর তলোয়ার ভেঙে গেলে মহানবী তাঁকে জুলফিকার দিলেন। আরেকটি দল এগিয়ে আসার সময় মহানবী ইরশাদ করলেন, “হে আলি! এদের অনিষ্ট আমার থেকে দূর করো।” রাসূলুল্লাহর জন্য জান কুরবান করা আল্লাহ তাআলার সিংহ তৎক্ষণাৎ আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। শাইবা ইবনে মালিককে হত্যা করে বাকিদের পিছু হটিয়ে দিলেন। সেই মুহূর্তে জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে মহানবীকে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ হলো আলির কাছ থেকে প্রকাশিত এক অসাধারণ বীরত্ব।” রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করলেন, “সে আমার থেকে, আর আমি তার থেকে।”
“আমি দেখলাম, ফেরেশতারা আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে রুপার একটি পাত্রে বৃষ্টির পানি দিয়ে হানজালাকে গোসল দিচ্ছেন” হাদীস শরীফ
জিবরাইল আলাইহিস সালামও বললেন, “আর আমি আপনাদের দুজনের থেকে।” ঠিক সেই মুহূর্তে একটি আওয়াজ শোনা গেল, “আলির মতো বীর নেই, জুলফিকারের মতো তলোয়ার নেই।”
আমাদের প্রিয় নবীর কাছে পৌঁছাতে পারবে না বুঝতে পেরে মুশরিকরা তির ছুড়তে শুরু করল। ছোড়া তিরগুলো হয় তাঁর মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল, নয়তো তাঁর সামনে, ডানে অথবা বামে গিয়ে পড়ছিল।
সাহাবায়ে কেরাম শত্রুকে পিছু হটানোর জন্য জান হাতে নিয়ে লড়ছিলেন; এই অবস্থা দেখামাত্র তাঁরা জগৎসমূহের সরদারের চারপাশে জড়ো হয়ে ছুটে আসা তিরের সামনে নিজেদের মুবারক দেহ ঢাল হিসেবে পেতে দিতে লাগলেন। মহানবী সাহাবীদের তির দিয়েই জবাব দেওয়ার আদেশ দিলে সাহাবীগণও শত্রুর দিকে তির ছুড়তে শুরু করলেন। আমাদের প্রিয় নবী হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে নিজের সামনে বসালেন। অত্যন্ত নিপুণ তিরন্দাজ হযরত সাদ দ্রুত একের পর এক শত্রুর ওপর তির বর্ষণ করতে লাগলেন। তূণ, অর্থাৎ তিরের থলি থেকে প্রতিটি তির বের করার সময় তিনি বলছিলেন, “হে আমার রব! এ তোমারই তির। এ দিয়ে শত্রুকে আঘাত করো!” আর মহানবী ইরশাদ করছিলেন, “হে আল্লাহ! সাদের দোয়া কবুল করো! হে আল্লাহ! সাদের তির লক্ষ্যভেদী করো!… চালিয়ে যাও, সাদ! চালিয়ে যাও! আমার মা-বাবা তোমার জন্য কুরবান হোক!” এভাবে প্রতিটি তির ছোড়ার সময় মহানবী একই দোয়া পুনরাবৃত্তি করছিলেন।
হযরত সাদের তির শেষ হয়ে গেলে আমাদের প্রিয় নবী নিজের তিরগুলো তাঁকে দিয়ে ছোড়ালেন। হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের প্রতিটি তির হয় কোনো শত্রুকে, নয়তো তার বাহন পশুকে বিদ্ধ করছিল।
মুশরিকদের তির ছোড়ার সময় হযরত আবু তালহা আমাদের প্রিয় নবীর সামনে আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছুটে আসা প্রতিটি তিরের সামনে নিজের দেহ ও ঢাল পেতে দিচ্ছিলেন, আর মাঝে মাঝে এমন হুংকার দিচ্ছিলেন যে, শত্রু হতভম্ব হয়ে যাচ্ছিল। মহানবী ইরশাদ করলেন, “সেনাদলের মধ্যে আবু তালহার আওয়াজ একশোজনের চেয়েও উত্তম।” আবু তালহা সুযোগ পেলেই মুশরিকদের দিকে তির ছুড়তে কসুর করতেন না; তিনি জোরালো ও অত্যন্ত দ্রুত তির ছুড়তেন, তাঁর কোনো তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না। তাঁর ছোড়া তির কোথায় গিয়ে পড়ছে দেখার জন্য রাসূলে আকরাম যতবার তাঁর মাথা মুবারক ওপরে তুলতেন, ততবার রাসূলুল্লাহর গায়ে তির লেগে যাওয়ার ভয়ে আবু তালহা বলতেন, “আমার মা-বাবা, আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার মুবারক মাথা তুলবেন না, যেন শত্রুর কোনো তির আপনার গায়ে লেগে ক্ষতি না করে! আমার দেহ আপনার মুবারক দেহের ঢাল এবং আপনার জন্য কুরবান! আমাকে জবাই না করে তারা আপনার কাছে পৌঁছাতে পারবে না! আমি না মরা পর্যন্ত আপনার কিছুই হবে না!…” এভাবে তিনি আমাদের প্রিয় নবীকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি প্রাধান্য দিতেন।
উহুদের ময়দানের প্রতিটি দিকে নির্মম, ভয়াবহ লড়াই পূর্ণ তীব্রতায় চলছিল; কেউ ঘোড়ায় চড়ে, কেউ পায়ে হেঁটে ঈমান ও কুফরের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল। সাহাবায়ে কেরাম তখনো একত্র হতে পারেননি। মহানবীর চারপাশে মাত্র ত্রিশজনের মতো সাহাবী প্রদীপের চারপাশে পতঙ্গের মতো ঘুরছিলেন। তাঁরা ছুটে আসা তির, বর্শা ও তলোয়ারের আঘাতের সামনে নিজেদের দেহকে ঢাল বানাচ্ছিলেন। তাঁদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল মহানবীর আদেশ পালন করা এবং তাঁর ওপর আসতে পারে এমন সব ধরনের ক্ষতি দূর করা। বীরদের সরদার হযরত হামজা সেই হট্টগোলের মধ্যে মহানবীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তিনি এক দল শত্রুর মাঝখানে দুই হাতে দুই তলোয়ার নিয়ে লড়াই করছিলেন, আর “আল্লাহু আকবার!…” ধ্বনিতে শত্রুর অন্তরে ত্রাস সৃষ্টি করছিলেন। এ পর্যন্ত তিনি একাই পুরো একত্রিশজন মুশরিককে হত্যা করেছিলেন, আরও বহুজনের হাত বা পা কেটে ফেলেছিলেন। যে মুশরিক দলের মাঝে তিনি পড়েছিলেন, তাদের যখন তিনি ছত্রভঙ্গ করছিলেন, তখন সিবা ইবনে উম্মে আনমার “আমার মোকাবিলা করতে পারে এমন কোনো বীর আছে কি?” বলে হযরত হামজাকে লড়াইয়ের আহ্বান জানাল। হযরত হামজা বললেন, “আমার কাছে আয়, হে খতনাকারিণীর ছেলে! তাহলে তুই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান জানাচ্ছিস, তাই না?” এ কথা বলে তাকে চোখের পলক ফেলার সুযোগ না দিয়ে পা ধরে মাটিতে আছড়ে ফেললেন।20 হযরত হামজা তার ওপর চেপে বসে মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করলেন। তারপর দেখলেন, সামনের পাথরের আড়াল থেকে তখনো মুসলমান না হওয়া ওয়াহশি হাতে বর্শা নিয়ে তাঁকে নিশানা করছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে এগিয়ে গেলেন, কিন্তু সামনে বন্যার পানিতে তৈরি হওয়া একটি গর্তের কাছে পৌঁছাতেই তাঁর পা পিছলে গেল, তিনি চিত হয়ে পড়ে গেলেন। সেই মুহূর্তে তাঁর পেটের দিক থেকে বর্ম সরে গিয়েছিল। সুযোগ পেয়ে ওয়াহশি বর্শা ছুড়ে মারল!… বর্শাটি উড়ে এসে হযরত হামজার মুবারক দেহে বিঁধে অপর দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল। বীরদের সবচেয়ে মহান সেই মানুষটি “হে আল্লাহ!” বলে সেখানেই বসে পড়লেন। তিনি শহিদ হলেন, তাঁর বহু আকাঙ্ক্ষিত মর্যাদায় পৌঁছে গেলেন। আল্লাহ তাআলার পথে, তাঁর প্রিয় নবীর জন্য তিনি জান কুরবান করলেন (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
“হে সাদ! আমার মা-বাবা তোমার জন্য কুরবান হোক! হে আমার রব! তার তিরগুলো লক্ষ্যে পৌঁছে দাও এবং তার দোয়া কবুল করো!” হাদীস শরীফ
এ সময় শত্রুর সারিতে কেউ একজন এই বলে মুশরিকদের বিশ্বজগতের সরদারের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওপর হামলা চালাতে উসকে দিচ্ছিল, “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আত্মীয়তার হক রক্ষা করেনি, তোমাদের কওমকে বিভক্ত করেছে যে মুহাম্মদ, তার সঙ্গে লড়াই থেকে বিরত হয়ো না। মুহাম্মদ যদি রক্ষা পায়, তবে আমি যেন রক্ষা না পাই!…” এই আওয়াজ ছিল আসিম ইবনে আবি আওফের। হযরত আবু দুজানা এই আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন। লড়াই করতে করতে তিনি আসিম ইবনে আবি আওফকে খুঁজে বের করলেন এবং তৎক্ষণাৎ তাকে হত্যা করলেন। কিন্তু তার পেছনে থাকা মুশরিক মাবাদ সর্বশক্তি দিয়ে হযরত আবু দুজানার দিকে তলোয়ার চালাল। আল্লাহ তাআলার এক অনুগ্রহে আকস্মিক ও অত্যন্ত দ্রুত এক নড়াচড়ায় মাটিতে বসে পড়ে আবু দুজানা প্রাণঘাতী আঘাত থেকে বেঁচে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি মাবাদকে তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করলেন।
কুরাইশ মুশরিকদের লক্ষ্য ছিলেন জগৎসমূহের সরদার। তাঁর কাছে পৌঁছানোর জন্য তারা তাদের সব শক্তি ব্যয় করছিল। কিন্তু গৌরবময়, সম্মানিত সাহাবীগণ প্রদীপের চারপাশে পতঙ্গের মতো তাঁর চারপাশে ঘুরছিলেন; তাঁর কোনো ক্ষতি হবে – এই ভয়ে তাঁরা জান কুরবান করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছিলেন না। মুশরিকরা কিছুতেই তাঁদের ভেদ করতে পারছিল না। এই ত্রিশজন বীর রাসূলুল্লাহর সামনে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কখনো আপনার পাশ থেকে সরব না; আমাদের মুখ আপনার মুবারক মুখের সামনে ঢাল ও দুর্গ; আমাদের দেহ আপনার মুবারক দেহের জন্য কুরবান; শুধু আপনি নিরাপদে থাকুন!”
মুশরিকরা দলে দলে আক্রমণ করছিল। বিশ্বজগতের গৌরব মহানবী একটি দলের দিকে ইশারা করে তাঁর পাশে থাকা, নিজেদের দেহ দিয়ে তাঁকে আড়াল করা বীর সাহাবীদের বললেন, “আল্লাহ তাআলার পথে আমাদের জন্য কে নিজের দেহ কুরবান করবে?” তখন মদিনার পাঁচজন সাহাবী সামনে ছুটে গেলেন। এই বীর পতঙ্গেরা রাসূলুল্লাহর মুবারক চোখের সামনে তাকবির দিতে দিতে, তাঁর চারপাশে ঘুরে ঘুরে লড়াই করলেন। অবশেষে তাঁদের চারজন সেখানেই শহিদ হলেন। পঞ্চমজন শরীরের চৌদ্দ জায়গায় আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে জগৎসমূহের সরদার ইরশাদ করলেন, “তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।” তাঁর শরীরের প্রতিটি স্থান থেকে রক্ত ঝরছিল। আমাদের প্রিয় নবী বসে পড়লেন এবং তাঁর মুবারক পা দুটি সাহাবীর মাথার নিচে বালিশ বানিয়ে দিলেন। এই অবস্থায় যে সৌভাগ্যবান সাহাবী শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করলেন, তিনি ছিলেন হযরত উমারা ইবনে ইয়াজিদ।
তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহর বীরত্ব
মুশরিকরা যখন একেবারে কাছে চলে এসেছিল, এমন সময় মহানবী ইরশাদ করলেন, “এদের মোকাবিলা কে করবে, কে এদের থামাবে?” হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ “আমি! ইয়া রাসূলাল্লাহ!” বলে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলেন। মহানবী ইরশাদ করলেন, “তোমার মতো আর কে আছে?” মদিনার সাহাবীদের একজন “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি!” বলে অনুমতি চাইলেন। আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “যাও, তুমিই মোকাবিলা করো।” এ কথায় তিনি সামনে ছুটে গেলেন এবং মুশরিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
তিনি নজিরবিহীন বীরত্ব দেখালেন। কয়েকজন বেঈমানকে হত্যা করার পর তিনি শাহাদাতের শরবত পান করলেন।21 রাসূলে আকরাম আবার ইরশাদ করলেন, “এদের মোকাবিলায় কে দাঁড়াবে?” সবার আগে আবারও হযরত তালহা এগিয়ে এলেন। মহানবী জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার মতো আর কে আছে?” তখন আনসারদের এক মুবারক ব্যক্তি বললেন, “আমি মোকাবিলা করব, ইয়া রাসূলাল্লাহ।” মহানবী ইরশাদ করলেন, “যাও, তুমিই তাদের মোকাবিলা করো।” তিনিও মুশরিকদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে শহিদ হলেন। এভাবে সেই মুহূর্তে মহানবীর পাশে থাকা সকল সাহাবী লড়াই করতে করতে শাহাদাত লাভ করলেন।
তখন বিশ্বজগতের সুলতান মহানবীর পাশে হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। রাসূলুল্লাহর কোনো ক্ষতি হবে এই আশঙ্কায় হযরত তালহা চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন, কাফিরদের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করছিলেন। তাঁর এত দ্রুত তলোয়ার চালানো, মুহূর্তের মধ্যে রাসূলুল্লাহর চারদিকের শত্রুর জবাব দেওয়া, তির, বর্শা ও তলোয়ারের আঘাতের সামনে নিজের দেহকে ঢাল বানানো ছিল এক নজিরবিহীন ঘটনা। হযরত তালহা পতঙ্গের মতো ঘুরছিলেন, নিজের গায়ে লাগা তলোয়ারের আঘাতের দিকে একটুও ভ্রুক্ষেপ করছিলেন না। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল বিশ্বজগতের সুলতানকে রক্ষা করা এবং এই পথে অন্য ভাইদের মতো শহিদ হওয়া। তাঁর শরীরে আঘাত পায়নি এমন কোনো জায়গা অবশিষ্ট ছিল না, তাঁর পোশাকে রক্ত ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। তবু তিনি একই সঙ্গে চারদিকে ছুটে যাচ্ছিলেন। সে সময় হযরত আবু বকর ও হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাসূলে আকরামের কাছে এসে পৌঁছালেন।
এর মধ্যে বীরদের সরদার হযরত তালহা রক্তক্ষরণের ফলে উত্তপ্ত মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারালেন। তলোয়ার, বর্শা ও তিরের আঘাতে তাঁর সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। তাঁর শরীরে ছেষট্টিটি বড় এবং অগণিত ছোট ক্ষত ছিল। আমাদের প্রিয় নবী হযরত আবু বকরকে তৎক্ষণাৎ হযরত তালহার সাহায্যে ছুটে যাওয়ার আদেশ দিলেন। হযরত তালহার জ্ঞান ফেরানোর জন্য আবু বকর সিদ্দিক তাঁর মুবারক মুখে পানি ছিটিয়ে দিলেন। জ্ঞান ফিরে পাওয়ামাত্র হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “হে আবু বকর! রাসূলুল্লাহ কি সুস্থ আছেন?” এভাবে তিনি ভালোবাসা ও আনুগত্যের সবচেয়ে সুন্দর নিদর্শন দেখালেন। রাসূলে আকরামকে ভালোবাসা, তাঁর মুবারক দেহের জন্য জান কুরবান করা এমনই হয়ে থাকে। হযরত আবু বকর বললেন, “রাসূলুল্লাহ ভালো আছেন। তিনিই আমাকে পাঠিয়েছেন।” তখন তালহা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “আল্লাহ তাআলার অসীম শোকর। রাসূলুল্লাহ জীবিত থাকলে প্রতিটি বিপদই তুচ্ছ।” এরই মধ্যে আরও কয়েকজন সাহাবী এসে পৌঁছেছিলেন।
জগৎসমূহের সরদার মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত তালহার কাছে তাশরিফ আনলেন। আহত মুজাহিদ রাসূলুল্লাহকে জীবিত দেখে আনন্দে কেঁদে ফেললেন। মহানবী তাঁর শরীরে হাত বুলিয়ে দেওয়ার পর দুই হাত তুলে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! তাঁকে আরোগ্য দাও, শক্তি দান করো।” রাসূলে আকরামের এক মুজিযা হিসেবে হযরত তালহা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং আবার শত্রুর সঙ্গে লড়াই শুরু করলেন। আমাদের প্রিয় নবী তাঁর সম্পর্কে ইরশাদ করলেন, “উহুদের দিন দেখলাম, পৃথিবীতে আমার ডানে জিবরাইল আর বামে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ছাড়া আমার কাছে আর কেউ নেই।”22 “পৃথিবীতে চলাফেরা করা কোনো জান্নাতি মানুষকে যে দেখতে চায়, সে যেন তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহর দিকে তাকায়।”
“তালহা ও জুবাইর জান্নাতে আমার প্রতিবেশী” হাদীস শরীফ
যুদ্ধের ময়দানের সব দিকে লড়াই পূর্ণ তীব্রতায় চলছিল। মহানবীর চারপাশে ছিলেন আবু দুজানা, পতাকাবাহী মুসআব ইবনে উমাইর, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, মহানবীকে রক্ষা করার জন্য পেছনের সারি থেকে ছুটে আসা নাসিবা খাতুন এবং আরও কয়েকজন সাহাবী। তাঁরা রাসূলুল্লাহর সঙ্গে মিলে মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। আপাদমস্তক অস্ত্রসজ্জিত, বর্ম ও শিরস্ত্রাণ পরিহিত দুর্ধর্ষ মুশরিক আবদুল্লাহ ইবনে হুনাইদ আমাদের প্রিয় নবীকে দেখতে পেয়ে ঘোড়ায় চাবুক কষাল। সে চিৎকার করছিল, “আমি জুহাইরের ছেলে। আমাকে মুহাম্মদকে দেখিয়ে দাও। হয় আমি তাকে হত্যা করব, নয়তো তার পাশে মরব!” সে যখন ঘোড়া ছুটিয়ে মহানবীর দিকে আসছিল, তখন হযরত আবু দুজানা তার পথ আগলে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “আয় দেখি! আমি সেই ব্যক্তি, যে নিজের দেহ দিয়ে মুহাম্মদ আলাইহিস সালামের মুবারক দেহ রক্ষা করছে। আমাকে মাড়িয়ে না গিয়ে তুই তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারবি না!” তিনি ঘোড়ার পায়ে তলোয়ারের আঘাত হেনে আবদুল্লাহ ইবনে হুনাইদকে মাটিতে ফেলে দিলেন, তারপর তলোয়ার তুলে “নে, এটা খারাশার ছেলের পক্ষ থেকে!” বলে এক আঘাতেই তাকে শেষ করে দিলেন। এ দৃশ্য দেখে জগৎসমূহের সরদার দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! খারাশার ছেলের (আবু দুজানার) প্রতি আমি যেমন সন্তুষ্ট, তুমিও তাঁর প্রতি তেমনি সন্তুষ্ট হও!”
মালিক ইবনে জুহাইর ছিল মুশরিকদের মধ্যে অত্যন্ত নিপুণ এক তিরন্দাজ; যা লক্ষ্য করে ছুড়ত, তাতেই আঘাত হানত। সে সর্বত্র মহানবীকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল, সুযোগ পেলেই তাঁকে তির দিয়ে আঘাত করতে চাইছিল। সে রাসূলুল্লাহর একেবারে কাছে এসে ধনুক টেনে আমাদের প্রিয় নবীর মুবারক মাথা লক্ষ্য করে তির ছুড়ল। চোখের পলক ফেলার মতো সময়ও ছিল না। হযরত তালহা তৎক্ষণাৎ হাতের তালু মেলে তিরের সামনে ধরলেন। তিরটি হযরত তালহার হাতের তালুতে বিঁধে হাত ক্ষতবিক্ষত করে দিল। তাঁর আঙুলগুলোর সব রগ কেটে গেল, হাতের হাড় ভেঙে গেল। বিশ্বজগতের গৌরব মহানবীও (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘটনাটি দেখে অত্যন্ত ব্যথিত হলেন এবং ইরশাদ করলেন, “যদি তুমি (আমাকে রক্ষা করার জন্য তিরের দিকে হাত বাড়ানোর সময়) ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলতে, তাহলে মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায়ই ফেরেশতারা তোমাকে আকাশে তুলে নিয়ে যেতেন।”23
মক্কার মুশরিকদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে কামিআ, উবাই ইবনে খালাফ, উতবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব জুহরি নামের চার মুশরিক রাসূলে আকরামের জীবনাবসান ঘটানোর জন্য একমত হয়ে কসম খেয়েছিল। এই সংকটময় মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ পাশে থাকা কয়েকজন সাহাবীকে নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করছিলেন। মহানবীর সামনে ছিলেন পতাকাবাহী হযরত মুসআব ইবনে উমাইর। গায়ে পরা বর্মের কারণে হযরত মুসআবকে দেখতে আমাদের প্রিয় নবীর মতোই লাগছিল। তিনিও ডান হাতে ইসলামের পতাকা নিয়ে মুশরিকদের সঙ্গে ভয়াবহ লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিলেন। এ সময় বর্মে মোড়া ইবনে কামিআ ঘোড়ায় চড়ে সেখানে এগিয়ে এল। গলা ফাটিয়ে “আমাকে মুহাম্মদকে দেখিয়ে দাও! সে রক্ষা পেলে আমি যেন রক্ষা না পাই!” বলে চিৎকার করতে করতে সে মহানবীর দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। হযরত মুসআব ও নাসিবা খাতুন তার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের দেহ মহানবীর ঢাল বানিয়ে লড়াই শুরু করলেন। এই কাফিরকে তাঁরা যত তলোয়ারের আঘাতই করলেন, বর্মের কারণে তা কোনো কাজে এল না। ইবনে কামিআ নাসিবা খাতুনের ওপর তলোয়ারের আঘাত হেনে তাঁর কাঁধ ক্ষতবিক্ষত করে দিল। তারপর হযরত মুসআবের পতাকা ধরা ডান হাতে তলোয়ারের কোপ বসাল। ডান হাত কেটে গেলেও মুসআব ইবনে উমাইর নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় ইসলামের পবিত্র পতাকা মাটিতে পড়তে না দিয়ে বাম হাতে তুলে নিলেন।
সে সময় তিনি পবিত্র এক আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন, যার মর্মার্থ: “মুহাম্মদ আলাইহিস সালাম একজন রাসূল। তাঁর আগেও বহু রাসূল এসেছেন।”24 এবার ইবনে কামিআ হযরত মুসআবের বাম হাতে তলোয়ারের কোপ বসাল। বাম হাতও কেটে গেল, কিন্তু সেই গৌরবময় পতাকাবাহী তখনো ইসলামের পতাকা মাটিতে পড়তে দিলেন না। বীর সাহাবী বাহু দিয়ে পতাকা ধরে বুকের সঙ্গে চেপে রেখে তা উড়িয়ে চললেন। এরপর ইবনে কামিআ গৌরবময় সাহাবীর দেহে বর্শা বিঁধিয়ে দিল। তিনিও তাঁর অন্য সাথিদের মতো শহিদ হয়ে আখিরাতে পাড়ি জমালেন।
হযরত মুসআব মাটিতে লুটিয়ে পড়ার সময়ও ইসলামের গৌরবময় পতাকা মাটিতে পড়ল না: মুসআবের আকৃতি ধারণ করা এক ফেরেশতা সঙ্গে সঙ্গে তা ধরে ফেললেন। আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “এগিয়ে যাও, হে মুসআব! এগিয়ে যাও!” এতে পতাকা ধরা ফেরেশতা বললেন, “আমি মুসআব নই।” তখন বিশ্বজগতের সুলতান মহানবী বুঝলেন যে, তিনি ফেরেশতা, এবং পতাকাটি হযরত আলিকে দিলেন।25
আর ইবনে কামিআ হযরত মুসআবকে মহানবী মনে করায় তাড়াতাড়ি মুশরিকদের মধ্যে গিয়ে চিৎকার করতে লাগল, “আমি মুহাম্মদকে হত্যা করেছি!” এ কথা শুনে মুশরিকরা লক্ষ্যে পৌঁছানোর আনন্দে আরও উন্মত্ত হয়ে উঠল। অন্যদিকে সাহাবায়ে কেরাম প্রকৃত ঘটনা জানতে পারেননি; তাঁদের হাত-পা যেন অবশ হয়ে গেল। চারদিকে শোকের ছায়া নেমে এল। এমনকি হযরত উমরের হাত দুটিও ঝুলে পড়েছিল, তিনি সাথিদের নিয়ে যেখানে ছিলেন সেখানেই বসে পড়েছিলেন। আনাস ইবনে নাজর তাঁদের এই অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা বসে আছেন কেন?”
তাঁরা উত্তর দিলেন, “রাসূলুল্লাহকে শহিদ করা হয়েছে!…” হযরত আনাস বললেন, “রাসূলুল্লাহকে যদি শহিদ করা হয়ে থাকে, তবে তাঁর রব (আল্লাহ তাআলা) তো চিরস্থায়ী। রাসূলুল্লাহর পরে আমরা বেঁচে থেকে কী করব! চলুন, উঠুন! আমাদের নবী যে জিনিসের জন্য লড়াই করে তাঁর পবিত্র জান কুরবান করেছেন, আমরাও তার জন্য আমাদের জান কুরবান করি।” আনাস তাঁর তলোয়ারের খাপ ভেঙে ফেললেন26 এবং “আল্লাহু আকবার!…” ধ্বনি দিয়ে খোলা তলোয়ার হাতে শত্রুর মাঝখানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তিনি বহু কাফিরকে ধরাশায়ী করলেন এবং শহিদ হলেন। শুধু তাঁর চেহারাতেই সত্তরটি ক্ষত ছিল। শরীরে অগণিত ক্ষত থাকায় তাঁর বোন ছাড়া আর কেউ তাঁকে চিনতে পারেননি।
সাহাবায়ে কেরামের অনেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন, একাংশ শাহাদাত লাভ করেছিলেন। তাঁদের এই বিক্ষিপ্ত অবস্থার সুযোগ নিয়ে মুশরিকরা রাসূলে আকরামের চারপাশে জড়ো হলো। পাথর ও তলোয়ার দিয়ে তারা দুই জাহানের সুলতানকে শহিদ করার চেষ্টা করছিল। তাঁর গায়ে দুটি বর্ম থাকায় আঘাতগুলো কোনো কাজে আসছিল না। উতবা ইবনে আবি ওয়াক্কাসের ছোড়া পাথর আমাদের প্রিয় নবীর চেহারা মুবারকে লাগল এবং তাঁর নিচের ঠোঁট আহত হলো। নিচের চোয়ালের ডান দিকের মুবারক রাবাইয়া, অর্থাৎ সামনের কর্তন-দাঁত ভেঙে গেল। এ সময় ইবনে কামিআ নামের মুশরিকও এল এবং জগৎসমূহের সরদারের মুবারক মাথায় তলোয়ারের আঘাত হানল। আমাদের প্রিয় নবীর শিরস্ত্রাণ ভেঙে গেল, তার দুটি কড়া তাঁর মুবারক দুই কানপট্টিতে বিঁধে গেল।
ইবনে কামিআর আরেকটি তলোয়ারের আঘাতে তিনি তাঁর মুবারক কাঁধে আহত হলেন এবং মুসলমানদের ফেলে দেওয়ার জন্য আবু আমিরের খোঁড়া গভীর গর্তে কাত হয়ে পড়ে গেলেন। আমাদের প্রিয় নবী বিশ্বাসঘাতক ইবনে কামিআর জন্য বদদোয়া করলেন, “আল্লাহ তাআলা তোমাকে লাঞ্ছিত ও দুর্দশাগ্রস্ত করুন!” ইবনে কামিআ অত্যন্ত খুশি হয়ে “আমি মুহাম্মদকে হত্যা করেছি! আমি মুহাম্মদকে হত্যা করেছি!…” বলে চিৎকার করতে করতে আবু সুফিয়ানের কাছে চলে গেল। মুশরিকরা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছে গিয়েছিল! এখন আর তারা মহানবীর দিকে মনোযোগ দিচ্ছিল না। মহানবী যে গর্তে ছিলেন, তার আশপাশ থেকে সরে গিয়ে তারা সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে লড়াইয়ে লেগে গেল।27
“পৃথিবীতে চলাফেরা করা কোনো জান্নাতি মানুষকে যে দেখতে চায়, সে যেন তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহর দিকে তাকায়” হাদীস শরীফ
রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গর্তে পড়ে গেলে তাঁর পবিত্র দুই গাল থেকে রক্ত ঝরছিল। তিনি মুবারক হাত দুটি চেহারায় বুলিয়ে দেখলেন, তাঁর হাত ও দাড়ি মুবারক রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেছে। এক ফোঁটা রক্তও মাটিতে পড়ার আগেই জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে পৌঁছালেন, সেই মুবারক রক্ত ধরে ফেললেন এবং বললেন, “ইয়া হাবিবাল্লাহ! আল্লাহ তাআলার কসম, এই রক্তের এক ফোঁটাও যদি মাটিতে পড়ত, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত মাটিতে কোনো ঘাস জন্মাত না।” বিশ্বজগতের গৌরব মহানবী ইরশাদ করলেন, “আমার এক ফোঁটা রক্ত যদি মাটিতে পড়ে, তাহলে আকাশ থেকে আজাব নেমে আসবে। হে আমার রব! আমার কওমকে ক্ষমা করো! কারণ তারা জানে না।” এভাবে যারা তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল, তাঁর মুবারক দেহে তলোয়ারের আঘাত হেনেছিল, তাঁর মুবারক দাঁত ভেঙে দিয়েছিল এবং তাঁর মুবারক চেহারা রক্তে রঞ্জিত করেছিল, তাদের হিদায়াত (সঠিক পথ) লাভের জন্য তিনি দোয়া করছিলেন।
এ সময় হযরত কাব ইবনে মালিক উচ্চস্বরে চিৎকার করছিলেন, “হে মুসলমানগণ! সুসংবাদ! এই যে রাসূলুল্লাহ এখানে!…” এই আওয়াজ শুনে গৌরবময় সাহাবীগণ যেন নতুন জীবন ফিরে পেলেন, আনন্দে সেদিকে ছুটে গেলেন। হযরত আলি ও তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে সেখানে এসে মহানবীকে গর্ত থেকে তুললেন। হযরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ আমাদের প্রিয় নবীর মুবারক কানপট্টিতে বিঁধে যাওয়া শিরস্ত্রাণের কড়াগুলো দাঁত দিয়ে টেনে বের করলেন। এই লোহার টুকরোগুলো বের করার সময় তাঁর সামনের দুটি দাঁতও পড়ে গেল। সাহাবায়ে কেরামের অন্যতম হযরত মালিক ইবনে সিনান রাসূলুল্লাহর মুবারক চেহারা থেকে চুইয়ে পড়া রক্ত চুষে নিলেন। তখন মহানবী ইরশাদ করলেন, “যার রক্ত আমার রক্তের সঙ্গে মিশেছে, জাহান্নামের আগুন তাকে স্পর্শ করবে না।”
মুশরিকরা আবার তাঁদের দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। মহানবীকে আবার ফিরে পাওয়ার আনন্দে সাহাবায়ে কেরাম মুহূর্তের মধ্যে রাসূলুল্লাহর চারপাশে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং একজন মুশরিককেও কাছে ঘেঁষতে দিলেন না। মহানবীর আর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না বুঝে মুশরিকরা পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে শুরু করল। দুই জাহানের সুলতান তাঁর পাশে থাকা হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে বললেন, “তাদের ফিরিয়ে দাও।” হযরত সাদ জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার কাছে মাত্র একটি তির আছে। এ দিয়ে কীভাবে তাদের ফেরাব?” রাসূলে আকরাম আবারও একই আদেশ দিলেন। তখন তিরন্দাজদের শিরোমণি হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস তূণে হাত ঢুকিয়ে তিরটি ছুড়লেন। লক্ষ্যভেদী তিরটি এক মুশরিককে ধরাশায়ী করল। তিনি আবার তূণের দিকে হাত বাড়িয়ে দেখলেন, সেখানে আরেকটি তির রয়েছে। ভালো করে লক্ষ করে দেখলেন, এটি একটু আগে ছোড়া সেই তিরটিই। আরেকজন মুশরিক মারা গেল। এমনটি বহুবার ঘটল। এটি ছিল আমাদের প্রিয় নবীর এক মুজিযা: হযরত সাদ প্রতিবারই তূণে আগের ছোড়া তিরটি পেয়ে যাচ্ছিলেন। নিজেদের লোকেরা একের পর এক নিহত হচ্ছে দেখে কুরাইশরা পাহাড়ে ওঠার চিন্তা বাদ দিল। তারা নিচে নেমে পিছু হটে গেল।
তাদের মধ্য থেকে উবাই ইবনে খালাফ মহানবীর দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে চিৎকার করতে লাগল, “কোথায় সেই লোক, যে নিজেকে নবী বলে দাবি করে? সে আমার সামনে আসুক, আমার সঙ্গে লড়ুক!” সাহাবায়ে কেরাম তার মোকাবিলায় যেতে চাইলেও আমাদের প্রিয় নবী অনুমতি দিলেন না। তিনি হযরত হারিস ইবনে সিম্মার বর্শাটি নিয়ে নিজেই সামনে এগিয়ে গেলেন। নরাধম উবাই ঘোড়ায় চাবুক কষিয়ে “হে মুহাম্মদ! তুমি রক্ষা পেলে আমি যেন রক্ষা না পাই!” বলতে বলতে কাছে এল। সে আপাদমস্তক বর্মে মোড়া ছিল। জগৎসমূহের সরদার হাতের বর্শাটি উবাইয়ের ঘাড় লক্ষ্য করে ছুড়লেন। বর্শাটি উড়ে গিয়ে তার শিরস্ত্রাণ ও বর্মের গলার মাঝখান দিয়ে ঘাড়ে বিঁধে গেল। উবাই ষাঁড়ের মতো গর্জন করতে করতে ঘোড়া থেকে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। তার পাঁজরের হাড় ভেঙে গেল। মুশরিকরা তাকে তুলে নিয়ে গেল। পথে সে “মুহাম্মদ আমাকে মেরে ফেলেছে!…” বলে চিৎকার করতে করতে প্রাণ হারাল। রাসূলুল্লাহ পাশে থাকা সাহাবীদের নিয়ে উহুদের পাথুরে ঢালের দিকে উঠতে লাগলেন। পাথরগুলোর কাছে পৌঁছে তিনি ওপরে উঠতে চাইলেন। কিন্তু অত্যন্ত ক্লান্ত থাকায়, গায়ে পরপর দুটি বর্ম পরা থাকায় এবং মুবারক দেহে সত্তরটিরও বেশি তলোয়ারের আঘাত লাগায় তিনি সে শক্তি পেলেন না। তখন হযরত তালহা মহানবীকে পিঠে তুলে পাথরের ওপর উঠিয়ে দিলেন। আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “তালহা যখন রাসূলুল্লাহকে সাহায্য করলেন, তখন তাঁর জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেল।” একেবারেই শক্তি না থাকায় তিনি জোহরের নামাজ বসে আদায় করলেন।
পাহাড়ের পাদদেশে সাহাবীগণ প্রত্যেকে যেন এক একটি সিংহ হয়ে মুশরিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিলেন। আমাদের নবীকে যারা তলোয়ার দিয়ে আঘাত করেছিল, তাদের জন্য তাঁরা দুনিয়াকে কারাগার বানিয়ে দিলেন। এক ফাঁকে হাতিব ইবনে বালতাআ আমাদের প্রিয় নবীর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার সঙ্গে এমন কে করল?” মহানবী ইরশাদ করলেন,
“উতবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস আমার দিকে পাথর ছুড়ে আমার চেহারায় আঘাত করেছে এবং আমার রাবাইয়া দাঁত ভেঙে দিয়েছে।” তখন হযরত হাতিব আবার জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে কোন দিকে গেছে?” মহানবী ইশারা করে তার যাওয়ার দিক দেখিয়ে দিলেন। হযরত হাতিব সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে ছুটে গেলেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তিনি উতবাকে পেয়ে গেলেন। তাকে ঘোড়া থেকে ফেলে এক আঘাতে তার মাথা কেটে ফেললেন এবং মাথাটি রাসূলুল্লাহর দরবারে এনে সুসংবাদ দিলেন। মহানবী এই বলে তাঁর জন্য দোয়া করলেন, “আল্লাহ তাআলা তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। আল্লাহ তাআলা তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হোন।” সাহাবায়ে কেরাম আবার একত্র হয়ে নতুন করে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন; তাঁদের সামনে মুশরিকরা টিকতে পারল না। প্রায় ত্রিশজন লোক হারিয়ে তারা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে মক্কার পথ ধরল। মহানবী শহিদ হয়েছেন – এই গুজব মদিনায় পৌঁছে গিয়েছিল। হযরত ফাতিমা, হযরত আয়েশা, উম্মে সুলাইম, উম্মে আইমান, হামনা বিনতে জাহশ, কুআইবার মতো নারীগণ উহুদের দিকে ছুটে এলেন। হযরত ফাতিমা পিতা মহানবীকে আহত অবস্থায় দেখে কেঁদে ফেললেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন। হযরত আলি তাঁর ঢালে করে পানি নিয়ে এলেন। আমাদের মা ফাতিমা সেই পানি দিয়ে মহানবীর মুবারক চেহারা ধুয়ে দিলেন, রক্ত ধুয়ে পরিষ্কার করলেন। কিন্তু চেহারার রক্ত থামছিল না। হযরত ফাতিমা এক টুকরো চাটাই পুড়িয়ে তার ছাই ক্ষতস্থানে চেপে ধরলে রক্ত বন্ধ হলো।28
এরপর তাঁরা যুদ্ধের ময়দানে নামলেন। প্রথমে আহতদের খুঁজে বের করে তাঁদের ক্ষত বেঁধে দেওয়া হলো। মুশরিকরা কিছু শহিদকে চেনার অযোগ্য করে ফেলেছিল।
তাঁদের কান, নাক ও অন্যান্য অঙ্গ কেটে ফেলেছিল, পেট চিরে ফেলেছিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাহশও ছিলেন তাঁদের মধ্যে। এই অবস্থা দেখে আমাদের প্রিয় নবী ও তাঁর সাহাবীগণ গভীরভাবে ব্যথিত হলেন। সবচেয়ে বাছাই করা সাহাবীগণ শাহাদাতের শরবত পান করে, উহুদের মাটি নিজেদের রক্তে সিক্ত করে জান্নাতে উড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শহিদদের সঙ্গে করা এই আচরণ সহ্য করার মতো ছিল না। শুধু মহানবীরই নয়, সকল সাহাবীর অন্তর দুঃখে মোচড় দিয়ে উঠছিল। এই দৃশ্য দেখে জগৎসমূহের সরদার কেঁদে ফেললেন। অশ্রুসিক্ত মুবারক চোখে তিনি ইরশাদ করলেন, “এই শহিদগণ যে আল্লাহ তাআলার পথে জান কুরবান করেছেন, কিয়ামতের দিন আমি এর সাক্ষ্য দেব। তাঁদের রক্তসহই দাফন করো। আল্লাহর কসম, কিয়ামতের দিন তাঁরা রক্তঝরা ক্ষত নিয়ে হাশরের ময়দানে29 আসবেন। তাঁদের রক্তের রং হবে রক্তের রং, আর ঘ্রাণ হবে মেশকের।”
এরপর আমাদের প্রিয় নবী ইরশাদ করলেন, “হামজাকে দেখতে পাচ্ছি না। তাঁর কী অবস্থা হলো?” হযরত আলি খুঁজে তাঁকে পেলেন। আমাদের নবী সেখানে গিয়ে কল্পনাতীত এক দৃশ্য দেখে সইতে পারলেন না। হযরত হামজার কান, নাক ও অন্যান্য অঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছিল, চেহারা চেনার অযোগ্য করে ফেলা হয়েছিল, পেট চিরে কলিজা বের করে নেওয়া হয়েছিল। অশ্রুসিক্ত মুবারক চোখে মহানবী হযরত হামজাকে সম্বোধন করে ইরশাদ করলেন, “হে হামজা! কখনো কেউ তোমার মতো বিপদের শিকার হয়নি, আর হবেও না। হে রাসূলুল্লাহর চাচা! হে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের সিংহ হামজা! হে কল্যাণকর্মী হামজা! হে রাসূলুল্লাহর রক্ষাকারী হামজা! আল্লাহ তাআলা তোমার প্রতি রহমত করুন!…”
“তালহা যখন রাসূলুল্লাহকে সাহায্য করলেন, তখন তাঁর জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেল” হাদীস শরীফ
এ সময় দেখা গেল, সামনে থেকে এক নারী উদ্বিগ্ন হয়ে দ্রুত ছুটে আসছেন। তিনি ছিলেন আমাদের প্রিয় নবীর ফুফু আমাদের মা হযরত সাফিয়া। অন্য নারীদের মতো তিনিও রাসূলুল্লাহর শহিদ হওয়ার গুজব শুনে সবকিছু ভুলে দৌড়াতে দৌড়াতে উহুদে এসেছিলেন। ফুফুকে দেখে রাসূলে আকরাম ভাবলেন, শহিদদের অবস্থা দেখে ফুফু তা সইতে পারবেন না। তাই তিনি ফুফুর ছেলে জুবাইর ইবনে আওয়ামকে বললেন, “তোমার মাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও, তিনি যেন তাঁর ভাইয়ের মরদেহ না দেখেন।” হযরত জুবাইর দৌড়ে মায়ের কাছে গেলেন। বরকতময় সেই নারী ব্যাকুল হয়ে বললেন, “বাবা! রাসূলুল্লাহর খবর বলো!…” তাঁদের কাছে হযরত আলিও এসেছিলেন। তিনি বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ30, রাসূলুল্লাহ সুস্থ আছেন।” এ কথা শুনে সাফিয়ার মন হালকা হলো, কিন্তু “আমাকে তাঁকে দেখাও” না বলে তিনি পারলেন না। হযরত আলি ইশারা করে জগৎসমূহের সরদারকে দেখিয়ে দিলেন। দুই জাহানের সূর্যকে জীবিত দেখে হযরত সাফিয়া অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন। এবার তিনি ভাই হযরত হামজার অবস্থা দেখার জন্য সামনে এগোতে চাইলেন। ছেলে জুবাইর বললেন, “আম্মাজান! রাসূলুল্লাহ আপনাকে ফিরে যেতে আদেশ করছেন।” তখন হযরত সাফিয়া বললেন, “তাঁর সঙ্গে যা করা হয়েছে তা আমাকে না দেখানোর জন্য যদি আমাকে ফিরে যেতে হয়, তবে আমি তো এমনিতেই জেনে গেছি যে, আমার ভাইয়ের মরদেহ কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলার পথেই তিনি এই অবস্থার শিকার হয়েছেন। এই পথে এর চেয়েও কঠিন কিছুতে আমরা রাজি। এর সওয়াব আমরা আল্লাহ তাআলার কাছেই আশা করব। ইনশাআল্লাহ, আমরা ধৈর্য ধরব, সহ্য করব।” হযরত জুবাইর ইবনে আওয়াম এসে এ কথা জানালে মহানবী ইরশাদ করলেন, “তাহলে তাঁকে দেখতে দাও।”
হযরত সাফিয়া হযরত হামজার মরদেহের পাশে বসে নিঃশব্দে কাঁদলেন। আসার সময় হযরত সাফিয়া সঙ্গে করে দুটি চাদর এনেছিলেন। সেগুলো বের করে তিনি বললেন, “এগুলো আমার ভাই হামজার জন্য এনেছি, তাঁকে এগুলোতে জড়িয়ে দাও।” “সাইয়্যিদুশ শুহাদা”, অর্থাৎ শহিদদের সরদার হযরত হামজাকে এই চাদরগুলোর একটি দিয়ে কাফন পরানো হলো।31 হাবিবুল্লাহ মহানবী পতাকাবাহী মুসআব ইবনে উমাইরের শিয়রে এলেন। হযরত মুসআবের হাত দুটি কাটা ছিল, শরীরের বহু জায়গায় ক্ষত ছিল। তাঁর চারপাশ যেন রক্তের পুকুর। মহানবী এখানেও গভীরভাবে ব্যথিত হলেন এবং এই প্রিয় শহিদদের সম্বোধন করে সূরা আহজাবের ২৩তম পবিত্র আয়াত তিলাওয়াত করলেন, যার মর্মার্থ: “মুমিনদের মধ্যে এমন কিছু পুরুষ আছে, যারা আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কৃত অঙ্গীকারে সত্যনিষ্ঠা দেখিয়েছে। তাদের কেউ কেউ শহিদ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই করার অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে (শহিদ হয়েছে)। আর কেউ কেউ শাহাদাতের অপেক্ষায় আছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কখনো কোনো পরিবর্তন আনেনি।” এরপর মহানবী ইরশাদ করলেন, “আল্লাহ তাআলার রাসূলও সাক্ষী যে, কিয়ামতের দিন তোমরা আল্লাহ তাআলার দরবারে শহিদ হিসেবে পুনরুত্থিত হবে।”
এরপর তিনি পাশের লোকদের দিকে ফিরে ইরশাদ করলেন, “তোমরা তাঁদের জিয়ারত করো। তাঁদের সালাম দাও। আল্লাহ তাআলার কসম, যে ব্যক্তি এই দুনিয়ায় তাঁদের সালাম দেবে, কিয়ামতের দিন এই প্রিয় শহিদগণ তার সালামের জবাব দেবেন।”
হযরত মুসআব ইবনে উমাইরের জন্য কাফন হতে পারে এমন কিছু পাওয়া গেল না। তাঁর নিজের কাফতানটি তাঁর মুবারক দেহ পুরোপুরি ঢাকছিল না। মাথার দিক ঢাকলে পা, আর পায়ের দিক ঢাকলে মাথা খোলা থেকে যাচ্ছিল। হাবিবে আকরাম মহানবী ইরশাদ করলেন, “তাঁর মাথার দিক কাফতান দিয়ে, আর পা দুটি ইজখির ঘাস দিয়ে ঢেকে দাও।”32
সারা জীবন ইসলামের খেদমতে কাটিয়ে এই পথে শাহাদাতের মর্যাদা লাভকারী এই সৌভাগ্যবান সাহাবী অর্ধেক কাফনে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন।33
অন্য শহিদদের জানাজার নামাজ আদায় করা হলো এবং তাঁদের রক্তমাখা পোশাকসহ দুজন-তিনজন করে এক এক কবরে রেখে দাফন করা হলো (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)। উহুদের যুদ্ধে সত্তরজন শহিদ হয়েছিলেন। তাঁদের চৌষট্টিজন ছিলেন আনসার, ছয়জন মুহাজির।
সাহাবায়ে কেরামের অধিকাংশের কোনো না কোনো আত্মীয় শহিদ হয়েছিলেন। তাই তাঁদের অন্তর ছিল ক্ষতবিক্ষত। জীবিতদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য হাবিবে আকরাম মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করলেন, “আল্লাহর কসম, আমার সাহাবীদের সঙ্গে আমিও যদি শহিদ হয়ে উহুদ পাহাড়ের কোলে রাত কাটাতে পারতাম, তবে কতই না ভালো হতো! তোমাদের ভাইয়েরা যখন শহিদ হলেন, আল্লাহ তাআলা তাঁদের রুহগুলো সবুজ পাখির পেটে রেখে দিলেন।
তাঁরা জান্নাতের নদীগুলোর কাছে এসে সেগুলোর পানি পান করেন। জান্নাতের ফল খান। জান্নাতের চারদিক ঘুরে দেখেন। তার ফুলবাগানগুলোতে উড়ে বেড়ান। তারপর আরশে আলার নিচে ঝোলানো সোনার প্রদীপগুলোর ভেতরে প্রবেশ করে সন্ধ্যা কাটান। এমন খাদ্য ও পানীয়ের স্বাদ ও সৌন্দর্য দেখে তাঁরা বলেন, ‘হায়! আল্লাহ তাআলা আমাদের কত কিছু দান করেছেন, তা যদি আমাদের ভাইয়েরা জানতেন, তাহলে তাঁরা জিহাদ থেকে দূরে থাকতেন না, লড়াইয়ের ভয়ে শত্রুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন না।’ আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘আমি তোমাদের অবস্থা তাঁদের জানিয়ে দিচ্ছি।’” (আর মহান আল্লাহ পবিত্র আয়াত নাজিল করে মর্মার্থে ইরশাদ করলেন,) “আল্লাহ তাআলার পথে যারা শহিদ হয়েছে, তাদের তোমরা কখনো মৃত মনে কোরো না! বরং তারা জীবিত, তাদের রবের কাছে রিজিকপ্রাপ্ত। আল্লাহ তাআলা তাদের যা দিয়েছেন (শাহাদাতের যে মর্যাদা দান করেছেন) তা নিয়ে তারা আনন্দিত। তাদের পেছনে যারা এখনো তাদের সঙ্গে মিলিত হতে পারেনি (শাহাদাতের মাধ্যমে), তাদের সম্পর্কে তারা এই সুসংবাদ দিতে চায় যে, ‘তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসা নিয়ামত ও অনুগ্রহের কারণে এবং আল্লাহ তাআলা যে মুমিনদের প্রতিদান নষ্ট করবেন না – এই সুসংবাদে তারা উৎফুল্ল হয়।”34 “আল্লাহ তাআলা তাঁদের সামনে প্রকাশিত হয়ে বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! তোমাদের মন কী চায়, বলো, আমি তা তোমাদের প্রচুর পরিমাণে আস্বাদন করাব।’ তাঁরা বলেন, ‘হে আমাদের রব! তুমি আমাদের যে নিয়ামতসমূহ দান করেছ, তার চেয়ে উত্তম কোনো নিয়ামত নেই যে, আমরা তা চাইব। আমরা জান্নাতে যা ইচ্ছা তা-ই খেয়ে চলেছি। তবে যদি চাইতেই হয়, তবে আমরা চাইব, আমাদের রুহগুলো যেন আমাদের দেহে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, আমাদের যেন দুনিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়, আর তোমার পথে লড়াই করে যেন আবার নিহত হই।’”
এখানে আর করার মতো কিছু অবশিষ্ট ছিল না। তাঁরা একত্র হয়ে যাত্রার প্রস্তুতি নিলেন। আল্লাহর পথে জিহাদ, অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার দ্বীন প্রচারের জন্য তাঁরা যে উহুদে এসেছিলেন, সেখানে ইতিহাসের এক নজিরবিহীন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এখানে সাহাবায়ে কেরামের এমন বহু বীরত্ব দেখা গিয়েছিল, যা চোখ কখনো দেখেনি, যা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়; আর কাফিরদের আরও একবার শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল।
“হে হামজা! কখনো কেউ তোমার মতো বিপদের শিকার হয়নি, আর হবেও না। হে রাসূলুল্লাহর চাচা! হে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের সিংহ হামজা! হে কল্যাণকর্মী হামজা! হে রাসূলুল্লাহর রক্ষাকারী হামজা! আল্লাহ তাআলা তোমার প্রতি রহমত করুন!…” হাদীস শরীফ
জগৎসমূহের সরদার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মুবারক সাহাবীদের নিয়ে নূরানি মদিনার দিকে রওনা হলেন। হাররা নামক স্থানে পৌঁছে তিনি সাহাবীদের সারিবদ্ধ করলেন, মুবারক হাত দুটি তুলে আল্লাহ তাআলার কাছে কাকুতি-মিনতি করতে এবং এভাবে দোয়া করতে লাগলেন, “হে আল্লাহ! সকল হামদ ও প্রশংসা সর্বাগ্রে তোমারই প্রাপ্য। হে আল্লাহ! তুমি যাকে পথভ্রষ্টতায় ছেড়ে দাও, তাকে হিদায়াত দেওয়ার কেউ নেই; আর তুমি যাকে হিদায়াত দাও, তাকে পথভ্রষ্ট করারও কেউ নেই… হে আল্লাহ! আমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করে দাও। আমাদের অন্তরকে ঈমান দিয়ে সুশোভিত করো। কুফর, অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনকে আমাদের কাছে ঘৃণ্য করে দাও। আমাদের দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো যারা জানে, যারা সঠিক পথ পেয়েছে, আমাদের তাদের অন্তর্ভুক্ত করো। হে আল্লাহ! আমাদের মুসলমান হিসেবে বাঁচিয়ে রাখো এবং মুসলমান হিসেবে মৃত্যু দাও। আমাদের সৎকর্মশীল ও নেককারদের দলভুক্ত করো। কারণ তারা না সম্মান ও মর্যাদা হারিয়েছে, না দ্বীন থেকে ফিরে গেছে। হে আল্লাহ! যে কাফিররা তোমার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তোমার পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তোমার নবীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, তাদের শাস্তি দাও! তাদের ওপর তোমার সেই আজাব নাজিল করো, যা সত্য ও বাস্তব!… আমিন!”
সাহাবায়ে কেরামও “আমিন! আমিন!” বলে এই দোয়ায় শামিল হলেন। আমাদের প্রিয় নবী সাহাবীদের নিয়ে মদিনার কাছাকাছি চলে এলেন। মদিনায় থেকে যাওয়া নারী ও শিশুরা পথে নেমে এসেছিল; উৎকণ্ঠা ও দুঃখ নিয়ে তারা ফিরে আসা বাহিনীর মধ্যে বিশ্বজগতের সরদারকে দেখার চেষ্টা করছিল। জগৎ-আলোকিত-করা তাঁর নূরানি চেহারা দেখে তারা আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করল। তারপর তাদের চোখ বাহিনীর দিকে নিবদ্ধ হতো; তারা পিতা, স্বামী, পুত্র, মামা ও চাচাদের খুঁজত। দেখতে না পেলে… তারা চোখের পানি ধরে রাখতে পারত না। সাহাবীদের এই বেদনাদায়ক অবস্থা দেখে রহমতের সাগর রাসূলে আকরামও অত্যন্ত ব্যথিত হচ্ছিলেন, তাঁর মুবারক চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল।
এক সময় দেখা গেল, হযরত সাদ ইবনে মুআজের মা কাবশা খাতুন মহানবীর দিকে এগিয়ে আসছেন। উহুদে তাঁর ছেলে আমর শহিদ হয়েছিলেন। মহানবীর দরবারে পৌঁছে তিনি বললেন, “আমার মা-বাবা, আমার প্রাণ আপনার জন্য কুরবান হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ, আমি আপনাকে সুস্থ ও নিরাপদ দেখতে পেলাম। আপনি নিরাপদ থাকলে সব বিপদ-আপদই আমার কাছে তুচ্ছ!” তিনি তাঁর কলিজার টুকরা ছেলের কথা জিজ্ঞেসও করলেন না। আমাদের প্রিয় নবী তাঁর ছেলে আমরের জন্য শোক প্রকাশ করে সমবেদনা জানানোর পর ইরশাদ করলেন, “হে সাদের মা! তোমার জন্য এবং তাঁর পরিবারের জন্য সুসংবাদ: তাঁদের মধ্যে যাঁরা শহিদ হয়েছেন, তাঁরা সবাই জান্নাতে একত্র হয়েছেন এবং একে অপরের সাথি হয়েছেন। তাঁরা তাঁদের পরিবারের জন্যও শাফায়াত করবেন।”
কাবশা খাতুন বললেন, “আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আসা সবকিছুতেই আমরা সন্তুষ্ট, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই সুসংবাদের পর এখন আর তাদের জন্য কে কাঁদবে! আপনি পেছনে রয়ে যাওয়াদের জন্য দোয়া করুন।” জগৎসমূহের সরদার দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! তাদের অন্তরের দুঃখ দূর করে দাও! তাদের পেছনে যারা রয়ে গেছে, তাদেরও রয়ে যাওয়া মানুষদের মধ্যে সর্বোত্তম বানাও!”
দৈহিক কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতি ইঙ্গিত করে মহানবী সাহাবীদের বললেন, “(হে আমার সাহাবীগণ! এখন) আমরা ছোট জিহাদ থেকে ফিরলাম, বড় জিহাদ শুরু করতে যাচ্ছি।”35 এরপর তিনি সবাইকে নিজ নিজ ঘরে বিশ্রাম নিতে এবং আহতদের ক্ষতের চিকিৎসা করাতে উপদেশ দিলেন। তিনি নিজেও আহত ছিলেন। তিনি সোজা তাঁর সৌভাগ্যময় ঘরে চলে গেলেন।
হামরাউল আসাদ অভিযান
রাসূলে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদিনায় ফিরে এসে, মুশরিকরা যেকোনো মুহূর্তে ফিরে এসে মদিনায় হামলা চালাতে পারে – এই আশঙ্কায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলেন।
উহুদের যুদ্ধের পরের সোমবার তিনি নিজে আহত ছিলেন; তবু মুসলমানরা যে গতকালের যুদ্ধে দুর্বল হয়ে পড়েনি, তা জানিয়ে দেওয়ার জন্য এবং শত্রুকে ভয় দেখিয়ে তাদের মদিনায় ফিরে আসা ঠেকানোর জন্য তিনি বিলাল হাবশিকে বললেন, “তুমি ঘোষণা করো, ‘রাসূলুল্লাহ তোমাদের শত্রুর পিছু ধাওয়া করার আদেশ দিচ্ছেন! গতকাল উহুদে যারা আমাদের সঙ্গে লড়াই করেনি, তারা আসবে না; শুধু যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছে, তারাই আসবে!’” বিলাল সাহাবীদের কাছে এই আদেশ পৌঁছে দিলে তাঁদের অধিকাংশ আহত হওয়া সত্ত্বেও তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত হয়ে গেলেন। এমনকি গুরুতর আহত আবদুল্লাহ ও রাফি নামের দুই ভাই রাসূলে আকরামের এই আহ্বান শোনামাত্র সব ব্যথা-যন্ত্রণা উপেক্ষা করে “রাসূলুল্লাহর সঙ্গে জিহাদে বের হওয়ার সুযোগ কি আমরা হাতছাড়া করব?!” বলে মুজাহিদদের সারিতে ছুটে এলেন।
আমাদের প্রিয় নবী তাঁর গৌরবময় সাহাবীদের নিয়ে মুশরিকদের পিছু ধাওয়া শুরু করলেন। রাওহা নামক স্থানে তাঁরা জানতে পারলেন যে, মুশরিকরা একত্র হয়ে মদিনায় হামলা চালানোর এবং মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে বোঝা গেল, এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও ছিল মহানবীর এক মুজিযা।
রাসূলে আকরাম তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন শুনে মুশরিকরা ভয় পেয়ে গেল এবং যেখানে ছিল, সেখান থেকেই মক্কায় ফিরে গেল।36
মহানবী হামরাউল আসাদ নামক স্থান পর্যন্ত তাদের পিছু ধাওয়া করলেন। মুশরিকদের দুজন ধরা পড়ল। মুসলমানরা সেখানে তিন দিন অবস্থান করলেন, তারপর মদিনায় ফিরে এলেন।
হামরাউল আসাদে যাওয়া এই সম্মানিত সাহাবীদের আল্লাহ তাআলা পবিত্র আয়াতে মর্মার্থে এভাবে প্রশংসা করলেন, “আহত হওয়ার পরও যারা আল্লাহ তাআলা ও তাঁর নবীর আহ্বানে সাড়া দিয়েছে, বিশেষ করে তাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে ও মন্দ থেকে বেঁচে থেকেছে, তাদের জন্য রয়েছে মহা প্রতিদান।”37
উহুদে আমাদের প্রিয় নবীকে হত্যা করার কসম যারা খেয়েছিল, তাদের একজন ইবনে কামিআ মক্কায় ফিরে একদিন তার ভেড়াগুলো দেখাশোনার জন্য পাহাড়ে উঠল। পাহাড়ের চূড়ায় সে ভেড়াগুলো পেল। সেগুলোর মধ্য থেকে একটি দুম্বা দ্রুত ছুটে এসে ইবনে কামিআকে গুঁতো মারতে লাগল। গুঁতোতে গুঁতোতে সেটি ইবনে কামিআকে ছিন্নভিন্ন করে মেরে ফেলল।
আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব জুহরিকেও মক্কায় যাওয়ার পথে সাদা ছোপওয়ালা একটি সাপ দংশন করে মেরে ফেলল।
মহানবীর প্রাণনাশের চেষ্টা যারা করেছিল, তারা সবাই এক বছরের মধ্যে নিজ নিজ শাস্তি ভোগ করে মারা গেল।
“হে আমার সাহাবীগণ! এখন আমরা ছোট জিহাদ থেকে ফিরলাম, বড় জিহাদ শুরু করতে যাচ্ছি” হাদীস শরীফ
তাঁর বন্ধু সাপের বিষ পান করলেও তা হয়ে যায় আবে হায়াত,
তাঁর শত্রু পানি পান করলে সাপের বিষে পরিণত হয় সেই পানি।
প্রতিটি ফোঁটায় তরঙ্গ তোলে হাজার রহমতের সাগর,
অজুর জন্য হাত বাড়িয়ে গোলাপ-গালে যখন তোলেন তিনি পানি।
“তাঁর পায়ের ধুলোয় পৌঁছাব” – এই আশায় যুগ যুগ ধরে অবিরাম
পাথর থেকে পাথরে মাথা ঠুকে দিশেহারা হয়ে ঘোরে পানি।
তাঁর দরবারের মাটির প্রতিটি কণায় নূর ছড়াতে চায় সে,
টুকরো টুকরো হয়ে গেলেও সেই দরবার থেকে ফেরে না পানি।
গুনাহগাররা জানে: তোমার নাত পাঠই হলো আরোগ্যের ওষুধ,
মাতাল যেমন নেশার ঘোর কাটাতে
পান করে পানি।
ইয়া হাবিবাল্লাহ, ইয়া খাইরাল বাশার, আমি তোমার জন্য ব্যাকুল,
তৃষ্ণায় জ্বলে যাওয়া ঠোঁট যেমন কামনা করে পানি।
তুমিই সেই দানশীলতার সাগর, মিরাজের রাতে যাঁর
অনুগ্রহের শিশির গ্রহ-নক্ষত্রে পৌঁছে দিয়েছে পানি।
